-
আমি যখন পরীক্ষা দিতে (স্কুলে, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি) যেতাম তখন প্রশ্ন পাওয়ার পরে কমন পাইনি এমন কখনই হয়নি। কারণ আমাকে কখনও সিলেবাস অনুযায়ী পড়াননি আমার বড়ভাই। সব সময় সিলেবাস থাকতো আমার ভাই এর কাছে। অনেক ছোট বেলা থেকেই বড় ভাই আমাকে অনেক রেফারেন্স ব্যবহার করে পড়াতেন। কিন্তু আমি কখনোই সেই রকম রেজাল্ট করতে পারিনি। কারণ আমি পরীক্ষার সময় খুব ভয় পেতাম। খুবই ভয় পেতাম। আমাকে প্রত্যেক পরীক্ষার সময় Adloc 10 mg খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হতো। আমি যখন লিখতাম তখন মনে হতো এই খাতাটা আমার বড় ভাই দেখবেন অথচ বড় ভাইয়ের খাতা দেখার কোনো সম্ভবনাই ছিল না। এই ভয়ে আমি যা লিখতাম তা কখনোই ভালো হতোনা। মনে হতো বড় ভাই দেখে কষ্ট পাবেন, আমি এইসব কি লিখছি? রেজাল্টের আগেও আমি ভয়ে অস্থির হয়ে থাকতাম। কারণ ভালো রেজাল্ট না করলে বড়ভাই কষ্ট পাবেন ভেবে।আমার শিক্ষা জীবনটাই কেটেছে এই ভয় ভীতি নিয়ে। আমি যা কিছু করেছি সবই বড় ভাই আর আব্বা, আম্মার কথা ভেবে।
আসলে প্রত্যেক বাবা, মা’ই তাদের ইচ্ছাগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। তাদের অপূর্ণ সাধগুলো সন্তান পূরণ করবে এইটাই তাদের চাওয়া। আমাদের পাশের বাড়িতে এক দম্পতি থাকতেন। তাদের সন্তান জন্ম নেওয়ার কিছুদিন পরে মহিলা তার স্বামীকে বললো সে তাদের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াবে। স্বামী রাজি না। তারপর কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া ঝাটির এক পর্য্যায়ে মহিলা ঘর থেকে বের হয়ে এসে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। স্বামী বেচারা বুঝতেই পারেনি যে তার স্ত্রী এ রকম কিছু করে বসতে পারে। যখন স্বামী ঘর থেকে বের হয়ে এসে দেখে তখন অনেকটাই দগ্ধ হয়ে গেছেন মহিলা। হাসপাতালে ভর্তির ১ দিন পরে মহিলাটি মারা যান। স্বামী বেচারার ভাগ্য ভাল যে, মহিলাটি মারা যাওয়ার আগে পুলিশকে বলে গিয়েছিলেন, তিনি ভুল করেছেন। নিজে রাগ করে গায়ে আগুন লাগিয়েছে। এতে তার স্বামীর কোনো দোষ নেই। আসলে আমাদের অভিভাবকরা আমাদের ভালো চান। কিন্তু এই ভালো চাওয়াটা সেই বয়সে কারোই ভালো লাগেনা অথবা আমাদের অভিভাবকদের বলার ধরণে যে আমাদের মানসিক চাপ বাড়ে এটা বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই।
স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু হয় বাবা মা’র প্রতিযোগিতা যার কোন শেষ নেই। চাকরি জীবনেও চলতে থাকে তাদের প্রতিযোগিতা। আমি যেহেতু পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টে যাতায়াত করি, তাই সন্তানসহ মায়েদের সাথে আমার দেখা হয়। কি দারুণ উৎকন্ঠা, কি দারুন ভয় আতঙ্ক নিয়ে ছোট ছোট শিশুরা যে পরীক্ষা দিতে যায়! যে শিশুরা জানেইনা পরীক্ষা কি? তাদের মনেই আমরা ঢুকিয়ে দেই পরীক্ষা ভীতি। সারা রাস্তা পড়াতে পড়াতে শিশুগুলোকে নিয়ে যান মা বাবারা। আবার হয়ত দেখি, পরীক্ষা দিয়ে মা অথবা বাবা নিয়ে যাচ্ছেন শিশুকে প্রশ্ন ধরছেন, ধমকাচ্ছেন। হয়তো ১ নম্বরের ১ টা প্রশ্ন ছেড়ে এসেছে শিশু। মা এক বাস লোকের সামনে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিয়ে দিলেন। শিশুটি লজ্জা, অপমান গোপন করার জন্য হাসতে লাগলো। কি হয় পরীক্ষায় ১ম ২য় না হলে? কি হয় শিশুদের সারাটা পথ সাহস দিতে দিতে নিয়ে গেলে? পরীক্ষায় সে যাই করুক তবুও আপনি তাকে Unconditionally ভালোবাসেন, আদর করেন, এটা তাকে বোঝান।
একটা শিশুর জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে দ্বায়িত্ব নিতে হবে। কারণ আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ-এর দ্বায়িত্ব আমরা কেউ এড়িয়ে যেতে পারিনা। এবার আসি রাষ্ট্রের দ্বায়িত্বের কথায়। বাংলাদেশের শিক্ষকদের একটা Stander নির্ধারণ করা উচিৎ। সেটা সরকারি এবং বেসরকারি সব স্কুল কলেজের জন্যই করা উচিৎ। এই Stander তৈরী করেই বসে থাকলে হবে না। এটাকে যেন প্রভাবিত না করে রাজনৈতক, অর্থনৈতিক এবং স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি। একটা কথা রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের উপর মহলের মাথাদের সন্তানরা কিন্তু দেশে লেখা পড়া করে না। তবে দেশের আপামর জনসাধারণের সন্তানদের জন্যই এটা করতে হবে এবং এর ফল কিন্তু রাষ্ট্রই ভোগ করবে। কারণ শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড যদি ভেঙে পড়ে তবে রাষ্ট্র মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে। যদি শিক্ষকদের Standerity তৈরী করা হয় তবে, বিশেষ কিছু স্কুলে ভর্তিরজন্য বাবা মা’দের হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবেনা। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ১দিনে শেষ না করে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন Test এর মাধ্যমে হওয়া উচিত। যেমন-
1. Aplitute Tests
2. Integrity Tests
3. Cognitive Tests
4. Personality Tests
5. Emotional Intelligence Tests
6. Skills assessment Tests ইত্যাদি।প্রতিটি স্কুল, কলেজে কাউন্সেলর নিয়োগ দিতে হবে। ব্যাংঙের ছাতার মত যে কিন্ডারগার্টেনগুলো গজিয়ে উঠেছে সেখানেও কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে।
আর পাঠ্যপুস্তকে শারীরিক শিক্ষা না শিখিয়ে বাস্তবে শারীরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। নৈতিকতা শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে না রেখে পরিবারে, স্কুলে, সমাজে এবং রাষ্ট্রসহ সকল ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রয়োগ থাকতে হবে। সন্তানকে সময় দিন, সন্তানের কথা শুনুন, সন্তানের আবেগকে বুঝতে চেষ্টা করুন, নিজেকে সন্তানের জায়গার দেখুন। আবেগ নিয়ন্ত্রণে তাকে সাহায্য করুন। তাকে বিশ্বাস করুন, তবে অন্ধ বিশ্বাস না। স্বাধীনতা দিন, তবে কিভাবে তা ব্যবহার করছে তা দেখুন।
নিঃশর্ত আদর, স্নেহ, ভালোবাসা দিন। দেখবেন এক একটি হীরা, মানিক, পান্নায় দেশ ঝলমল করছে।
ছোট চারাগাছ কে তার নিজস্ব সত্তায় বিকশিত হতে দিন।5 Comments
Friends
Hasina Sultana Rima Rima
@hasinasultanarimarima
আনিকা মারজান ইরা
@anikamarjanera
Marketing Online
@marketingonline
Munmun Chakraborty
@munmunchakraborty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
আনিকা ইসলাম হৃদিতা
@hridita
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Song For Peace
@songforpeace
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat


আসম্ভব ভালো লাগলো আপনার লেখাটা। আমার স্কুলগামী সন্তান আছে সেখান থেকে প্রতিনিয়ত নানা অভিজ্ঞতা হচ্ছে। সামগ্রিক শিক্ষার মান সন্তোষজনক নয়। আমি আপনার সাথে একমত যে স্কুলগুলোতে কাউন্সিলর থাকা জরুরী।