Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    2 years, 3 months ago

    “আমাদের তাজমহল দর্শন”

    ছোটো বেলা থেকে পড়েছি তাজমহল হলো সপ্তম আশ্চর্যের একটি। একটু বড় যখন হলাম তখন অপলার মামা হুমায়ূন আহ্ম্মেদের বই-এর মহা ভক্ত হলাম। তাঁর বই এ পড়লাম যে মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রায় সবার বাড়িতে একটা তাজমহলের সূচিকর্ম অতি যত্নে ঝুলানো থাকে তাঁদের ড্রয়িংরুমে। ছেলে পক্ষ মেয়েকে দেখতে আসলে মেয়ের বাবা মেয়ের সূচিকর্মের ইতিহাস তুলে ধরেন ছেলের বাবা-মার কাছে। আমাদের বাড়ীতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি, তবে সেটা ছিল তাজমহলের ছবি।

    যাক, তাজমহলের ছবি দেখে তাজমহল স্বচক্ষে দেখার একটা আগ্রহ দানা বেঁধে উঠে আমার মধ্যেও সেই ছোটকাল থেকেই। আগ্রহটা বেশী দিন স্থায়ী হয়নি, যখন তাজমহলের ইতিহাস এবং সম্রাট শাহজাহান সম্পর্কে বিস্তারিত জানলাম। সৌন্দর্যের মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি টা বেশী বড় হয়ে ধরা পড়ে। যাক সেসব কথা, গতবছর ইন্ডিয়া যাওয়ার একটা সুযোগ হয়, আমার উনি ঘোষণা দিলেন যত কষ্টই হোক, এবার তাজমহলটা দেখে আসবই। যেমন, কেউ ঢাকা শহর আসলে চিড়িয়াখানা দেখেতে যাবে, কেউ আমেরিকা গেলে নায়াগ্রা ফলস দেখতেই হবে, এরকম ব্যাপার স্যাপার আর কি? কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, তাই আমিও বললাম আচ্ছা যাব।

    দীর্ঘযাত্রা শেষ করে কলকাতা থেকে দিল্লী গেলাম। ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সব ঠিক করলাম তাজমহল সহ দর্শনীয় স্থান দেখার। রাতে ছেলেদের পড়াশুনা করালাম কারণ বাংলাদেশে ফিরেই ছেলেদের পরীক্ষার পিঁড়িতে বসতে হবে। সকালে যাতে দেরী না হয় সে জন্য রাতেই সব গুছিয়ে রাখলাম। খুব ভোরে উঠে রওনা দিব সে জন্য। সকালে সব কিছু গুছিয়ে বের হবার আগে ছেলেদের বাবাকে বললাম- “দেখ যাচ্ছি তাজমহল দেখতে, আমার সংগে ভুলেও রাগারাগি করবেনা। তাজমহল হলো প্রেমিক-প্রেমিকাদের পূণ্যভূমি।” এখানে দু’টো কথা-
    ০১. ছোটো থেকে বড় হয়েছি বাবার বাড়িতে কখনো কেউ আমার সাথে জোরে কথা বলেনি এবং কেউ আমাকে কোনদিন বকা দেয়নি। বকা দেওয়া কাকে বলে আমি কখনই জানতাম না। বিয়ের পরে দেখলাম আমার উনি ধীরে কথা বলতেই পারেনা। তার কথা শুনে চোখের পানি নাকের পানিতে একাকার আমি।
    ০২. আমাদের প্রেমের বিয়ে না, তাই……………….
    রাতেই ব্যাগ গোছালাম, ওকে বললাম বাচ্চাদের জন্য বাড়তি ড্রেস নিয়ে নেই যদি প্রয়োজন হয়। উনি বললেন না নিতে হবে না। উনার না এর উপর আর কথা চলে না। ভোরে উঠে সবাই রেডি হলাম, এবার বের হবার পালা। রুম লক করে সবাই হোটেলের নীচে চলে আসলাম, অত ভোরে নাস্তা বাহিরে করবো এটাই ঠিক হলো। নীচে নামার পরে উনার মনে হলো ক্যাপ, ঘড়ি রুমে রেখে এসেছেন। মাথা ভর্তি চুল ক্যাপ ছাড়া চলে? আমি চপলা হরিণের মত ছুটে চলে গেলাম। হোটেলের লক খুলে নিয়ে আসতে যতটুকু সময় লাগে বাস ততটুকু সময়ের মধ্যেই ফিরে আসলাম। এসে দেখি টুরিষ্ট বাসের লোকজন রেডি হয়ে বসে আছে, বাস এখনি চলে আসবে। কি আর করা! নাস্তা আর করা হলো না। রুমের ফ্রিজে খাবার ছিলো সেটাও আনার কথা মনে ছিলনা।

    অবশেষে বাস এলো। বাস দেখে সকল উৎসাহ এক পল্কায় উধাও হয়ে গেল। কারণ আমরা এসি বাসে বুকিং দিয়েছি, ওরাও বলছে এসি বাস, কিন্তু একি!! এসি ঠিকমত কাজ করছে না, এসি বাসের গ্লাস যত পুরু হবার কথা এটা সেরকম নয়, জানালায় পর্দা নেই। বাসের যাত্রীর মধ্যে বেশীর ভাগই ফরেনার। ওরা আমাদেরকে বুঝালো যে কিছুক্ষণ পরেই এসি ঠিকমত কাজ করবে। এসি নিয়ে হৈ চৈ-এর পর যাত্রা হলো শুরু। রোমান্টিক মুডে যাচ্ছি। কয়েক ঘন্টা পরেই দেখতে পারবো তাজমহল!! ১ঘন্টা পর বাস যাত্রা বিরতী দিল এক ধাবাতে। মনে অনন্দের রেখা দেখা দিল। এখানেই সকালের প্রথম চা-এর স্বাদ গ্রহণ করবো। কিন্তু একি কান্ড!! শুনেছি গলা কাঁটা দাম রাখে হাইওয়ে হোটেলগুলো। এরা দেখছি গলা কাঁটা কাঁটির মধ্যে নেই, এরা দেখছি পুরোই কিডনি কেঁটে রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাই ও পথে পা না দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম। বাচ্চারা প্রথম ধাবা দেখে খুশীতে ছুটাছুটি শুরু করল এবং ছুটাছুটির একপর্যায়ে বড় জন পড়ে গিয়ে তার প্যান্ট ছিড়ে ফেললো। আমি মনে মনে তাঁর বাবাকে বকা দিলাম, কারণ তিনি বাড়তি ড্রেস নিতে দেননি। এর পর মিঃ বস্ বললেন – তোমার দেরীর কারণে নাস্তা করে আসা হয়নি। মেজাজ গেল বিগড়ে। মেজাজ বিগড়ানোর কিছুই ছিল না কারণ আমি জানি তিনি – I’am Ok, You’re not Ok” life position এর। বাসার ছোট খাটো ব্যাপার থেকে শুরু করে যে কোনো কিছুর ভুলের জন্যই সে আমার দোষ ধরে। যেমন, তার রেজারটা না পেলেও। আমি অভ্যস্ত তাঁর এইসবে। তারপরেও মেজাজ বিগড়ানোর করণ হলো আমার রোমান্টিক মুড!

    বাহ্যিক সকল কাজ সেঁড়ে বাসে উঠে পড়লাম। ধাবা থেকে বাসে একজন নতুন গাইড উঠলো। তার পোষাক, কথা বলার ধরণ থেকে শুরু করে সবকিছুই একদম জোকারের মত। সে বাসে উঠেই হিন্দিস (হিন্দি+ ইংরেজিতে) কথা বলা শুরু করলো। আমাদের যে টাকাটা খরচ করেছি যাতায়াতে তাঁর পুরাটাই ফ্রি। কারণ তাঁরা আমাদেরকে দু’ধারের সৌন্দর্য্য দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। সে আসলে গাইড কম সেলস্ ম্যান বেশী। দিল্লীর ৪০/৪৫ ডিগ্রী তাপমাত্রার প্রচন্ড গরমে সে কিনা কোর্ট-প্যান্ট, টাই পড়ে আছে। বক্তৃতার একপর্যায়ে আস্তে আস্তে তাঁর কোর্টের পকেট থেকে বের করলো লেবু চিপা যন্ত্র। তাঁরপর লেবু চিপে গ্লাসে করে এক নিমিে শরবত বানিয়ে ফেললো এবং বাসের যাত্রীদের ফ্রীতে সরবত পান করাতে শুরু করলো। আমার বড় পুত্রকে (যেহেতু সে মটু) সে জোকার গাইড পান করতে দিল। পুত্রের বাবা জোকার গাইড কাম হকারের কথায় পটে গেল এবং লেবু চিপার ৬টি যন্ত্র কিনে ফেললো। আমার রাগের মাত্রা বাড়তেই থাকলো। এর ২ ঘন্টা পরে আমরা লাল কেল্লা এসে পৌঁছালাম। অতঃপর বাস থেকে কেল্লা দেখতে নামলাম। আমি মিঃ বসের কাছ থেকে ১০০ হাত দূরে থাকলাম। বাবা ছেলেদের নিয়ে ঘুরছে। আমি একা ঘুরছি। ঘুরা-ঘুরি শেষে আবার বাসে উঠলাম। যথারীতি আবার গাইড চেঞ্জ হলো। এ গাইড শাহজাহানের ১নম্বর চ্যামচা। সম্রাট শাহজাহান সম্পর্কে সে আজগুবি গল্প শুনাতে শুরু করলো। মুহুর্তের মধ্যে ইতিহাস পাল্টে ফেললো। ফরেনাররা অহ্ অহ্ আওয়াজ তুলতে লাগলো। আর আমি মনে মনে বলতে লাগলাম- তোরে কইছে? তুই বেশী জানস? ভাগ্যিস মনে মনে বলতে পারছিলাম! এর পরে গাইড বলা শুরু করলো- তার বউ নাকি তাঁকে বলে, সম্রাট শাহজাহান মমতাজের জন্য তাজমহল বানিয়েছে, তুমি আমার জন্য কি বানাবে? উত্তরে গাইড তাঁর বউকে বলেছে- “সম্রাট শাহজাহান মমতাজ মারা যাওয়ার পরে তাজমহল বানিয়েছে আর আমি তোমাকে বেঁচে থাকতেই তাজমহল দিবো।” করণ আমি এখন আপনাদের যেখানে নিয়ে যাব সেখানে থেকে আপনারা আস্ত তাজমহল কিনে আপনাদের বিবিকে উপহার দিতে পারবেন। মনে মনে বললাম এবার আবারো মিঃ বস্ পটে গেল। গাইড আরও বলল ওখান থেকে শুধু তাজমহল না ওখান থেকে বাঁশ এবং কলার খোসার তৈরি শাড়ীও কিনে দিতে পারবেন আপনারা আপনাদের বিবিকে। গাইডের কথানুযায়ী আবারও যাত্রা বিরতী হলো জেলখানার কয়েদিদের তৈরি জিনিস পত্রের দোকানে। এবার দেখলাম মিঃ বস্ আমার জন্য একটা ইন্ডিয়ান ৩,৫০০/- রুপী দামের সবচেয়ে বড় এবং অরজিনাল কষ্টিপাথরের একটা আস্ত তাজমহল ও বাঁশের তৈরি শাড়ী কিনে ফেলে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন।

    যাত্রাবিরতীর সময় শেষ। অতঃপর আবারও বাসে চাপলাম। বাস চলতে শুরু করলো এবং ২০ মিনিট পরে সুন্দর এক ধাবাতে গিয়ে থামলো, এখানেই আমরা লাঞ্চ সারলাম। এরা আমাদের কিডনি না হার্টই কেঁটে রেখে দিল। উপায় নেই গোলাম হোসেন, উপায় নেই! ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। তাই হার্টটাকে একপাশে রেখে খেয়ে নিলাম। তাঁরপর টিকিট কেটে তাজমহল দেখার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। হেন তেন চেক করে বহুদূর হেঁটে যেইনা তাজমহলের ভিতর ঢুকেছি, দূর থেকে দেখা যাচ্ছে তাজমহল তখন আমার ছোটো পুত্রধন বললো আম্মু টয়লেটে যাব। শুধু বলা না তাঁর মুখের মানচিত্রও বলছে যে কোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটে যাবে। মনে মনে বললাম ভাগ্যিস শাহজাহান বেঁচে নেই! আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তবে আমার ছেলের কথা শুনে তার হার্ট এট্যাক কেউ থামাতে পারতোনা। তাঁর মহান শিল্পকর্ম দেখার পরে যে কারো টয়লেট লাগতে পারে এটা তিনি সহ্য করতে পারতেননা। আমি পুত্রকে বললাম- “বাবা একটু কষ্ট করো, আমি টয়লেট খুজছি। ভয় হচ্ছিল যদি সে প্যান্টেই কাজটা সেঁড়ে ফেলে তবে কি হবে? বাপের বলিহারি বুদ্ধির জন্য অন্য ড্রেসও আনা হয়নি। অনেক খুঁজা-খুঁজির পর অবশেষে খুঁজে পেলাম সেই কাঙ্খিত টয়লেট। কিন্তু টয়লেট খুঁজে পেলে কি হবে? টয়লেটে পাসপোর্ট ছাড়া কিছুতেই টয়লেটে ঢুকতে দিবেনা সিকিউরিটি। পাসপোর্টতো আছে ওর বাবার কাছে। সিকিউরিটিকে আমি বললাম যে, “আমি বাহিরে আছি বাচ্চাটাকে অন্ততঃপক্ষে ভিতরে যেতে দেন, পাসপোর্ট দিচ্ছি। সিকিউরিটি বিধ্বস্ত ছেলের চেহারা দেখে ঢুকতে দিল। একটু পর মিঃ বস্ আর বড় ছেলে আসলো। তিনজনেই টয়লেটে বেশ সময় নিলো, এসব কিছুই হলো ধাবার খাওয়ার ফল।

    কত প্লান ছিল দু’জনে তাজমহলের সামনে ছবি তুলবো, পুরো পরিবার মিলে ছবি তুলবো, মনে মনে ড্রইং রুমে জায়গাও ঠিক করে রেখেছিলাম। তা আর মি: বসের কারণে তোলা হলো না। জানি না, আর কখনও তাজমহল যাওয়া হবে কি না। তাজমহল দেখতে যাওয়া হোক বা না হোক, রাগটাতো কমলো।
    এই হলো আমার তাজমহল দর্শন।
    বাহ্ তাজ আর বলা হলো না।
    *রাহেনা বেগম*

    3
    7 Comments

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar