Profile Photo

রাহুল চন্দ্র দাসOffline

  • চাঁদনী রাতে বোমা হামলাঃ একটি যাদুবাস্তব খসড়া
    কক্ষে হাওয়া নেই বললেই চলে। মোমবাতির শিখা তবু মৃদু কাঁপে। দরজা, জানালা, ভেন্টিলেটরের কোন ফাঁকফোকর দিয়ে হেমন্তের চিকন হাওয়া মনসার সাপের মত বদ্ধ কক্ষে ঢোকে। সুপ্ত রাত্রির লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজের ভেতরকার ভোঁতা আদি অন্তহীন একটানা যান্ত্রিক চাপা গুঞ্জনের মত শব্দ। গুঞ্জনের উৎস দেয়ালের ওপাশে- সেখানে হয়তো কোন ফ্যান ঘুরছে। হতে পারে রেফ্রিজারেটরের কম্পন। যার উপস্থিতিতে কানে-তালা নৈঃশব্দ্যের ঝিঁঝিঁডাক স্নায়ুতে অতরঙ্গিত। প্রশ্বাসের ফলে বাতাসের মৃদু আন্দোলনে অ্যামিবার অভিক্ষেপের আকারে মোমবাতির শিখা কাঁপছে। মোমের শেষের দিকে এসে প্রদীপের শিখাটি ভারসাম্যহীন হতে থাকে। কক্ষের বস্তুসমূহের ছায়াগুলোর নিঃস্পন্দ ব্রহ্মচর্যে তাতে চির ধরে।
    হুটহাট বিদ্যুৎ চলে যায় সম্প্রতি; যখন তখন আসে। তার গতায়াতের ঠিকঠাক নেই কোন। এখনো তো এলো না। এলেও করার কিছু নেই তবু বিরক্তি ও হতাশায় বিছানার এপাশ ওপাশ করে চিৎ হয়ে থাকি। লোডশেডিঙের ঝাঁজে হাঁচির আকস্মিকতার মত মস্তিষ্কে নতুন চিন্তা আসে। দেনা ও বকেয়ার ছায়ামূর্তিগুলো বিম্বিত হয়ে ওঠে দুপুরের রোদে। নানা চিন্তার এক পর্যায়ে সুফিয়া খালাকে, ভাণ্ডারী কাকাকে যাই পারি আজকের মধ্যেই কিছু টাকা দিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও প্রক্ষিপ্তভাবে মাথায় আসে। তবে উদ্যমের একান্ত খরা তেপান্তরের মাঠের মরুভূর গনগনে সূর্যের মতই ধ্রুবকত্ব লাভ করে। কঙ্কালতন্ত্রের কুড়িটি হাড় ভাঙার সন্তানপ্রসবের ব্যথার মত সিলিং ফ্যানের ছায়া দপদপে মোমের আলোয় চিগবিগিয়ে কাঁপে।
    জীবনের প্রায় তিরিশ বছর অতিবাহিত; এরই জোড়াতালি নানা দৃশ্য স্তব্ধ রাত্রে মুহ্যমান হয়ে ওঠে। এখনকার প্রতিটি দিন প্রতিটি দিনের মতই ক্লান্তিকর। অহেতুক রোমান্স আর ফ্যান্টাসিতে ভারাক্রান্ত। সবসময়েই মনে হতে থাকে গুরুত্ববহ, জটিল বা নাটকীয় কিছু জীবনে ঘটতে যাচ্ছে। তবে এই চিন্তা যাপনে সচেতন প্রয়াসের দুর্ধর্ষ অভ্যাসগুলোকে কবুল করে না; অধিকন্তু অস্বীকারও করে থাকে। শুকতারার মত মনে হয় নিজেকে মাঝেমাঝে- উজ্জ্বল ও একাকী। তবে এই বোধ বিলুপ্তির ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় প্রায় সমস্ত আসরে, জলসায়। ব্যাপারটি ঘটে সামাজিক ভীড়ের উপক্রমণিকাতেই। প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রতিজ্ঞা শক্ত ভিত্তি পায় না। পরেরদিনের পরেরদিনও কল্পনা ও বাস্তবের বীজগণিত মেলে না। পৃথিবী তীরের ফলায় সময়কে ছিনতাই করে ধাবমান। আপাত ঠিকঠাকের বিপরীতে আধাযাপিত বিপ্লবের নেশা অতীন্দ্রিয়ের রহস্যের দিকে চলমানতার মতোই প্রসারিত। অপরাধচিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমেও নানা সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে ওঠে উত্তপ্ত অস্থিমজ্জায়। মানুষের, বিশেষত পরিচিত মানুষের অনেকের ব্যক্তিত্বেই আমি মুগ্ধ; এই মুগ্ধতা জাগতিক সঙ্ঘটন, অপ্রাকৃতিক ঘটনা, চাঁদ ও সুর্যের প্রতি মুগ্ধতার মতই উৎসাহদায়ক। আলো ও ছায়া, আলো ও ছায়ার বৈজ্ঞানিক ঐশ্বর্যে আমি মাঝেমাঝে এত অভিভূত হয়ে পড়ি যা মৃত্যু চিন্তার মতই উত্তেজক, বিশেষায়িত কোলাজ মস্তিষ্কে তৈরি করে। ভাবনা জানায়, বিজ্ঞানী মৃত্যুকে অসমর্থন করে; শিল্পীও সমর্থন করতে পারে না বলেই শিল্পসৃষ্টিরও তাগিদ আসে পাওনাদারের তাগিদের মত। বোধহয় তাগিদেরা এসে থাকে প্রক্ষিপ্তভাবে। মুহ্যমান বাস্তব আর বেদনার আদিগন্ত ভীড় ঠেলে গেরিলার মুখোশে, ছদ্মাবরণে।
    লোডশেডিঙের রাতে নানা ঝটকা চিন্তার শোরগোল শুনি। যুদ্ধ, মন্দা, মড়ক, নির্বাচন, আইএমএফের ঋণ ইত্যাদি খাপ্পা-বেখাপ্পা, লগ্ন-অলগ্ন নানান শব্দ চেতনার ডিকশনারি থেকে আহরিত হয়। যা দৈনিক বাক্যবিন্যাসকে ঋজুতা দান করে, চিন্তার প্রবাহে তরঙ্গিত হয়। ঘটনাচক্রের বেগে ত্রিমাত্রিক পৃথিবী নানামাত্রিক অসুখের অজুহাতে পার্থিব-অপার্থিবের তফাৎকে অতিক্রম করে যেতে চায়।
    চাঁদ ও সুর্য উঠার মত নিয়ম করে প্রতিবার নিয়ম করে ঘুম থেকে উঠি। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আগে ভবিতব্যের অনিশ্চয়তাগুলো মিছিল করে আসে। ঘুম ভেঙ্গে গেলে ঘর্মাক্ত কলেবরে নাগালে থাকা যেকোন দর্পণে সম্ভবপর চেষ্টাতে মুখ দেখি। না, দাঁতের ফাঁকে, জিহ্বার সাথে লেপ্টে থাকা বা মাড়ির কানাচে কোন চীনেজোঁক দেখতে পাচ্ছি না। তবে দুঃস্বপ্নটি এতই বাস্তবগন্ধী যে, সন্দেহের নিরবকাশ ও মিথ্যা প্রতিকারবশত লম্বা সময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করি। চোখের কোণে, যেকোন একপাশ ফিরে ঘুমিয়ে থাকার দরুণ মুখের ওই পাশের গালের দাঁড়ি-গোঁফে ক্লান্তিজনিত, শরীর নির্গত তরল শুকিয়ে খরখরে প্রথমে বাদামি চকের গুড়োর মত ক্রমে সাদা হয়ে আসা বরিক এসিড পাউডারের মত ছোপ পড়ে। কী বিশ্রী যে লাগে! ঘুম ভাঙ্গার পর চোখ না খুলেই শার্টের হাতা, কলার, হাতের তালুতে ঘষে মুছে ফেলি মুখের লালার চিহ্ন।
    হাতে রাখা দর্পণকে এদিকওদিক ঘুরিয়ে দেখতে পাচ্ছি একটা জোঁকের লকলকে দেহাংশ। কিলবিলে, পিচ্ছিল, জ্যান্ত জোঁকের ডগা আঙুলেও লাগছে। দাঁত, মাড়ির ঘুপচিতে আটকে আছে। দুই আঙুলকে চিমটার মত করেও সুবিধা করতে পারছিলাম না। মাকে বললাম যেন জোঁকটাকে আমার মুখগহ্বরের থেকে বের করে নিয়ে আসেন। ওনি এত বাছবিচারে গেলেন না। জিহ্বাটাকেই গোঁড়া থেকে টেনে ছিঁড়ে একটা সাদা ধবধবে প্লেটের ওপর রাখলেন। সিরামিকের চ্যাপ্টা প্লেটে রেস্টুরেন্টে সালাদ রেখে দেয়ার মতই। শিরা উপশিরা, রক্তের ঝাপটায় উপড়ে ফেলা জিহ্বাটিকে মনে হলো ল্যাবরেটরির ডিসেকশন টেবিল বা অণুবীক্ষণের নিচে কোন স্লাইডে রাখা বড়সড় কোন শামুক বা ঝিনুকের ক্যলসিয়াম-খোল থেকে বের করা মাংসল শরীরবিশেষ। দুঃস্বপ্নের তাৎপর্য আক্ষরিক হয় না। জ্বর, মস্তিষ্কের তাপমাত্রার ভারসাম্যের ভাঙ্গন, বদহজম ইত্যাদি নানা কারণেও তা ঘটে থাকতে পারে। দাঁতের ব্যথা, নিয়মিত ব্রাশ না করার কুফলতাজনিত কারণে, আকৃতিগত মানসিক অসন্তুষ্টির প্রতিফলনে এরকমের না হওয়ার নয়। রক্তাল্পতার কারণেও তা হবে হয়ত। হিমোগ্লোবিনের অভাবের কারণে ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস সূত্রবদ্ধ। অবদমিত ক্ষোভ, দমিয়ে রাখা রসিকতার গড়মিলেও তা হয়ে থাকতে পারে। এমন প্রায়শই তো ঘটেছে যে ঘুমের মধ্যে এমন সশব্দ দাঁত ভাঙছি যে সঞ্চারিত ভীতি কলেজের হোস্টেলের রুমম্যাট আর ইউনিভার্সিটির হলের সহবাসীকে লোক ডেকে নিয়ে আসতে তা বাধ্য করেছে। স্নায়ুতন্ত্রের কোন জটিলতা বলেই এখন মনে হয় ব্যাপারটিকে। সচেতন অবস্থায় এতো জোরে দাঁত কিড়মিড় আমি করতে পারব না এমন উচ্চ ডেসিবেলের স্টোন-ক্রাশারের মত। ঘুম ভেঙ্গে প্রায়ই সাঁড়াশির মত আটকে থাকা দুপাটি দাঁতকে আমি স্বেচ্ছায় আলগা করতে পারি না। আর্থ্রাইটিসের ভয়াবহতা দাঁতেও সম্প্রসারিত হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘসময় চুইংগাম চিবালে চোয়ালে যেরকমের ব্যথা ও আড়ষ্টতা আসে, আদৌ জানি না সকলেরই এরূপ ঘটে কি না, তেমন মনে হতে থাকে কিছুক্ষণ।
    মা যে আমার জিহবা টেনে গোঁড়া থেকে ছিড়ে সাদা ধবধবে সিরামিকের প্লেটে রেখে দিলেন ভাবান্তরহীন, একে আমি বিশদ করি কী করে? দিনের পর দিন ন্যুব্জ হয়ে আসা তাদের থেকে নির্বিচারে অর্থ ও আশ্রয়, যেন ভারী স্বাভাবিক পক্ষীশাবকের প্রাপ্যজ্ঞানে প্রাপ্যাধিক কামনা ও নির্বাহ করে থাকি, এরই প্রতিক্রিয়ায় ভোঁতা চিন্তায় কি আমারই গলিতপ্রায় সামাজিকতাবোধের চপেটাক্রমণ? মা আমাকে বরাবরই বাবাকে লুকিয়ে আলাদিনের চেরাগের থেকে লুকিয়ে টাকা দিয়ে থাকেন। গ্রীষ্ম-বর্ষায় বিরামহীন প্রস্রবণের মতো প্রাপ্যাধিক আমাকে সামর্থ্যের অধিক দিয়ে দেন, যা আমাকে অপত্যস্নেহের ব্যাপারে ভীতিপ্রদ অনির্বচনীয়তায় পৌঁছে দেয়। মা মারা গেলে বাবার সামনে আর বাবা মারা গেলে মায়ের সামনে কীভাবে গিয়ে দাঁড়াব, পরিবারতন্ত্রের সেই চাপ স্নায়ুতন্ত্রকে মুষড়ে দিয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে তারা যে গাঢ় আধুনিকতা, সন্তানের ভাবী পদক্ষেপে জয়ী হতে সাহস ও অমানবীয় কৃচ্ছ্রতা সংসারে অবলম্বন করেও আমাতে সঞ্চার করতে পেরেছেন; পরিচিত মহৎ কোন শিল্প বা প্রগাঢ় প্রাকৃতিক দৃশ্যও তা পারে নি।
    পরিবার নিশ্চয়ই বাজে ব্যাপার। পরস্পরকে শোষণ, প্রত্যেককে খাদের কিনারায় নিয়ে আসে। একের কর্মফল অপরকে ভোগ করাই যার নিয়তি। পরিবারের উৎপত্তি আর বিকাশে আমাদের প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পর বিপর্যয়ের আগপর্যন্ত এর কোন মহত্ত্ব থাকবে না। স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে মা, বাবা ও আমি প্রত্যেকেই যে সম্ভাবনা রাখি, তার সমাধি রচিত হয় উদ্ভট, আপাত আশাবাদের নিরিখে মাপা পরিবারের কল্যাণের কামনায়।
    মা কি মনে মনে আমাকে তিরস্কার করেন? বাবার ধৈর্যের সীমায় আমি আতঙ্কিত নই। মায়ের নিষ্কামতায় প্রগল্ভো আমি ভাবিই না যে তিনি আমাকে দোষী, লোভী বা পাপী মনে করেন। মায়ের অনুযোগের কথা ভাবলে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের সংলাপ বিড়বিড় করিঃ ‘তোরা তো এসেছিস কেবল মায়ের দুঃখ বাড়াতে।’
    ঘর-বাড়ি, জমি-জিরাত, স্থাবর সম্পত্তিসমূহ এককালে মায়েদের খুব ছিলো। বিয়ের সময়েও এই অহংকার অসার ছিলো না। মামাবাড়িতে সেসবের অবশেষ ছাই হয়ে থাকতে দেখেছি। এখন আর নেই। শরীর ও আয়ুষ্কাল ছাড়া পত্তনি দেয়ার মত মামাদের এখন বাকী কিছুই রইলো না। এককালে বিরাট নৌকাসমূহ ছিলো; গো-দেবতায় ভীড় করে ছিলো নায়েব-গোমস্তার পদভারাক্রান্ত মায়েদের বাড়ি। কল্পনায় আমি মূলত এরকমেরই দেখি। কোন কিছুই চিরস্থায়ী না হওয়ার নিয়মের দৃষ্টান্ত হয়ে ক্রমে সবই গিয়েছে। স্বল্পশিক্ষিত বাবাদেরও ছিল সাংবাৎসরিক কৃষিজীবী সংস্থান। আসামে সিলেটে ঘুরে, নানা পোড় খেয়ে, কাটাতারের দুইপাড়ে মা, বাবার পরিবারগুলো ধরিত্রীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতির ঘূর্ণাবর্তে পড়ে এখনো কোনমতে টলায়মান আছে।
    দাপাদাপি করে মোমবাতি নিভে গেল ক্রমে। মোমবাতির ম্লান আলোতে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা আমার কপাল বরাবর সিলিং ফ্যানের ছায়া ঔজ্জ্বল্যের তারতম্যের সাথে পাল্লা দিয়ে দিকবিদিক লাফিয়ে উধাও হয়ে গেল। প্রেতের মত ছুটে পালালো জানালা, দরজায় ঝুলিয়ে রাখা জামাকাপড়ের ছায়ামূর্তিগুলো। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত হল চেতনার দশদিক। এক্ষেত্রে চোখ খুলে তাকিয়ে থাকা আর চোখের পাতা মুদ্রিত করে রাখার আদৌ কোন তফাৎ অনুপস্থিত। কিন্তু আমি চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম চোখ খোলা রেখেই। সেভাবেই রয়ে যেতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। চাইলেও একেবারে আঁধারে আমি থাকতে পারলাম না। জানালা খুলে দিতে হলো। আঁধারে যে একাকিত্বের ধ্যানতন্ময়তা ছিলো, টুঁটি টিপে তার কফিনের ডালাটা খুলে ফেলে দিলাম। ঝিঁঝিঁর হইহল্লা আসছে। চাঁদের আলোয় তাল তাল অন্ধকারও বাইরের দূরবর্তী বাড়িঘরগুলো থেকে আসছে। কালো কালো বৃক্ষরাজিকে কল্পনার চেতনার রঙে সবুজ করে নিয়েছি। অনিয়ত জোনাকির আলো দেকার্তের স্থানাঙ্কের যত্রতত্র জ্বলছে আর নিভছে। চাঁদের আলো তারাদের গ্রাস করতে পারছে না। মৃদু হাওয়াতেও তারারা কাঁপছে। অনতিদূরের রাস্তায় আলোজ্বলা যান্ত্রিক কলকব্জাগুলো থেকে, মোটরসমূহ থেকে তারামাছের মত আলোর ঝলকানি ঠিকরে এসে পড়ছে প্রাকৃতিক ও মানবীয় নানা কাঠামো আর স্থাপনায়।
    জানালা খুলে দেয়াতে একটি দুটি করে ক্রমে ঝাঁকে ঝাঁকে হেমন্তের মশারা পঙ্গপালের মত কক্ষে ঢুকে পড়লো। রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে রাস্তায় চলে এলাম। মেঘের আড়ালে আততায়ীর মতো বাঁকা চাঁদকে মেঘেদের উপত্যকা-অধিত্যকা, গলিঘুঁজির মধ্য দিয়ে শিকারি বাজের মত প্রতিশ্রুতিপূর্ণ ধাবমানতায় দেখতে পাচ্ছি। খুরের ধুলোয় পথঘাট অন্ধকার করে ঘোড়দৌড়ের একমাত্র ঘোড়ার মত দূরদিগন্তের পিয়াসী সে চাঁদ।
    কক্ষের সমস্ত খুচরো টাকা দিয়ে মশার কয়েল, মোমবাতি আর বিড়ি নিয়ে ফিরে এলাম। ফসফরাসের ঝাঁঝালো গন্ধে মগজ ভরে উঠলো। রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের ত্রুটিপূর্ণ কক্ষপথের মতো কয়েল জ্বলছে কেন্দ্রাভিমুখী আগুন বুকে নিয়ে। মহাশূন্যে ভাসমান একটিমাত্র তারার মত কয়েলের বুকের আগুন ছাড়া দৃশ্যমান কিছু কোথাও নেই। অন্ধকার হাতড়ে গুণিনের মত বিড়ি আর মোমবাতি পাওয়া গেলো। মাত্রই কই জানি দেশলাই রাখলাম, সহজে খুঁজে পেলাম না তা আর! বিরক্ত হয়ে শুয়ে পড়তে গিয়ে পিঠেই দেশলাই অনুভব করলাম মালীর ঘাড়ের মত। মোমবাতির আলো, বিড়ি আর কয়েলের ধোঁয়ায় কক্ষটি শীঘ্রই নীহারিকায় পর্যবসিত হলো। দরজা জানালা বন্ধ বলে আগেকার স্তব্ধপ্রায় পরিবেশটি ফিরে এলো দ্রুত। নিঃশ্বাসের শব্দের সাথে হাড়ের দমবন্ধ ব্যথার জাগতিকতা ছাপিয়ে আদ্যন্ত দান্তের ইনফার্নোসুলভ ধোঁয়াটে অযান্ত্রিক একঘেয়ে ধ্বন্যালোকে নিক্ষিপ্ত হলাম।
    কাশতে গেলে দম আটকে আসছে চলন্ত সাইকেলে হঠাৎ ব্রেক কষার মতো। কোমরের কিছুটা ওপরে, মেরুদণ্ডের বামপাশে চিনচিনে বাঁকা ব্যথা। শরীরের অবনতি যখন ঘটে, হঠাৎই চক্রবৃদ্ধির সুদের হারে ঘটে। পাশ ফিরে শুতে গিয়ে একাদশ বারের চেষ্টায় বাম পা-টা একপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা গেলো হাঁটু ভাঁজ করে। দুর্যোধনের মত উরুসন্ধিতে ভোঁতা একটা ব্যথা নিয়ে ক্ষোভে, অভিমানে চোখখোলা জেগে রইলাম প্যারালাইজড একদলা মাংসের মতন। যেন থেঁৎলে যাওয়া কোন ঘোড়াকে ক্রেন থেকে নামিয়ে রাখা হয়েছে। জয় পরাজয়ের বাইরে যুদ্ধশিবিরের একপাশে; অনেক পিছনে। তারকার নিয়তির অনিবার্যতার মতো হাজার হাজার আলোকবর্ষ গভীর, খুড়ে রাখা কবরের পিচ্ছিল পাড়ে যেন নদীভাঙ্গন কবলিত পদক্ষেপে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ বন্ধ করলেই হেমন্তের মাগরিবের আজানের দিনশেষের কুয়াশাচ্ছন্ন শৈত্যপ্রবাহ মেরুদণ্ডে বয়ে যায় চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার অনুভব হয়ে। ফোন বেজে যাচ্ছে তো বেজেই যাচ্ছে। কক্ষের কোথাও কাঁপছে সশব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে উরুসন্ধির ভোঁতা ব্যথাটা প্রথমে বিদ্যুতস্পৃষ্টের হতচকিততায়, ক্রমে সাবানের বুদ্বুদের আকারে ফেনায়িত হয়ে উঠছে। চোখে জ্বলন্ত বিড়ির ছাই পড়ার সাথে সাথে যেভাবে পানি শিশিরের মত জমে ওঠে, সেভাবে জমে গড়িয়ে পড়লো চোখের কোনা দিয়ে। হাতের নাগালে ফোন পাওয়া গেলো না। ডানপায়ে ভর করে বা হাঁটু ভাঁজ করে বামহাতে চেপে ধরে ডানপায়ের গোঁড়ালি ও আঙ্গুলকে আগেপিছে করে, দেয়াল ও খাটে ভর দিয়ে কয়েক ঘন্টা পর ফোনের কাছে যাওয়া গেল।
    ওভারব্রিজে, রাস্তায় পড়ে থাকা ভয়ঙ্করদর্শন বিকলাঙ্গ ভিখারীদের মত মেঝেতে পড়ে রইলাম অদ্ভূতভাবে। এই অবসরে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। ফ্যান বা লাইটের স্যুইচ দেওয়া ছিলো না। সুতরাং আমার পরবর্তী অভিযান হয়ে উঠলো স্যুইচ টিপে অন্তত লাইটটি জ্বালিয়ে ফেলা। হতাশায় আরো কয়েক ঘন্টা গেলো মেঝের ধুলোয়, শীতে; ত্রিশঙ্কুর দশায়। এখন যদি বাইরে থাকতাম আর একটা ষাড় তেড়ে আসতো- কী করতাম আমি? ভেবে ভেবে শৈত্যপ্রবাহের দরুণ কম্পন ও ষাড়ের তাড়া খাওয়ার ভীতিতে ঘেমে নেয়া উঠলাম। গোড়ালিসহ পায়ের পাতা সিদ্ধ করার ডেকচিটার ছবি মাথায় চলে এলো। মোমবাতি কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতীয়টিও পুড়ে গিয়ে শেষ হয়ে কক্ষটিকে অন্ধকার করে দেয়াতেই স্পষ্টত দৃশ্যের ভেতরে চলে যেতে পারলাম।
    ভেজা লাকড়ির ধোঁয়ায় চুলায় স্থাপিত বিরাটকায় পাত্র। তাতে বাম পায়ের ছিন্ন পায়ের পাতা গোড়ালিসহ সেদ্ধ হচ্ছে। ডান পায়ে ভর দিয়ে চুলায় অগ্ন্যুদ্গমের উদ্দেশ্যে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছি অনবরত। ভেজা কাঠের, ডালপালার লাকড়ির কারণে সৃষ্ট ধোঁয়ায় চোখমুখ জ্বালা করছে। মশার কয়েলের ধোঁয়া ফুসফুসে ভর্তি হয়ে থাকা সকালের জ্বালাপোড়ার মতো। কেউ একজন কিছু পলিথিন, প্লাস্টিক দিয়ে গেলো পাশে। আগুন নাড়াতে গিয়ে ছিটকে পড়লো গলন্ত সেসবের কিছুটা ঠিক চোখের নিচের মাংসে। উত্তপ্ত কড়াইয়ের তেলে পানি না ঝরানো মাছের নিক্ষেপে যেভাবে তীরের মত ছিটকে পড়া তেল চামড়ায় ফোস্কা ফেলে, যেভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে ঘুমের মধ্যে বোবায় ধরার মত গোঁ গোঁ ধ্বনি মুখ দিয়ে বের হতে থাকে সেভাবেই কাটলো জানি না কত সময়। ধড়মড় করে ঘুম ভাঙলো যখন তখনও মাকড়সার জালের মত চোখেমুখে জড়িয়ে আছে বোবা কালার মতো নিহত বিহ্বলতা। আর হাই তোলার পরের কানের ভেতরের বায়বীয় বুদ্বুদের ভাল্ব; দুঃসংবাদের মত ঝাঁ ঝাঁ করে কিছুক্ষণ পর দারিদ্র্যের মত স্বাভাবিক হয়ে এলো।
    অবশেষে হামাগুড়ি দিয়ে স্যুইচবোর্ডের কাছে যাওয়া গেলো। এলইডি লাইট ঠিকমত জ্বললো না। নিঃশ্বাসে কম্পিত মোমের আলোর মতোই ঔজ্জ্বল্যের তারতম্য ঘটছে। মোটেই তা মোমের হলদে আলো নয়। সাদা ও অনিয়মিত বিরতিতে হতভাগার মত অনুজ্জ্বল ও ঔজ্জ্বল্যের তারতম্যের সাধক সে ম্লানালোক। স্তব্ধ অন্ধকার কক্ষে শেক্সপিয়রের নাটকের প্রেতাত্মা ও ডাইনি অধ্যুষিত ঝড় তুফানময় ট্র্যাজিক আশু ভবিষ্যতের পরিবেশের থেকে উঠে আসা সে আলোআঁধারি। ঠান্ডায় হাড়গোড়ের ব্যথা আরো বাড়তে পারে সেই ভীতিতে ফ্যান বন্ধই রাখলাম। কবন্ধের মতো গড়িয়ে প্রায় বিছানায় উঠে এলাম। জামাকাপড়ে মেঝের ধুলো, বিড়ির ছাই, গুটিকয় এলোমেলো চুল, চায়ের দাগ আর খিটখিটে মেজাজের ঝাল ঝোল লেগে আছে। জিহবা কড়কড় করছে বালিতে। সিলিয়াভেদী ধুলোবালিতে থেকে থেকে হাঁচির উদ্রেক হচ্ছে। তাতে প্রাণান্তের টানটান উত্তেজনা হুড়মুড় করছে। ভীতিবিহ্বল স্নায়ু হাঁচি আটকানোর সম্ভব অসম্ভব সমস্ত চেষ্টাই করে যাচ্ছে। হাঁচি আটকানোর অযাচিত, অবাস্তব সকল হাস্যকর প্রচেষ্টাকে ধুলোয় মিশিয়ে চেতনা বিবশকারী তীব্র ব্যথাটি দেহের সব হাড়ে হাড়ে স্প্লিন্টারের মতো গেঁথে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে দ্বিতীয় হাঁচিটাও আটকানো গেলো না নিঃশ্বাস বন্ধ করে, নাক চেপে ধরেও। নিজেকে তখন অত্যন্ত হাস্যকর, কাফকায়েস্ক মনে হলো। বিশাল পৃথিবীপৃষ্টের ক্ষুদ্র এক কোণে টিমটিমে ভাঙা আলোয় নির্বান্ধব, পরজীবী ও অভিশপ্ত।
    ধারদেনার কোন এক গভীর রাতে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকার ভয়ের তীব্রতায় ফ্যালফ্যাল করে কোটরাগত চোখে তাকিয়ে দেখলাম মশারীর পাশে ব্যথানাশকের স্ট্রিপ পড়ে আছে শুধু। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মরে যাওয়া মাসির অবহেলিত উদ্বেগের শ্মশানের রাস্তা ধরে যেন হাঁটছি। মনে হল দীর্ঘসময় পরে আবার শ্বাসক্রিয়া ক্রমে শুরু হলো হোঁচটের অনেক পরে। মনে হলো বিরাট বাঁচা বেঁচে গেলাম এই যাত্রায়। টেবিল হাতড়ে সিগারেটগুলো ভেঙে ফেললাম ফুসফুস, হৃদযন্ত্রের শাসানিতে। পানিও পান করা দরকার। এত দরকার আর কোনদিন মনে হয় নি। ব্যথানাশকের স্ট্রিপ থেকে ট্যাবলেট মুখে পোরে বোতল হাতে নিয়ে দেখলাম তা খালি পড়ে ছিলো; অনেকদিন ধরেই। মুখে কাদামাটির স্বাদ অগ্রাহ্য করে দুপায়ে বেড়িপড়া থাকলে মানুষ যেভাবে চলে সেভাবে এগিয়ে গেলাম ওয়াশরুমের দরজার দিকে। কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না তাই চাইলে আমি গড়িয়ে গড়িয়েও যেতে পারি পানির উৎসের দিকে। তবু হাতের তালু আর হাঁটুতে ভর দিয়ে চতুষ্পদের মতো এগোতে লাগলাম।
    ওয়াশরুমের বাইরে ভেজানো দরজার সামনে বসে মনে হলো শাওয়ারের সাথে গলায় কাঁটাতার পেঁচিয়ে যেকেউ একজন ঝুলে আছে নির্ঘাৎ। দরজাটা আলতো ঠেলে দিলেই অন্ধকার ভেদ করে নিথর শরীরটি দৃষ্টিপথে পড়বে। গ্রীষ্মে যত্নে রেখে দেয়া লেপের বস্তার মত হালকা বাতাসে দোদুল্যমান। ভাবতেই চেতনা অবশকারী শূন্যতা এসে মাথাটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে গেলো। সেকেন্ডের ভেতর শুনতে পেলাম সিঙ্কে টপটপ করে পানি পড়ার ক্রমবর্ধিষ্ণু শব্দ। নিজের উপর রেগে গিয়ে সজোরে ঘুসি লাগালাম দরজায়। ‘দুর্বল মস্তিষ্ক!’ ভেবে ভেবে নিজেকে গালি দিলাম যুৎসই যা যা পাই। স্থিতিস্থাপকতার দরুণ দরজাটি ভিতরে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরে এলো। না, ক্ষয়িষ্ণু, ঢিমেতালে আলোতে কোন অবয়ব দেখা গেলো না। কেবল ফোটায় ফোটায় পানি পড়ার একটানা শব্দ।
    দুর্বল শরীর মনে তবু ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। অনেক কষ্টে ফোনের লাইটের ঝাঁটার মতো তীব্র আলোয় ওয়াশরুম আলোকিত করে পানির ট্যাপের নিকটে গেলাম। ‘কী বোকা আমি!’ মনে মনে এত দুঃখেও পাগলের মতো হাসলাম। কিন্তু অন্য একটি চিন্তায় মস্তিষ্ক তখন অত্যধিক সচেতন হয়ে উঠলো। ক্যাপ খুলে পানির বোতল ট্যাপের নিচে রাখার প্রায় সাথে সাথেই মনে হলো, পানি নয়; তরল রক্তে বোতল ভরে গেলো। ঈষদোষ্ণ লাল রক্তের ঝাপটায় সারা ওয়াশরুম যেন ভেসে যাচ্ছে ট্যাপ বন্ধ করার আগেই। ছলকে রক্ত এসে পড়লো চোখেমুখে, মোবাইলের স্ক্রিনে।
    ভয় পেয়ে চিৎকার করার পরিস্থিতি থাকে না অনেক সময়। আমার সে রেওয়াজও নেই। অতএব, রাগে, বিরক্তিতে মাথাটাকে বার দুয়েক ঝাঁকুনি দিলাম প্রবলভাবে। শার্টের হাতা পানিতে ভিজে লেপ্টে আছে হাতের সাথে। বোতল পানিতে ভরে গিয়ে ছিটকে পড়া পানিতে সারা শরীরে শীত শীত লাগছে। অহেতুক, সম্পর্কহীন এক গানের কলি নির্বিচারে এই গভীর রাতে গাওয়ার চেষ্টা করলাম চিন্তাকে ভিন্ন কোন পথে ভেড়া তাড়ানোর জন্য। রাস্কলনিকভের চিন্তার মত সংকীর্ণ বাসাটির নানা দিকে তাকালাম। ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন ও পাপোদ্রেককারী। জব সল্যুশন, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এক কোণে পড়ে আছে ঘাড় গুঁজে। ওয়াশরুমের দরজা ছিটকিনি আটকে বন্ধ করে দিলাম। তা করতে গিয়ে একবার মনে হল আমি ভেতরে থেকেই ভেতরের দিককার ছিটকিনি বন্ধ করলাম না তো? সত্যিই কি তাই? আমি কি ওয়াশরুমের বাইরে নই? সন্দেহবশত দরজা খুলে আবার বন্ধ করলাম। ‘এবার ঠিক আছে!’ কিন্তু সাবান, বালতি এসব বাইরে কেন? ধুর! এজন্যই দরকারের সময় খুঁজে পাই না কোথায় কী রাখি। ব্রাশ, চিরুনি- যেসব ছাড়া আমি চলতে পারি না সেসব অবশ্যই ওয়াশরুমের আয়নার ধারেকাছে রাখতে হবে। ওষুধ খেয়েছি। সুতরাং ঘুম থেকে ওঠার পর যদি দেখি ব্যথা কমেছে, তখনই বাসাটিকে গুছিয়ে পরিষ্কার আর কাজের উপযোগী করে নিতে হবে। কিন্তু এখনো কি আমি ওয়াশরুমেই? তাই তো! এই যে আয়নায় হেলান দিয়ে রাখা ফোন থেকে তীব্র আলো মুখে এসে পড়ছে! আলোর মুখোমুখি দাঁড়ালাম এক পায়ে ভর করে।
    ঠিকঠাক সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। বাম হাতে বাম পায়ের হাঁটু ভাঁজ করে মোরগ লড়াইয়ের মতো করে ধরে আছি। সিঙ্কের ওপরের আয়নায় হেলানো ফোন থেকে আলো চোখে এসে পড়ছে। দর্পণে মুখ দেখে মনে হচ্ছে খুব ফ্যাকাসে। অবিকল আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে বঞ্চিত, অবহেলিত এক হতভাগ্য। শুরুতে কৌতুক অনুভব করলেও ক্রমে ভীতির উদ্রেক করলো তা। চেতনাজুড়ে কেবল নিজের মুখোমুখি প্রচ্ছায়ার ছায়া। জিহবায় রক্তের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে। কেঁটেছিড়ে গেছে মুখের ভিতরের কোথাও। কুকুর দাঁতের ভেতর দিককার মাড়িতে জমাট বাঁধা এক চিলতে কালচে হয়ে আসা রক্তের ধারা আবিষ্কারের নেশার মতো পেয়ে বসেছে। আয়নায় দেখে মনে হলো সদ্য জবাই করা চতুষ্পদের তির্যক দুপাটি দাঁত নিয়ে চোয়ালটি ঝুলে আছে ঘাড়ের ওপর। যেন মৃত ঘোড়ার মুখের কঙ্কালের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। ঘোড়াটিকে একটা ভেঙচি কাটার লোভ সামলানো গেলো না। কিন্তু ভেঙচিটা এতো দুর্বল মনে হলো যে, মনে হলো কেবল জিহবাটি অনেক বের হয়ে দালির গলে যাওয়া সময়ের মতো হা করা মুখের এককোণ দিয়ে গড়িয়ে আটার খামিরের মত ঝুলছে। নিস্তব্ধ নিশুতির কোথাও হাওয়া নেই, শব্দ নেই, দৃশ্যান্তর নেই। শুধু ফ্রিজ থেকে বের করা সদ্য ধড়কাটা ঘোড়ার ছিন্ন মুখের কঙ্কাল।
    উৎস সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে দেখি, অনিশ্চয়তার বোধজাত ভীতি ও বিমর্ষতা থেকে অবিশ্বাস ও ধ্বংস, আরণ্যক ব্যক্তির সাথে আদিম রাশিফলের মতো আমার গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে নিয়তির জাল ছড়িয়ে রেখেছে। পরিবেশে ঘটমান দুর্ঘটনাসমূহ এত অধিক মাত্রায় দৃষ্টান্তস্বরূপ যে, পথ চলতে মোটরে থেঁৎলে না যাওয়া, ঘরদোড় পরিষ্কারের কালে ফ্যান, লাইট ঘাঁটতে গিয়ে বিদ্যুতস্পৃষ্ট না হওয়াই অমূলক মনে হয়। সিলিঙ ফ্যানের ব্লেডের নিচে শুয়ে থাকতে থাকতে বহুদিন মনে হয়েছে এই বুঝি ডালপালাসহ ফ্যানটি নাকের ডগায় উত্তপ্ত কয়েল নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। যদিও কোনদিন ঘটে নি, তবু তা আশার সূত্রের মতো ক্ষীণপ্রাণ সম্ভাবনায়ও ভাস্বর। দুর্ঘটনাবশত রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে এতদিনেও উড়ে গেলাম না, প্রত্যঙ্গগুলো বহাল রয়েছে- এ এক আশ্চর্যের স্বাক্ষর। প্রতিদিন বসি ঝাঁকড়া যে বৃক্ষের মৃত, বিপুল, রেলের স্লিপারের মত ভারী শাখার নিচে, যেদিনটিতে বসে থাকিনি সারা দিনমান, সেদিনই ভেঙে পড়লো অনিশ্চয়তার সকল গ্রন্থি মোচন করে। নেকড়ের মতো ছোঁ মেরে কোন মোটরযান রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অপরাধে চলমান আমার কোন প্রত্যঙ্গ ছিনতাই করে ছিটকে পালালো না আজো। ফ্যানের কলকব্জার কোনকিছু গরম হতে হতে মোমের মত গলে পড়ে যাবে মুখের চামড়ায়- চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে সংস্কারনিষিদ্ধ সেই সম্ভাবনার অনিবার্য ইতিবাচকতার ব্যাপারে ভাবি। কতই না সম্ভবপর, সহজ সে সঙ্ঘটন! চমৎকৃত লাগে ভেবে।
    ‘যাক। বড়ো বাঁচা বেঁচে গেলাম!’ শুয়ে শুয়ে স্থিরীভুত সিলিঙের কপালে তাকিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগে থেকেই ফ্যান বন্ধ রয়েছে মনে হলো। পরীক্ষা করার জন্য স্যুইচটা অন করে অফ করে দিলাম। গটগট করে ফ্যান ঘুরতে গিয়ে থামলো। না; ফিউজ হয় নি; কয়েল নষ্টও হয়ে গেলো না। জটায়ুর মতো পাখা ভেঙে ব্লেডধারী ঘটোৎকচ হয়ে কক্ষের যত্রতত্র ছিটকে পড়লো না কৌরব আমার ঘরে। যা আমাকে অনায়াসে চাপা দিতে পারতো। কানের একটিকে ছিড়ে ফেলে দিতে পারতো। অন্তত আহত করতে পারতো খুব বাজেভাবেই। মগজে পাখার ব্লেডগুলোর একটি ছেড়া অংশ ঢুকে পড়তে পারতো না কে সে নৈর্ব্যক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করবে? রোদ্যাঁ যে মানবদেহকে চলমান মন্দির বলে ধর্তব্য করেছিলেন, তাতে হামলা হলে কবি ও বৈজ্ঞানিক, শিল্পী ও সাধকের অন্তর্সত্তায় ফাঁটল না ধরে কি আর পারে? যেকোন ব্যক্তিবিশেষ, আমার ক্ষেত্রেই কি আমি শরীরকে অতিক্রম করে যেতে পারি? অনেকে পারে; নিউটন, লিংকন আছেন। আরো অনেকে আছেন। আমার মতো যেকোন মানুষ আমি নিশ্চিত যে, বাস্তব আমি, ধারণায় যা-ই থাকুক না কেন, ধারণার আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারি না। হাওয়ার সমুদ্রে যে ডুবে আছি ফুসফুসের প্রতারণার আগপর্যন্ত তা মাথায় থাকে না। অসুখের আগেই সুস্থতার মূল্যমানের মেশিন কাজ করে না।
    ব্যথা সহ্যসীমায় আসা পর্যন্ত আমাকে শুয়েবসে কাটাতে হবে। ঘুম আসছে না ব্যথাটি সামান্য নড়াচড়াতেই সূঁচের মতো বিঁধছে বলে। চোখ যেই ঘুমে আটকে আসছে, বেদনার একেকটি ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বুকে, পিঠে, জঙ্ঘায়, হাঁটুতে। আগে ঠান্ডা বা গরমের কারণে অসুখের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটতো না; সম্প্রতি অমাবস্যা পূর্ণিমাতেও জোয়ারের মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে দুঃখের মোহনা।
    হারিকেনের সলতে উসকে দেয়ার মতো বারবার মোমবাতি জ্বালাতে হচ্ছে; না-ঠিক না-বেঠিক লাইটের মধ্যবিত্তসুলভ দোটানা আদবের জন্য। প্রায়ান্ধকার কক্ষে শুয়ে থেকে মানবজীবনে গ্রহ নক্ষত্রের অমূলক প্রভাব কল্পনা করার মত যথেষ্ট অবকাশ পাওয়া গেলেও অধিক সময় তাতে বুঁদ হয়ে থাকা সম্ভব ছিলো না। বিশ্বের বিশালতা ও আপনার তুচ্ছতার আগ্রাসী বোধ সর্বপ্রাণবাদের অনুকূলে তবু বয়ে যেতে থাকে। ইট কাঠ লাইট ফ্যান ইলেক্ট্রিসিটি সকলেই যেন ষড়যন্ত্রের একশেষ করে রেখেছে। অর্থনীতির যে অনিরাপত্তা মানসকাঠামোকে ব্যাপ্ত করে আছে, তারই ব্যষ্টিক, নগণ্য এক চাল বলে মনে হলো চেতনাপ্রবাহকে।
    প্রায় নিঃশেষিত মোমের কম্পমান শিখা আর দপদপে ভাল্বের আলোয় স্পষ্ট অনুভব করলাম সিলিঙ ফ্যানের ব্লেডগুলো চঞ্চল হয়ে উঠলো। জীর্ণ, প্যারালাইজড বৃদ্ধের মতো ঠকঠক করে লাঠিতে ভর করে অসংলগ্নভাবে দাঁড়ানোর মতো তিনটি ব্লেড নিয়ে পাখাটি ঘোরার যেন চেষ্টায় রত। ধপ করে হুইলচেয়ারসমেত ভারসাম্য হারানো বৃদ্ধ (বা ফ্যান) হুড়মুড় করে ইলেক্ট্রিকের তার, সিলিঙের আংটাসহ ভেঙ্গেচুরে বিছানায় শুয়ে থাকা আমার মুখের উপর সাঁই করে পড়লো কিছু বুঝে উঠার আগেই।
    চোখদুটি ঘুমে লেপ্টে আসছিলো সেই অসচেতনায় ঘাড়ের পেছনের দিকে অকস্মাৎ টান পড়েছিলো তীব্র তীক্ষ্ণতায়। ধড়মড় করে উঠতে গিয়েই বরং আর্থ্রাইটিসের ব্যথাটি ভয়াবহতা লাভ করেছে। প্রেতের মতো হন্তদন্ত ছায়া নিয়ে মোমবাতি মাত্রই নিভে গেলো। এক পা আগানো, এক পা পিছানোর মতো ভাল্বের আলো জ্বলছে আর নিভছে। হাঁটুর ভোঁতা আর কোমরের মারাত্মক সূঁচালো ব্যথাটি কমে এসেছে। কিন্তু ঘাড় সামনে পিছনে পাশে কোনদিকেই নড়ানো যাচ্ছে না অসহ্য শোকে। একদিকে আড়ষ্ট হয়ে কাত হয়ে আছে গ্রীবা। কোনরকমে ওপরে তাকিয়ে দেখলাম ফ্যান যেখানে থাকার সেখানেই অথর্ব রয়ে গিয়েছে। তাইলে কেন মনে হলো তা ভেঙ্গেচূরে মাথায় এসে পড়লো? আমি কি শক্তসমর্থ টেকসই কোন কিছুতে ফ্যান ঝুলে থাকার স্বাভাবিক যুক্তিবোধ থেকেই চ্যূত হয়েছিলাম? না কি ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী তথা মানুষের প্রতিই আস্থা হারিয়ে ফেলেছি? হতে পারে স্বয়ং নিজেরই প্রতি ভরসা উবে যাচ্ছে ন্যাফথালিন হয়ে কর্পূরের মতো। বস্তুপুঞ্জের বৈজ্ঞানিকতায় অনাস্থা জ্ঞাপনেও হবে হয়তো। এতো এতো ভঙ্গুরতা কই থেকে যে আসে!
    ঘাড়ে ব্যথা নিয়েই কক্ষের থেকে বের হয়ে ছাঁদে উঠে এলাম। পূর্ণিমার আলো মৃদু বাতাসকে মদিরতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ঘাড় ঘোরাতে পারছি না বলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো লঞ্চের হেডলাইটের অনুরূপে শরীরটিকেই মেরুদণ্ডকে অক্ষ করে চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুভুক্ষু মগজে গেঁথে নিচ্ছি অফুরন্ত শরের মতো চাঁদের আলো আর তারাদের সুদর্শন চক্রসমূহ।পেঁচা বসে আছে বৃক্ষের যেখানে সুবিধা। সাপের মতো হিসিয়ে উঠলো একবার এই আলোআঁধারির রাতে। শাল, সেগুন, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠাল, আম, বেলগাছগুলোর অবয়ব মাত্র দৃশ্যমান। নিকটেই নারকেল গাছের সারিতে, কলাগাছের সারিতে চাঁদের আলো কুয়াশার মত মেঘমালা হয়ে আছে। শিশির ঝরার মতো বৃষ্টির ফোঁটায় লতাপাতা থেকে শিশির ঝরছে। তলস্তয়ের তিন সন্ন্যাসীর মতো চাঁদের আলোয় পিছলে যাচ্ছে বাঁশপাতা। কচু, কলমি, লেবু, বেনামা অনেক লতাগুল্মের ঝোপঝাড় থেকে আলোর ধাক্কা গায়ে এসে লাগছে। ঝোপ থেকে, ধানক্ষেত আর ঘাস থেকে, বীরুৎ ও গাছালি থেকে মাঝেমাঝেই ভেসে আসছে না চেনা পাখির সন্ততির শিস। ঝাউগাছের ডালপালা ছড়িয়েছে অক্ষিগোলকের মতো চাঁদের শামিয়ানায়। চাঁদের বুকের ওপর দিয়ে বাদুড় উড়ে যাচ্ছে থেকে থেকে; ডানায় নিরবতা নিয়ে। আরো দূরে শিয়ালের অশ্রান্ত ডাকাডাকি। চোর আর গৃহস্থ কুকুরের প্রহেলিকাময় উৎকণ্ঠা বাতাসে ভেসে আসছে। অবিশ্রান্ত ঝিঁঝিঁ ডেকে যাচ্ছে থামতে না চাওয়া শিশুদের কান্না ও প্রার্থনার মতো। ভূতের মতন একটি পাগল বাজার থেকে রাস্তা ধরে কবরের পাশের রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। হয়তো বহুদূর তারকার কোন একটিকে লক্ষ্য করে পরিব্রাজকের মতো, যুধিষ্ঠিরের মতো, কুকুরসমেত নদীতীর ধরে স্বর্গের সোপানের উপকূলবর্তী সে। তার চোখে তাড়া নেই, বিষাদ নেই, এমনকি গন্তব্যও না থাকতে পারে।
    আর আমি? এইসব থরোথরো আবেগের মাঝখানে, নক্ষত্ররাজির অনেক নিচে, দাঁড়িয়ে আছি অনিশ্চয়তা-আক্রান্ত, দুর্ঘটনাপ্রবণ, পুঁজিপিষ্ট এক ব্যক্তিকতা।

    8
    4 Comments
    • অসাধারন কাব্ব্য রচিত করেছেন ধন্যবাদ

    • বাস্তবতা বড় বেরসিক হলেও গল্পটা বেশ ম্যাজিকাল লাগলো! চোখে আলো জ্বেলে গল্পের পিছু পিছু অনেক দূর এসে পড়লাম! অবশ্য ফিরে যাবার তাড়া নেই! আরো গল্প হোক!

    • ভালো লিখেছেন।

    • গল্প হচ্ছে বাক্যেরনিপুন খেলা। লিখে যাও। অভিনন্দন।

Skip to toolbar