Profile Photo

অন্তুOffline

  • Md-Baitul-Amin
  • Profile picture of অন্তু

    অন্তু

    4 years, 11 months ago

    “ রুশো, এই রুশো “ রুশোর মা খুব ভোরে এসে দরজাই করাঘাত করলো। কিন্তু রুশো এখনও সকাল হয়েছে তা মেনে নিতে নারাজ। “ আহা আম্মু ঘুমোতে দাও তো, কেবল মাত্র ৭ টা সাম্থিং”।
    তোকে এতো সকালে তোলার ইচ্ছা ছিল নারে, কিন্তু একটা দুঃসংবাদ আছে বাবা। রুশো ভাবলো কী আর হবে হয়ত উদ্ধার করে আনা চড়ুই পাখির ছানা তার পোষা বিড়াল মিনি খেয়ে ফেলেছে। “ “তোর সুমন ভাই কাল রাতে মারা গিয়েছে রে , একটু উঠে পাশের বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে একটু দেখা করে আই, তোর বাবা সেখানেই আছে” হাল্কা তবে জটিল-মিশ্র অনুভুতিতে রুশোর মা বলে গেলেন। খুব সম্ভবত রুশোর শরীরে একটা স্পিরিচ্যুয়াল ঝাকুনি লাগলো। সেই ঝাকুনিটা না বেশী ভারী, আবার না বেশী হালকা। সুমন ভাই ব্যক্তিটা খুব বড় কিছু নয়, তবে আজ যখন তাঁর নামের পাশে মৃত শব্দটির ব্যাবহার করতে হবে রুশো ভাবলো ঠিক কথাটা ভেবেই তাঁর শরীরে ঝাঁকুনিটা সঞ্চার হয়েছিল।
    সুমন রুশোদের সামনের বাসাই থাকে। সুমনের বয়স প্রায় রুশোর থেকে ২০-২২ বছর বেশী। সুমনের মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ছিল না। দিন কতক আগে সুমন তার মানুষিক অবস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। সব সময় কারো না কারো সাথে কথা বলতো। কাল্পনিক চরিত্র হবে হয়তো। আবার ফ্রেগোলি ডেল্যুশন (Fregoli delusion) হতে পারে। ‘ফ্রেগোলি ডেল্যুশন’ বা ‘দ্য ডেল্যুশন অব ডাবলস্’ এমন এক ব্যাধি যেটাতে আক্রান্ত হলে রোগী সবসময় কল্পনা করতে থাকে যে, তার আশেপাশে মুখোশধারী সব মানুষেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাকে অনুসরণ করছে। নিজের কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বা একই ব্যক্তি মুখোশ, মেকাপ এবং পোশাক বদলে নিজের চেহারা পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে অনবরত অনুসরণ করছে।এই সিনড্রোমটির কথা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৭২ সালে। সেসময় এক কিশোরী মেয়ের দেখা পাওয়া যায়্ যে কল্পনা করত, সে যে থিয়েটারে নাটক দেখতে যায় সেখানকার দু’জন অভিনেতা তার পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির বেশ ধরে তাকে প্রতিনিয়ত অনুসরণ করছে কোন উদ্দেশ্য হাসিলের অভিপ্রায়ে।অ্যানিমেশন মুভি “অ্যানোমালিসা”তে এ রোগের আংশিক কিছুটা উপস্থাপন রয়েছে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার ছিল সুমন অন্যান্য অবস্থায় একদম স্বাভাবিক। তাকে দেখলে বুঝাই যেত না তার এমন মানুষিক সমস্যা আছে। রুশো কখনও তাকে নিয়ে এতো ভাবত না। কারণ মানুষটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাজার-ঘাঁট করতো। ইভেন কারও সাথে সে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি অবধি। রুশো শুয়ে শুয়ে আরও ভাবছে এই মানুষটা দোকানে যখন যেত তখন তার মনেই হতো না সুমন ভাইয়ের এমন সমস্যা। অন্য সকলে বলতো সুমনের ভাইয়ের সাথে জীন ছিল। বিশ্বাস করতেও হল, কারণ এসব তো আর নিছক কিছু নাই। এমনি সাইন্স আজ পর্যন্ত এই ব্যাপারগুলোর খোলাসা করতে পারেনি।
    যাইহোক রুশো তার দিনের সব কাজ একে একে সেরে ফেললো। লাশ বাড়িতে যাবার হাবিট আবার রুশোর ছিল না। তাই সে মনে মনে ভেবেই নিলো সুমন ভাইয়ের জানাজা ইসারের পরেই হয়তো হবে। কারণ সুমন মারা গিয়েছিলো পাবনা পাগলা গারদে। রুশো আবার ভাবে মানুষটা খুব অদ্ভুত ভাবেই হারিয়ে গিয়েছিলো নাকি সে কখনো জানতে চাই নি মানুষটা কোথাই? তাজ্জবের ব্যাপার এলাকাই কেও জানতো না সুমনকে পাগলা গারদে পাঠানো হয়েছে। রুশোর মনে হালকা সাসপেন্স জাগল “ তাহলে কি হলিউডের মুভির মতো সুমন ভাইয়ের ওপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়েছে , যার ফলে সুমন ভাইয়ের অক্কা পাওয়া। যাহ্‌ এসব আবার বাংলাদেশে হবে নাকি কি সব ভাবি। “ কিছু দিন আগেই রুশো আবার লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত শাটার আইল্যান্ড মুভি দেখে একটু কন্সাশ হয়েছিলো। অবশেষে রুশো জানাজাই গেলো। কিন্তু তখন অবধি রুশো সুমনের মুখ বিবর দেখে নি। দেখতে ইচ্ছাও হচ্ছিলো না। একে একে সুমনের সব গুরুজন কথা বলছে। কাতারে দাঁড়ানো সারি সারি মুসল্লি। সামনে সুমনের খাটনি। সাদা কাফনের কাপরে জোরানো সুমনের লাশ। অপরে কালেমা লেখা একখানা জায়নামাজের মতো বস্ত্র। রুশো আবারও ভাবতে লাগলো
    একজন মানুষ যখন আখিরাতের পথে যাত্রা করে তখন সে বাক্তিটি হয়ে যায় এলাকাই কেন্দ্র। হি ইস নান বাট এ ফ্যাক্ট সাবজেক্ট অফ পিপলস গসিপ। তার জীবিত থাকা কালিন সকল আচরণ বিচরণ সব কিছু নিয়ে মানুষে কথা বলে, আফসোস করে, ফাঁকা জাইগা নিয়ে ভাবে তার অভাবের কারণ ভাবে, তার অতীত নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলে। এ যেন এক সামাজিক মিথস্ক্রিয়া। খুব অবাক লাগে একটু আগে যে মানুষটা কারো বাবা, কারো ভাই, কারো সন্তান এবং নানাবিধ সম্পর্কে মরলে জড়ানো ছিল সে মানুষটা ফুট করে যেন কোথায় উড়ে গেল। তার কাপড়, তার ঘর, তার ফেলে যাওয়া টাকা-পয়সা এসব জীবিতই থেকে গেল মাঝখান থেকে মানুষটা উবে গেল। ঠিক যেমন কাপড় ধোয়ার পরে রোদ্দুরে শুকাতে দেওয়া হয় তার মত তার দেহ খান পড়ে থাকে। একটু পর হুজুর তার বক্তব্য শুরু করলেন
    “ এই পরিবারের সাথে আমার সম্পর্ক একটু অন্যরকম। আপনারা সবাই জানেন মাইয়াতের বাবা উনি হলেন আমাদের এই অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি। একজন বাবাই জানে তার সন্তানকে হারানোর বেদনা। যুগে যুগে বহু নবী বহু সাহাবী তাদের সন্তানকে ক্ষয়েছেন। মহান রাব্বুল আলামিনের মায়ার ভান্ডার বিশাল বড় যার একটা সিকি তিনি আমাদের মাঝে দিয়েছেন। তাতেই আমাদের এতো মায়া এতো মহব্বত। ভাইরা আজ কজন আমরা সেই আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের কথা চিন্তা করি। চিরদিন কেউ দুনিয়ায় থাকবনা। সবাইকে একটা না একটা সময় যেতেই হবে। কিন্তু সে পথ খুব সহজ না। এ দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। এখানে যেমন কর্ম আখিরাতে তেমন ফল। আজ মানুষ দুনিয়া নিয়ে এত ভক্ত যে তারা দিনের ভক্ত হতে অনেক অনেক দূরে। আল্লাহ সেই বিচারের দিন সবাইকে জিজ্ঞেস করবে
    ‘হে বান্দা আমি তোমাকে জ্ঞান দিয়েছিলাম আমি তোমাকে বিবেক দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি সেই জ্ঞান বিবেক দিয়ে আমাকে ভাবো নি , মানুষের উপকারের কথা তুমি ভাবো নি, ভেবেছ নিজের আরাম-আয়েশের কথা। তাই আজ তোমার বাসস্থান হবে জাহান্নাম”। তাই ভাই সকল সবাই একটু দ্বীনের পথে আসি। সবাইকে অশ্লীল কাজ কারবার থেকে বিরত রাখি, ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি বন্ধ করি। একটু পরেই এই মাইয়াতকে গভীর অন্ধকার কবরে রেখে তিন মুঠো মাটি দিয়ে সকলে তার নিজ নিজ জায়গায় চলে যাইবো। কোথায় থাকব আমার টাকা আমার গাড়ি আমার বাড়ি আমার সন্তান? কেউ ৩ হাতে কবরে সাথী হইবো না। সাথী হইবো কি? ইবাদত। তাই ভাই যতক্ষণ জীবিত আছি আখেরাতের জন্য কিছু গোছাইয়া লই। “ এর পরেও মাওলানা সাহেব আরও কথা বললেন। কিছু মানুষের বিরক্তির ভাব জেগে উঠলো কারণ এই জগতে তাদের অনেক কাজ। এটা মাত্র একটা রিচুয়াল। তেমন কিছু না মানুষকে বলা যাবে আমি তার জানাজাই ছিলাম তো। রুশো ভাবতে লাগলো ধর্মের কথা গুলো কিন্তু মন্দ নয়। সব ধর্মে প্রায় একই কথা। আর সেটা হল নির্দিষ্ট সৃষ্টিকর্তার আদেশ পালন করা তাঁর ইবাদত করা। সকল ধর্মের কথাই সমান যেমন শান্তি, মানুষের সাথে সুসম্পর্ক, একে অপরকে সাহায্য করা, ঝগড়া-বিবাদ অশান্তি করা। সকল ধরনের নীতি কোথায় সকল ধর্মের উল্লেখ। কোন ধর্মে অবিবেচক কিছু বলা হয়নি। ধর্মে ধর্মে এত রেষারেষি কেন? আবার মানুষ অ্যাথেইস্ট ইবা হয় কেন? ধর্মত শৃংখলার কথা বলে। শৃংখল জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে। কথায় আছে শৃঙ্খলাহীন মানুষ পশুর সমতুল্য। অপরাধী নাস্তিকেরা কেন তাদের প্রিয়জনদের সাথে সহমরণে অথবা কফিনে যায় না কেন? তারা যখন সৃষ্টিকর্তাকেই বিশ্বাস করে না তাহলে কেনইবা মৃত্যুকে বিশ্বাস করে? গ্রীক মিথলজিতে মানুষের জীবনটা এরকম ভাবে দেওয়া আছে – মানুষের জীবন গাছের মত ছিল। আকাশ থেকে বীজ বর্ষিত হতো সেখানে থেকেই তাদের বেড়ে ওঠা। সেখানে এটা ছিল না শারীরিক মিলন এসবের কারণে একটা মানুষের জন্ম হয়। সকল ধরনের মোটিভেশনাল স্পিকারাই তো বলে জীবনের উদ্দেশ্য রাখা উচিত। কিন্তু সে উদ্দেশ্য মূলে কি থাকে? অবশ্যই পুরস্কার সেটা হতে পারে উন্নত জীবনযাপন, অনেক টাকা পয়সা অথবা অনেক খ্যাতি ইত্যাদি। ঠিক ধর্মে পুরস্কারের কোথাই বলেছে। ভালো কাজের জন্য জান্নাত আর খারাপ কাজের জন্য জাহান্নাম। যারা ধর্মে বিশ্বাস করতে চায় না তারা মূলত অহংকারী। বিকজ দে নেভার অবিড বায় সামঅয়ান। কিন্তু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অহংকারী শব্দটি নেগেটিভ। যার আত্মিক অর্থ ঈর্ষা, ধ্বংস , মানবিক অবক্ষয়। “ Life is a waiting game. It doesn’t matter what you do or what you did, you can take nothing but your good deeds and humanity. We are all waiting for death.” সুমন ভাই আজ বড্ড বেশী একা। সবাই তাকে মাটির নিচে রেখে ফিরলাম। যে যার আস্তাবলে অধিষ্ঠিত হলাম। আর কখনোও সে মানুষটাকে নিয়ে ভাববো না , কখনো ঘরের পিছনের জানালা খুলে দেখবো না তার কাল্পনিক বাক্য আলাপ। এ যেন বিদায় সূচনা সম্ভাষণ।

    ” বিদায়ী সূচনা”
    ✍️অন্তু
    “৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮”

    7
    4 Comments

Friends

Skip to toolbar