Profile Photo

Fahmida-Reea-Fahmida-ReeaOffline

  • Fahmida-Reea-Fahmida-Reea
  • Profile picture of Fahmida-Reea-Fahmida-Reea

    Fahmida-Reea-Fahmida-Reea

    2 years, 9 months ago

    নিভিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ

    কন্ঠটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। এমন কি ভঙ্গিমাটাও বড্ড পরিচিত। কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে গাছগুলির পরিচর্যা করতে করতে বেডরুম থেকে ভেসে আসা গানে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল বারতা।  থেমে যাচ্ছিল হাত বার বার। সেই ভরাট কন্ঠে  –
    “গোপন কথাটি রবেনা গোপনে
    উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে – -”
    অনেক দিন পর আজ কেনই বা এমন করে মনে পড়লো ? এতটা বছরে মনের ফুরসত তো মেলেনি বারতার। সেই যে বিয়ের পর কটা মাস শ্বশুর বাড়িতে নতুনের সঙ্গে পরিচিত হতে না হতেই শাশুড়ি মা তোড়জোড় করে বারতাকে স্বামীর কাছে প্রবাসে পাঠিয়ে দিলেন। তার পরের দিনগুলোতো সংসারের অষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাওয়া। বছর গড়ায় সংসার বাড়তে থাকে আর বাড়তে থাকে মধুর ব্যস্ততায় মোড়ানো প্রতিটি ঘন্টা মিনিট সেকেন্ড। একে একে ছেলে মেয়েরা বড় হতে থাকে।

    একসময়  ফেরার সময় হলো। একসাথে কাটিয়ে ফিরলো স্বদেশে স্বগৃহে। সেদিনের বিশাল বাড়িটা তেমনিই আছে। শুধু মানুষগুলি নেই। শাশুড়ি মা গত হয়েছেন কবেই, তিন ভাই আপন আপন গন্ডিতে বাঁধা। আসিফ-বারতা স্মৃতি চারনে প্রায় আবেগ আপ্লুত হয়।

    প্রবাস জীবনের দিনগুলিতে নিজেদের গন্ডিটা ছিল ছকে বাঁধা আর খুব বেশি ঘেঁষাঘেষি। বাচ্চারা অভ্যস্ত হয়েছিল সময়ানুবর্তিতা আর চটজলদি কাজের নির্দেশিকা অনুযায়ী। এরি মধ্যে উইক এন্ডের হুল্লোড়টা ছিল উপভোগ্য। মুক্ত স্বাধীন চার দেয়াল ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে। কখনো বা কোনো সি-বিচের মন মাতানো প্রকৃতিতে, কিংবা দুর পাহাড়ের হাতছানি দেয়া ধু ধু প্রান্তরে, কোনো কৃত্রিম লেকের পাড় ঘেঁষে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য।কখনোবা শুধুই লং ড্রাইভ। এক শহর থেকে আর এক শহরে। একটু আধটু কেনা কাটা। বিভিন্ন দেশের রেষ্টুরেন্টের বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ। আবার কখনোবা শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে স্বদেশির দেয়া পার্টিতে অংশ গ্রহন। প্রাণ খুলে মায়ের ভাষায় কথা বলার তৃপ্তিই আলাদা।

    ‘গোপন কথাটি রবেনা গোপনে’ – – গানটি থেমে গেছে অনেক ক্ষণ। কিন্তু রেশটা যেন আছেই। পাশের রিডিং রুমের বইয়ের আলমারির কোন ঘেষে রাখা জলচৌকির ওপর তানপুরাটা। কতগুলো বছর বসা হয়না। ধূলো ঝাড়তে গিয়ে তারে আঙ্গুলের ছোঁয়া লাগে। মনের ভেতর গুন গুনিয়ে ওঠে, রবীন্দ্রনাথ। সুরের আবেশে আবেশিত বারতার মন চলে যায় মনোজ’দার গানের আড্ডায়।

    ভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই এখানে আসা যাওয়া অব্যাহত রেখেছিল বারতা। পহেলা বৈশাখ, ফাগুন, বর্ষা বরণ, বসন্ত উৎসব আরো কতযে ছুতোয় অনুষ্ঠান হতো বারতাও অংশ নিতো। লেখাপড়ার পালা শেষ হবার পরও প্রাইভেট হোষ্টেলে থেকে বি সি এস কোচিং করবার ফাঁকে ফাঁকে মনোজদার গানও চালিয়ে গেছে বারতা সপ্তাহে একবার করে হাজিরা দিয়ে।

    সেদিন সবার মত বারতারও চোখে পড়লো নতুন সদস্যটিকে। মনোজদারই আবিস্কার। একহারা গড়ন, হাসি হাসি মুখ, গভীর চাহনি আর চমৎকার কন্ঠ। শুনলে মনে হয় বারতার প্রাণের গানগুলি যেন গেয়ে ওঠে। এভাবে কখন কিভাবে মননের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বারতার মনে নেই। টিন এজের মোহাচ্ছন্নতা কিংবা লকোচুরির মাদকতার বয়সও ছিলনা সেটা। অথচ মন নিজের অগোচরেই কি এক ভাল লাগার পানে ধেয়ে যাচ্ছিল দ্রুতই। কারন একটাই, রবি ঠাকুর। সেই পুরোনো ভালবাসা। মাত্র তিনটি মাসেই বয়ে চলে ভাল লাগাগুলি মননের কন্ঠের সুর আর গানে। তার ভরাট কন্ঠ যেন বারতার মন বুঝে সুরে সুরে কথা বলে। বারতার মুগ্ধতা মননের অনুভবে অনুরণন তোলে।

    বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। ফিরিয়ে দেয়না বারতা। কথার পিঠে কথা হয়, গানের পিঠে গানও। এক সময় বারতা খেয়াল করে দিন গুলো মননময় হয়ে উঠেছে। ভাবনা জুড়ে শুধুই মনন। সপ্তা শেষে অপেক্ষায় রাখে মনোজদার গানের আড্ডা। ভাললাগা এভাইে এগুচ্ছিল ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনি’ এই সুরে প্রকৃতির সবুজে নিজেকে হারিয়ে ফেলার অনুভব ছুঁয়ে দেয় কর্ণকুহর। ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুরো হাওয়ায়’, সুরে বারতা ভেসে বেড়ায় বুড়িগঙ্গার বুকে নাও ভাসিয়ে। এমনি করে প্রতিনিয়ত মানস চোখে ভেসে বেড়ায় পাখিদের নীড়ে ফেরা আর সূর্যাস্ত দেখার অনাবিল আনন্দ বারতার দুচোখে। হয়তো বা এভাবেই একটু একটু করে ভালবাসাবাসির কাছাকাছি পৌছেও যেত ওরা। কিন্তু এরি মধ্যে বারতার নিজের ছোট্ট শহরটায় একটা চাকরি জুটে গেল। বাবা তড়িঘড়ি করে খবর পাঠালেন –
    গতবার ইন্টাভিউ দিয়ে গেলি যে ব্যাংকে সেটার এপয়েনমেন্ট লেটার এসে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়।

    চাকরিতে জয়েন করে দুটো দিনের জন্য আবার এলো বারতা হোষ্টেলের সিট ক্যানসেলের ফরমালিটিগুলো সারতে হবে। মনোজদার স্বরলিপির খাতাটাও রয়ে গেছে পৌঁছাতে হবে। যদিও বাড়ি থেকে ফোনে মনোজদাকে খবরটা দিয়েছিল বারতা।

    সেই চির চেনা লাল কারপেটে মোড়ানো মেঝেয় বসতেই অনেকের মাঝে একজোড়া চোখের সাথে চোখাচোখি হয় বারতার। বুকের মাঝখানটায় একটু মোচড় দিয়ে ওঠে। আহা এমন দিনগুলো, এক সুরে গলা মেলানো আরতো পাবেনা কোনো দিন।

    – কি হল, হুট করে বাড়ি চলে গেলে যে ? সব ভাল তো ?
    স্বভাবজাত হাসিটা ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করে মনন।
    বারতা কিছু বলবার আগেই তবলায় চাটি মেরে মনোজদা বলে ওঠেন
    – আমাদের বারতাতো এখন সার্ভিস হোল্ডার। রিতীমত জয়েন করে ফিরেছে। হয়ে যাক চা সিঙ্গাড়া।

    সবার হৈ হল্লা, ধুমায়িত চায়ের কাপ, হারমনিয়ামের সুর আর ডুগি তবলার দাদরা কাহারবা তাল ছাপিয়ে খুব কাছ থেকে মননের কন্ঠ তার কানে পৌছায় – বারতা
    – বলো
    – তুমি চলে যাবে সত্যি ?
    – যাচ্ছিই তো। নিয়মের গন্ডিতে বাঁধা পড়েছি যে।

    কথোপোকথন আর এগোয় না। মনোজদা রিহারসেল করাচ্ছিলেন হঠাৎ বলে উঠলেন
    – বারতা, প্রাকটিসটা রেখো। আশির্বাদ থাকবে সব সময় তোমার জন্য।

    এবার মননের দিকে তাকিয়ে বললেন
    – মনন তোমার ডুয়েটের পার্টনার বারতার স্থলে কাকে নেয়া যায় বলোতো, অনুষ্ঠানের দিনও তো ঘনিয়ে এলো।

    মননের জবাবটা শোনা হয়না বারতার। তার আগেই নিরাদির ডাকে ওপাশটায় গিয়ে বসে বারতা। একে একে বিদায় পর্ব সারা হয় সবার সাথে। হাত ঘড়িতে সময় দেখে, বেলা পড়ে এসেছে। হোষ্টেল গেট বন্ধ হবার আগেই পৌছুতে হবে।

    উঠে দাঁড়ায় বারতা। মননের অঙ্গুলে হারমনিয়মের রিডগুলো সুর তুলছে মনোজদা তবলায় ঠুক ঠুক করে তাল ঠিক করতে করতে বলেন
    – কই, ধরো।
    ‘গোপন কথাটি রবেনা গোপনে
    উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে’

    মননের ভরাট কন্ঠ বারতার পা দুটোকে তখনই যেতে দেয়না। প্রতি বারের মত এবারও অপলকে গানটা শোনে বারতা। মনটা ভিজে ওঠে। দলা পাকানো একটা কষ্ট গলায় আটকে যায়। কথা সরেনা। এগোয় হোষ্টেলের পথে। পায়ে হাঁটা দুরত্ব।

    হঠাৎ খেয়াল করে পাশে মনন
    – না বলেই চলে এলে যে ?
    মনন ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে।

    না তাকিয়েই জবাব দেয় বারতা
    —— কিছু বলার থাকলেতো
    —— শোনার ও কি কিছু নেই ?

    বারতা কিছু বলেনা, মননও চুপ করে যায়। দুজনেই পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। হোষ্টেল অবধি এগিয়ে দিয়ে যায় মনন। সন্ধ্যার আধো আলো ছায়ায় হোষ্টেল গেটে ঢুকে পিছন ফিরে তাকায় বারতা। মনন স্থির, অবিচল দাঁড়িয়ে। এগুবার চলৎশক্তি নেই আর। সীমানা এপর্যন্তই। হাত নাড়ে বারতা, হাত উঠায় মননও। লাইট পোষ্টের আবছা আলোতে কেউ কারো চোখ ভরা নোনা জল দেখতে পায় না, হয়তো অনুভব করে তপ্ত অশ্রুর গড়িয়ে পড়া।

    দিন গড়িয়েছে দিনের নিয়মেই। যখন গুছিয়ে বসার অবকাশ মিললো তখনি ঘটলো ঘটনার ঘনঘটা।

    অফিস থেকে ফিরেই দেখে একেবারে অন্দর মহলে দুজন অতিথি। একজন মায়ের বান্ধবি সেতু খালা অন্যজন উনার বড়বোন। রাজশাহী থেকে এসেছেন বারতাদের বাড়ির পাশের আইডিয়াল ক্লিনিকের নতুন জয়েন করা ডাক্তার সুজানাকে দেখতে।

    গিয়ে দেখেন সিনিয়ার সার্জেনের সাথে ওটিতে ঢুকেছে সুজানা। সাতটার আগে বেরুবে না। সেতু খালারা তাই সময়টুকু কাটাতে মার কাছে এসেছেন। বারতার সাথে পরিচয় হয় সেতু খালার বড় আপার। উনার প্রবাসী ছেলের জন্যই এই সুজানাকে দেখতে আসা। বারতা অফিসের পোষাক পালটিয়ে ফিরে আসে ছোট্ট ট্রেতে দু’গ্লাস লেবু শরবত নিয়ে। গ্লাস দুটো উনাদের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলে
    – একটু শীতল হন। যা গরমটা পড়েছে দুদিন থেকে। আপনাদের খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

    সাইড টেবিলের ফ্যানটা অন করে দিয়ে বলে
    – সাত বাজতে এখনো দেরি আছে। আপনারা পা তুলে রিলাক্স করে বসেন তো খালা।

    খালারা সত্যিই পা তুলে বসলেন আয়েস করে। শরবতটা খেয়ে হাতের গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে সেতু খালার বড় আপা বললেন
    – খুব ভালে লাগলো মা। অনেক দোয়া তোমার জন্য।

    ব্যস্ এপর্যন্তই। দিন তিনেক পরে সেতু খালা আবার হাজির তবে একা। মা হেসে বললেন
    – সেদিন শেষ পর্যন্ত মেয়ের দেখা পেয়েছিলি ? পছন্দ হল বড় আপার ?
    – হল, তবে সেই মেয়েকে নয়।
    – কেন ?
    – কারণ সেই মেয়েকে তো সেদিন বড় আপা আর দেখতেই গেলেন না। তোর এখান থেকে বের হয়ে বললেন “ও মেয়ে দেখে আর কাজ নেই। মেয়ে আমার পছন্দ হয়েই গেছে। ওর বাবা মায়ের অমত না থাকলে বারতাকেই আমি ছেলের বৌ করবো।”

    সেতু খালা ভুমিকা ছাড়াই এক নাগাড়ে বলে ফেললেন কথা কটি। মা বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে বললেন
    – কিন্তু তুই যে সেদিন বললি উনি পরমা সুন্দরী সেই ডাক্তার মেয়েকে দেখতেই সুদুর রাজশাহী থেকে এসেছেন।
    সেতু খালা হাসতে হাসতে বললেন
    – তাইই তো এসে ছিলেন। কিন্তু বারতার লেবু শরবতের শীতলতায় আর ঐযে পা তুলে বসতে বলার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে বড় আপা বললেন – “সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিরে সেতু। বারতার শ্যামা রঙা অতি সাধারণ চেহারার মাঝে অন্তরের অপার সৌন্দর্য্যটা আমি দেখতে পেয়েছি।”

    মা আমতা আমতা করে বললেন – কিন্তু ছেলে ? ছেলের মতামত লাগবে না ? দেখবেনা মেয়ে ?

    – আসিফ তো এখন আমার বাসায়। গত কালই এসেছে। অফিসে গিয়ে আজ বারতাকে দেখেও এসেছে। যদিও মায়ের পছন্দই ওর পছন্দ। তবুও মায়ের অনুরোধে কথা রেখেছে। এখন তোদের মতামত পেলে ‘ঘরবর’ দেখার ব্যবস্থা করি।
    সময় স্বল্পতার মধ্যে সবই হল। বাবা এক পর্যায়ে বারতাকে কাছে ডেকে বললেন

    – তোর মতটাও যে জানা দরকার মা। অন্য কোথাও পছন্দ নেই তো ?

    বারতার মনের মাঝে মননের মুখটা উঁকি দেয়, কোথায় যেন একটা অব্যক্ত ব্যথা জাগে। কিন্তু কি বলবে। মননের ভরাট কন্ঠের গান ছাড়া আর তো কিছু শোনা হয়নি। জীবনের চরম বাস্তব ক্ষণে মননের প্রসঙ্গ নিতান্তই অবান্তর। আর তখনি মাথা দুলিয়ে সম্মতিটা জানিয়ে দেয় বারতা।

    অজস্র বেলি ফুলে ছাওয়া নীল গাড়িটা থেকে আসিফের পাশে পাশে বিশাল বাড়ির আলো ঝলমল বিশাল গেটটা পেরুতে না পেরুতেই অপরিচিতদের ভিড়ে একটা পরিচিত মুখ দেখে স্বস্তি পেল বারতা। পরক্ষণেই মনে পড়লো, এযে সেতু খালার বড় আপা। আমারই শাশুড়ি মা।

    হ্যাঁ, আসলেই তিনি বারতার ভরসা স্থল হয়েছেন দিনে দিনে। ছেলের স্বল্পকালীন সময়টার পুরোটাই গুছিয়ে দিয়েছেন দুজনার জন্য। ছোট্ট সময়টুকুতে ফিরানি কিংবা স্বজনদের ভিড় থেকে আলাদা করে রেখেছেন দুটিকে, পাঠিয়েছেন সাজেকের উড়াল মেঘের নির্জনতায়।

    কটাদিন স্বপ্নের মত সঙ্গ দিয়ে একদিন উড়াল দেয় আসিফ কিন্তু মন খারাপের অবকাশ দেননি এই স্নেহময়ী শাশুড়ি মা। আগলে রেখেছেন শত কথার ফল্গুধারাতে। আসিফের শৈশব কৈশোর চিনিয়েছেন, পছন্দ অপছন্দ জানিয়েছেন আর হাতে কলমে শিখিয়েছেন ছেলের ভাল লাগার রান্না। পালং পাতা দিয়ে ইলিশ মাথা কিংবা সর্ষে ইলিশের নানা পদ, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর মুরগির মঞ্জুরী।

    ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতালার পুরোটাই তিন ছেলে, বৌমারা, পাঁচ পাঁচটে নাতি নাতনিকে নিয়ে শাশুড়িমার সরগরম অবস্থান। নিচে ঢালাও গ্যারেজ পেরিয়ে লিভিং রুম কিচেন ষ্টোর আর খোলা মেলা ডাইনিং। পাশে লাগোয়া গেষ্টরুম, এককোনে সার্ভেন্ট রুম। ভেতরের সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় ওঠার পরই খানিকটা জায়গা খোলা আকাশের নিচে খোলা হাওয়ায় চমৎকার সব রংবাহারী ফুল আর পাতা বাহারের টবের সারি।

    শাশুড়ি মার শখের বাগানের দায়ীত্ব অভ্যাস বশত বারতাই লুফে নেয়। ছোট্ট টিনের ঝর্ণার পানিতে গাছগুলোকে ভিজিয়ে দেয় গুন গুন সুরে। “আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে / দিন ও রজনী কত অমৃত রস উথলি যায় অনন্ত গগনে- – -।”

    এরপর থেকে যে কদিন শাশুড়ির কাছে ছিল বারতা, গান না শুনিয়ে উপায় ছিল না। বড় জায়েরাও কখনোবা জোছনা রাতে রিতী মত আসরের আয়োজন করে ফেলতো। এত দ্রুত একের পর এক সব ঘটতে থাকে বারতা তাল মিলাতেই হিমশিম খায়।

    তিন মাসের মাথায় আসিফের কাছে যাবার সব কাগজপত্র রেডি হয়ে যায়। শাশুড়ি মার হাত থেকে টিকিটটা নিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে বারতা। বলে
    – আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা আপনাকে ছেড়ে যেতে।
    শাশুড়ি মা বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু এঁকে বললেন
    – পাগলি মেয়ে কষ্ট কিসের। আমার তো আনন্দ হচ্ছে। আসিফটা আর একা থাকবে না। বড্ড ছেলে মানুষ আসিফ। ওকে তুমি দেখ বৌমা। আর মনে রেখ ওর মনটা একটা সাদা কাগজ। কোনো দাগ নেই। যে আঁচড়টা কাটবে সেটাই থাকবে।

    দীর্ঘ প্লেন জার্নি শেষে এয়ারপোর্টের হাজারো ফরমালিটি সেরে বেরিয়ে এলো যখন বারতা, ভিন দেশি মুখগুলোর ভিড়ে আপন মানুষের মুখটা চিনবেতো সংশয় জাগলো মনে। মাত্র এগারো দিনের পরিচয়।
    মুহুর্তের মধ্যেই হাতে হাত রেখে মুখোমুখি দাঁড়ালো আসিফ জনসমক্ষে। প্রথমটায় চমকে উঠলেও পর মুহুর্তে স্পর্শে শিহরিত হলো বারতা আবার নতুন করে। ড্রাইভিং সিটে বসা আসিফের পাশে বারতা যেন সব কথা খুইয়ে বসে আছে। এই কমাসের জমানো একটা কথাও মনে পড়ছেনা বারতার।

    আসিফ বলেই চলেছে অনর্গল। ভাললাগার আবেশ জড়ানো বারতার মনটা কতক শুনছে আর কতক সময় হারিয়ে যাচ্ছে পথের দুপাশের নতুন নতুন দৃশ্যপটে।

    ছোট্ট বাংলো টাইপ বাসা। সবুজ গালিচার মত বিছানো বাড়িময় কার্পেট। বেডের পাশে সাইড টেবিলে রাখা মস্ত ফ্লাওয়ারভাসে নাম না জানা ফুলের চমৎকার তোড়া। আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল বারতার জন্য। গমগমে কন্ঠে রেকোর্ডারে বেজে উঠলো
    – “যেমন আছো তেমনি এসো আর করোনা সাজ/ বেনি না হয় এলিয়ে রবে সিঁথি নাহয় বাঁকা হবে/ নাইবা হল পত্রলেখায় সকল কারুকাজ- – ”

    ধপ করে বেডে বসে পড়লো বারতা, পাশে আসিফও। নিমগ্ন দুজনেই। কখনযে বারতার হাত আসিফের হাতের মুঠোয় চলে গেছে টের পায়নি বারতা। আবৃত্তিটা শেষ হতেই আসিফের চোখের তারায় বারতা চোখ রাখে। আসিফ পড়ে ফেলে বারতার মুগ্ধতার দৃষ্টি।

    – ফোনে মা প্রায়ই বলেন তুমি রবীন্দ্রনাথ ভালবাস খুব। রবীন্দ্রনাথের গান গাও। কিন্তু আমি নিজেতো গাইতে জানিনা। শুরু করলাম রবীন্দ্রনাথকে খোঁজা। পেয়েও গেলাম ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়ের সময়োপযোগী এই আবৃত্তি খানি। নিজেও চমৎকৃত হলাম। মজার কথাকি জান, তোমার জন্য গান বাছতে গিয়ে আমি নিজেই একজন ভক্ত বনে গেলাম রবীন্দ্রনাথের। অভিভুত হয়ে যাই প্রতিটি গানের চরনে।

    হঠাৎ আসিফের চোখে চোখ পড়তেই বারতার কন্ঠ থেমে দৃষ্টি আনত হল। নিজেকে সঁপে দিল আসিফের বিশাল বুকটিতে, প্রগাঢ় আলিঙ্গনে।

    ক্রিং ক্রিং ক্রিং নিচের লিভিং রুমে টেলিফোনের একটানা শব্দে বারতার ভাবনায় ছেদ  পড়ে। ফিরে বর্তমানে। সচকিত হয়ে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভাঙ্গে বারতা
    – হ্যালো
    – বারতা আমি কাজে আটকা পড়ে গেছি, দেরি হবে একটু। তুমি খেয়ে নিও।
    – অসুবিধে নেই, তুমি কাজ সেরে এসো। ছেলেমেয়েরাও কেউ ফিরেনি। সবাই এলে একসাথে খাবো। বুয়া টেবিল রেডি দিয়েই রেখেছে।
    – ও, কে।

    হঠাৎ খেয়াল হল টেলিফোনের পাশে একটা নতুন সিডির মোড়ক। হাতে তুলে চোখ বুলাতেই “নীরব নয়নে ” শিরোনামের রবীন্দ্র সঙ্গীত, শিল্পী মনন রায়হান।
    স্থানুর মত বসে থাকে বারতা। নড়বার শক্তিটুকুও যেন হ্রাস পেয়েছে। তার ধারনা এতোটা সঠিক। এতটাই !

    মনন তার মনের নিভৃতে এভাবে বিচরণ করে। এতটা বছর সেতো তার সুখের খিল দেয়া ঘর থেকে একটুও পিছন ফিরে তাকায়নি। টের পায়নিতো এমন বিচরণের।

    সন্ধ্যার পর ছেলেমেয়েরা যেযার ঘরে পড়াশুনায় ব্যস্ত। এসময়টা বারতা আর আসিফ নিজেদের মত করে সময় কাটায়। আসিফও সাধারনত এসময়টাতে কোনো কাজ রাখেনা। বেডরুমের লাগোয়া দক্ষিণের ব্যালকুনিতে দোলুনি চেয়ারে গা এলিয়ে পেপার পত্রিকা পড়ে। বারতার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করে। কখনো বা একমত কখনোবা দ্বিমত পোষণ। তাতে কিছু যায় আসেনা। আলোচনা শেষ, মতামতও শেষ।

    আজ বারতা একটু অন্য মনস্ক। আসিফ কথা বলতে বলতে হঠাৎ খেয়াল করে
    – বারতা এমন ভুল তো তোমার হয়না।
    – কি ?
    – এখনো বুঝতে পারছোনা ?
    – না
    – তোমার রবি ঠাকুর নেই যে আজ, ভুলে গেছ ?
    – উঁহু
    – তবে ?
    – একটা কথা আছে তোমার সাথে।
    – কত হাজারোটা কথা বলে চলেছ আজ বিশটা বছর ধরে, আর এখন অনুমতি একটা কথার জন্য ?
    হাসতে হাসতে বলে আসিফ
    – “বি সিরিয়াস” আসিফ।
    – সিরিয়াস
    মুখোমুখি বসলো আসিফ। বারতা সিডির মোড়কটা এগিয়ে ধরলো আসিফের চোখের সামনে। মনন রায়হান। আসিফ নেড়েচেড়ে বললো
    – কাল তো এই সিডিটাই আনলাম। নতুন শিল্পী, শুনলাম ভালই গায়।
    – নতুন নয় তো, বিশ বছর আগের চেনা কন্ঠ।
    – তাই নাকি ? তোমার গানের দেশের কোনো চেনা বন্ধু ?
    – মনন আমার বন্ধু ছিলনা।
    শান্ত কন্ঠে জবাব দেয় বারতা।
    হেসে বলে আসিফ।
    – শত্রুও নয় নিশ্চয়।
    – আমি দিনে যখন গানগুলো শুনছিলাম তখন শিল্পীর নাম জানা ছিলনা। কিন্তু ঐ কন্ঠই আজ বহুদিন পর মনন রায়হান কে মনে করিয়ে দিল। বারতার কথা কেড়ে নিয়ে সেই চিরাচরিত উৎফুল্লতার সুরে বললো আসিফ
    – এক সময় খুব ভালবাসতে এর গান তাইতো।

    গানের দেশের মানুষেরা কল্পনার জগতে বাস করতে ভালবাসে। নানা রঙের দিনগুলিতে বিচরণও করে। আর এটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ যেমন চলছিল, চলবে।
    – আর কিছু শুনবেনা ?
    – জানিই তো ?
    – কি জানো ?
    – হয় তুমি না হয় সে, যে কোনো একজনের অথবা দুজনের কারনেই তোমাদের পথ দুদিকে বেঁকে গেছে, ঠিক বলেছি ?

    বারতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন রাখে আসিফ।
    – ঠিক। তোমার রাগ হচ্ছেনা ?
    – নাহ্। লাভবান হয়েছিতো আমি। কারন মনন তোমার ভাল লাগা, গানের জন্য আর আমি তোমার ভালবাসা সারা জীবনের জন্য। যুক্তিটা কি ঠিক হল ?

    জবাব দেয় না বারতা। অপলকে তাকিয়ে থাকে আসিফের মুখের দিকে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আসিফ এত বেশি সহজ করে দেয় মুহুর্তে যেন “সহজই সুন্দর” এর চেয়ে সত্যি আর কিছু হতে পারেনা।
    বারতার নৈশব্দতাকে ভেঙ্গে দিয়ে আসিফ হো হো করে হেসে ওঠে, বারতার চিবুক তুলে ধরে
    – কি হল তোমার ভান্ডারে শব্দের চাষ নেই যে।

    কথাকটি বারতার কানে পৌছুলো কিনা বোঝা গেল না। তার সারা মন জুড়ে যে অস্বস্তির আঁধার চেপে বসেছিলো, আসিফের কথার আবেশে যেন আঁধার কেটে উষার আলোতে  সবকিছুকে সহজ আর সুন্দর মনে হতে লাগলো। অনেকদিন আগে গাওয়া রবিন্দ্রনাথের  ঐ গানটির চরণ ঘুরপাক খেতে থাকলো বারতার মনের গহীনে,
    “নিভিয়া বাঁচিল নিশার প্রদীপ / ঊষার বাতাস লাগি………….

    এবং বিশ বছর পর আবারো অনুভব করলো বারতা সেদিনের মতই আঁধার কেটে যাওয়া ঊষার বাতাসের স্বস্তিটুকু।

    ———————
    ফাহমিদা রিআ
    ——————–

Skip to toolbar