-
দুধের মাছি/
মশার উপদ্রবতো আছেই; কয়েকদিন ধরে কয়েকটা মাছিকে বসার ঘরের উইং-চ্যামে চুপটি মেরে বসে থাকতে দেখি। যখন খেতে বসি তখন ডাইনিং টেবিলে নেমে পিড়পিড় করে হাটে, আর ভনভন শব্দ করে ওড়াউড়ি করে। মিথিলা বিরক্ত হয়ে বলে—ইস; কি অসভ্যতা; মারো না কেনো, বর!
মাছি মারা সহজ কাজ না। এদের শত-চোখ। থাবড়া মারার আগেই উড়ে যায়। মাকে দেখতাম, শলার ঝাড়ু দিয়ে মারতো। মা নাই। গুরুবিদ্যা কাজে লাগিয়ে বিছানার ঝাড়ুটা নিয়ে লেগে পড়ি। খুব পিটাপিটি করলে দুয়েকটা মরে বটে; বাকিগুল কোথায় জানি লুকিয়ে যায়। পরদিন আবার উইং-চ্যামের গোলাপি পাখিগুলোর গায়ে লেপ্টে থাকে।
কিন্তু বাবাজীদের আর নিস্তার দিই না; মিথিলা অফিসে চলে গেলে ঝাড়ু নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকি। ওরা নিচে নামলেই চটা চট বারি মারি। আর একটা-দুইটা করে ফ্লোরে পড়ে নড়াচড়া করতে করতে মরে যায়। ইদানিং বাসায় বসে এ আমার নতুন খেলা।
সেদিন দুপুরে কয়েকটা মাছি ঝাড়ুর বারি খেয়ে আধমরা হয়ে কোঁকাতে কোকাঁতে বলে—মানুষ হয়া দুনিয়াতে আইছেন বইলা ডাঁটে বাঁচেন না! উই হেইট ইউ…; বলতে বলতে কয়েকটা মরে যায়। একটা বেশ অভিমান দেখিয়ে বলে—বস; আমাগো আয়ু মাত্র আড়াই দিন; এমনিইতো কয়েকঘন্টা পর দুনিয়া ছাড়তে হইবো; শীতের পিঠার মিঠা ঘ্রান পাইয়া আইছিলাম; আত্মায় সইলো না; ছি, ছি, ছি।
সত্যিতো, জগত শুধু মানুষের না; সকল জীবের। কিন্তু এ-ও বুঝি, ক্ষুদ্র হলেও এরা সুবোধ না। আমি বলি– ডাইরিয়ার জীবানুর লগে তোদের খুব খাতির; তোগো ছাড় দেওয়া মানে নির্ঘাৎ মরণ…।
মাছিটাকে দেখি, পিড়পিড় করতে করতে ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে। আমি আর ওকে আঘাত করি না। উড়তে উড়তে ‘বাই বাই, টাটা বলে হারিয়ে যায়।
পরদিন শাশুরি রসে ভিজানো চিতৈ পিঠা নিয়ে এলে মিথিলা খুশিতে নেচে ওঠে—মা, তুমি সত্যি আল্লার মেয়ে; থাঙ্ক ইউ, ডিয়ার মম…।
তোর জন্য না; শীতের পিঠা আনছি জামাই বাবাজীর লাইগা।
যেই না চামচ দিয়ে পিঠা উঠাতে যাবো, অমনি দেখি, প্লেটের কান্দায় নেমে এসে মাছিটা পাখা নাড়াচ্ছে, আর আমার দিকে লাজুক লাজুক তাকাচ্ছে! আমি বলি—তুই না কইছিলি আর আবি না?
মিঠার ঘ্রানে টিকতে পারলাম না, বস; কবি রবিন্দ্রনাথ তো কইছে—কেউ পন করে পন ভেঙ্গে হাপ ছেড়ে বাঁচার লাইগা।
আমি হাসি—খুব শেয়ানামী শিখছস, মনে হইতাছে! চামচ দিয়ে একফোঁটা রস টেবিলে ফেলে দিতেই মাছিটা উড়ে গিয়ে হামলে পড়েতো পড়ে, আরো কয়েকটা জুটে যায়। আমি জানতে চাই—এরা কারা?
আমার ছাও পোনা, নাতি পুতি।
কখন জন্ম দিলি!
মাছিটা মিটমিট করে হাসতে হাসতে বলে—বস, আড়াই দিনে আমাগো একটা পুরা জীবন; তোমরা এতো এতো বছর দুনিয়াতে করোটা কি! মাছি মারো?
ওর কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। মিথিলা বলে—মাছিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছো কেনো! এই লও ঝাড়ু; মারো।
আমি বলি—না, মিথিলা; এরা দুধের মাছি; মারলেও যাবে না।
খুব দার্শণিক হয়ে উঠেছো মনে হইতেছে! মিথিলা এক হাতে পিঠা খায়,অন্য হাতে মাছি তাড়ায়। দেওয়ালে দুইটা টিকটিকি সঙ্গমের লীলা করতেছে; তেলাপোকাগুলো স্টোর-রুমটা দখলে নিয়ে নিছে ; ঘুনপোকারা খাটটাকে দিনরাত কুড়কুড় করে খায়! সত্যি, এ জগত শুধু মানুষের না; অনুপ্রাণ, ছোট প্রানি, বিশাল হাতি, গাছ, মাছ—সবার; এই কথাটা আমরা ইচ্ছে করে ভুলে থাকি।
মিথিলা ঘুমের মধ্যে দেখে, কোনো এক বিজন প্রান্তরে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছি; আর চাঁদটা ধীরে ধীরে আকাশের মাথায় উঠে আসে। জ্যোৎস্না পেয়ে হাজারো প্রানী আমাদের মতো মায়াবী প্রান্তরে জড় হয়ে বলে ওঠে—আহা, কি মনোহর…; বলতে বলতে ছোট প্রানগুলো মরতে থাকে; আর এ-ওকে গিলে খায়। একটা বাঘ যখন আমাদের উপর হামলে পড়ে, তখন ঘুম ভেঙ্গে গেলে মিথিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে।
আমি বলি—খারাপ স্বপ্ন দেখতেছিলা বুঝি?
না, বর; খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন। এর ভিতর জানোয়ারটা ঢুইকা পড়লো!
আমি বলি—ওঠো; দেখো, দারুন মিষ্টি একটা সকাল।
সোনালি আলো মেখে বারান্দার গ্রিলে লেজঝোলা পাখিদুটি মাথা নাড়ায়।
মিথিলা বলে—অনেকদিন পর ওরা এলো! কিরে, আমাদের ঘুলঘুলিতে ছানা ফোটাবি?
আমি বলি–ওইতো আব্বা আর আম্মা; পাখি হয়ে ফিরে এসেছে। উড়ায়ে দিয়ো না, প্লিজ।
পাখিদুটি উড়ে যায়।মানুষ ওড়ে মনে মনে। মিথিলা ডাকে—আসো, ব্রেকফাস্ট দিছি।
ডাইনিং টেবিলে বসে চা খাই। উয়িং-চ্যাম থেকে মাছিগুলো নেমে আসে। মিথিলা বলে—আহা, মারো না কেনো, বর!
আমি হাসি—ওরা দুধের মাছি; মারলেও আবার আসবে।5 Comments-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 27 December 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Zakir Hossan
@zakirhossan
Mikdad Hossain
@mikdadhossain
সামিরা হিমু
@himu56
Md Al Maun
@mdalmaun
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Mohammad Rahman
@mohammadrahman
Rakib Hossain mahadi
@rakibhossainmahadi



ভুলে যাই সৃষ্টির অবদান
মানুষ ছাড়া ও আছে অজস্র জীবন প্রান
ছুটে চলে করে খাবারের সন্ধান
যেদিকে পায় সে কোন ঘ্রান।