-
আমার বড় ভাই ডাক্তার, আমার ভাস্তি এবং ভাস্তি জামাই ডাক্তার , খালা শাশুড়ী , শ্বশুড় , খালু শ্বশুড় ডাক্তার , তাঁদের ছেলে এবং ছেলের বউ ডাক্তার (দেশের বাহিরে), তাঁদের মেয়ে ডাক্তার।
আমরা যারা সাধারণ মানুষ – কেউ ডাক্তার শুনলেই শ্রদ্ধা বোধ করি।একজন মানুষকে জমের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন একজন ডাক্তার। অসুস্থ একজন ব্যক্তি যদি ডাক্তারের সাথে শুধু কথা বলেন, তাঁর অসুখ যেন অর্ধেক ভালো হয়ে যায়, বাকী অর্ধেক ভালো হয় ঔষধের কারণে।
ডাক্তার হতে গেলে তার মেধার প্রয়োজন, অর্থের প্রয়োজন। আমাদের মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে একজন সন্তানকে ডাক্তার বানাতে বাবা-মাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
এরপর সেই ডাক্তার যদি সরকারি চাকুরীতে ঢুকতে যায়,তবে সেখানেও প্রচুর পড়াশোনা করে, প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে তবেই ঢুকতে হয়।আমি আমার ভাস্তিকে দেখেছি প্রেগন্যান্ট অবস্থায় সারাদিন , রাত পড়ার টেবিলে কাঁটাতে।২/৩ ঘন্টাও সে ঘুমাতো না।
সবাই হয়তো ভাবছেন আজ হঠাৎ করে এই মেয়ে ডাক্তাদের কীর্তন শুরু করলো কেন?আসলে আমি যে বিষয়টা সম্পর্কে লেখতে চাচ্ছি, সেটা সমসাময়িক বিষয় না।আজ থেকে প্রায় ৭/৮ মাস আগের বিষয়।
আমার কোন বিষয় নিয়ে দুঃখ – কষ্টো, রাগ-ক্ষোভ ,হতাশা ,দুঃশ্চিন্তা হলে সেটা যদি আমি লেখে ফেলি তবে বিষয় টার ভার(ব্যতিক্রম বাদে) কমে যায়। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে বহুবার নোট প্যাডে লেখতে শুরু করলেও শেষ করতে পারি নাই।আর লেখলেও সেটা প্রকাশ করার মতো সাহসী মেয়ে আমি না।
আর ভূমিকা না করে সরাসরি বিষয় টা উপস্থাপন করি।
দূর্ভাগ্যবশত আমি ঘটনাটার সময়ে ছিলাম।
একজন পিতা ,যিনি পেশায় একজন ডাক্তার। বাংলাদেশের নাম করা এক প্রতিষ্ঠানে এমন এক বিভাগে কর্মরত যেখানের রুগীদেরকে নিদান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের শেষ দিনগুলো তাঁরা পার করেন এই বিভাগে।
তিনি এসেছিলেন তার (৩/৪বছরের ) সন্তানকে শিক্ষিকা / কেয়ার গিভার মেরেছেন , এই অভিযোগ নিয়ে।
তার অভিযোগ এর প্রমাণ বের করার জন্য প্রতিষ্ঠান সিসিক্যামেরা দেখিয়েছেন। সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। এর পরেও তিনি সন্তুষ্ট না।তার একটিই দাবি সেই শিক্ষিকাকে বের করে দিতে হবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কিছু নিজেস্ব নিয়ম নীতি থাকে। সেই নিয়ম অনুযায়ী বিষয় টা তদন্ত কমিটি করে দেওয়াও হয়েছিল।
কিন্তু সেই পিতা কোন ভাবেই সেটা মানতে নারাজ।
সেই নারাজগি থেকেই তার সেই প্রতিষ্ঠানে আসা।
তিনি যখন এসেছিলেন তখন আমি সহ আমার পরিচিত আর একজন আপা এবং প্রতিষ্ঠান টির দায়িত্বে থাকা( যাঁর দেশে, বিদেশে শিশু বিকাশ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে) ভাই সহ আরেকজন ভাই ছিলেন।
ডাক্তার সাহেব রুমে প্রবেশ করার পরে আমি এবং আমার সাথের যে আপা ছিলেন আমরা নিজেদের পরিচয় ডাক্তার সাহেবকে দিলাম(এটাই ভদ্রতা), কিন্তু ডাক্তার সাহেব আমাদেরকে কীটপতঙ্গ ভেবে যেন উড়িয়ে ই দিলেন।
তিনি সরাসরি আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাইয়ের সাথে কথা বলা শুরু করলেন। ভাই তার ব্যাচ কত , এইসব কিছু জানতে চাচ্ছিলেন।ডাক্তার সাহেব অনিচ্ছা নিয়ে ,দায় সারা ভাবে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন।
এরপর তিনি জানতে চাচ্ছিলেন তার সন্তানের বিষয় টা র কি হলো? এখনো কেন সেই শিক্ষিকা প্রতিষ্ঠানে আছেন?
এরপর তিনি তার মোবাইল বের করে ফোন করলেন একজন কে , বললেন – আমার বড় ভাই(!) এর সাথে কথা বলেন।
আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাই তাকে বললেন- ফোন স্পিকারে দিতে।
ওপাশ থেকে ফোন ধরলেন সেই তথাকথিত বড় ভাই (!),
নিজের পরিচয় দিলেন। এবং বললেন- তিনি নিজেই আসতেন, কিন্তু তার নেতার (নাম উল্লেখ করতে চাই না)নমিনেশন পত্র জমা দেওয়া নিয়ে তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত, তাই আসতে পারেন নি।
এরপরে যে ভাষায় তিনি কথা বলেছিলো তা আমি আমার এই দীর্ঘ জীবনে কখনো শুনি নাই। আমার বসবাস নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে , আমাদের আশে পাশে সব ধরনের, সব পেশার মানুষের বসবাস। নিত্যদিনের তাদের ঝগড়া বিবাদ না শুনতে চাইলেও শোনা হয়ে যায়। কিন্তু কখনো এই ভাষা আমি শুনি নাই। এই ভাষা সিনেমা , নাটকেও শুনি নাই , কারণ সেন্সরে এগুলো বাদ দেওয়া হয়।
আমার যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো , শরীরের সমস্থ রক্ত যেন উপরে উঠে আসছে।আমি লজ্জায় , ঘৃণায় , অপমানে থরথর করে কাপছিলাম, কান দুটো দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরুচ্ছে , মুখ ভর্তি বমি এসে জমা হয়ে আসছিলো।
মাথা সোজা করতে পারছিলাম না, যেন কেউ আমার মাথার উপর দশ মণ বোঝা দিয়ে দিয়েছে।
মাথা নীচু করায় আমি আমার রুমের কারো মুখ দেখতে পারছিলাম না , কিন্তু ডাক্তার সাহেবের পা নাচানো দেখতে পাচ্ছিলাম।
তথাকথিত ভাই (!) সেই শিক্ষিকারে কি কি করবেন, কিভাবে করবেন, প্রতিষ্ঠান টির কি করবেন সব বিস্তারিত ভাবে বলে যেতে থাকলেন। ঠিক কত সময় সেই ভাই (!) কথা বলেছিলেন সেটা সঠিকভাবে বলতে পারবো না। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো সময় যেন থেমে গেছে।
অবশেষে তিনি ফোন রেখে দিলেন।
আমার ধারণা ছিলো ডাক্তার সাহেব হয়তো তার সেই তথাকথিত ভাই এর এই ধরনের কথায় ব্যথিত হবেন এবং আমাদের শ্রদ্ধেয় ভাই এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।
কিন্তু নাহ্ , তিনি আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিলেন। তিনিও জানতে চাইলেন- পরের দিন থেকে তাহলে সেই শিক্ষিকা আর আসবে না, এটাই যেন ঠিক থাকে।
কারণ তিনি তার সন্তানকে বলে এসেছিলেন – আজ শিক্ষিকাকে তিনি শাস্তি দিতে এসেছেন।
ডাক্তার সাহেব আরও বললেন- তার স্ত্রী খুব ভালো জব করতেন , কিন্তু সন্তানের লালন- পালন এর জন্য জব ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের সেই সন্তানের গায়ে হাত তোলার সাহস কিভাবে পেলো?
এই ঘটনার সাক্ষী হওয়ার পরে আমি বেশ অনেক দিন ঠিক মতো খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না। সব সময়ে কানে যেন সেই ফোনালাপ শুনতে পেতাম।
আমি মনে মনে (প্রকাশ্যে কাউকে বলতে পারছিলাম না) ঠিক করে রেখেছি- যদি কোন দৈবক্রমে পৃথিবীর সব ডাক্তার নাই হয়ে যায় (আল্লাহ মাফ করুন ) এবং আমার জীবন সংশয় দেখা দেয় এবং সেই ডাক্তার ই একমাত্র থাকেন তবু্ও আমি আমার জীবন বাঁচাতে তার কাছে যাবো না। সেক্ষেত্রে মৃত্যুকেই আমি বেছে নিতে প্রস্তুত থাকবো।
আমার প্রশ্ন হলো একজন ডাক্তার পরিচয় ই কি যথেষ্ট ছিলো না, নিজ সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার(?) জন্য?
মেধাবী , সুশিক্ষিত , বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরেও যদি নিজ পরিবার, সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অশিক্ষিত , মূখ্য , নোংরা রাজনৈতিক নেতাকে প্রয়োজন হয় , তবে সেই শিক্ষার কি আদতেই কোন প্রয়োজন আছে?
বিঃদ্রঃ লেখা টির সম্পূর্ণ দায় ভার শুধু ই আমার।1 Comment
Friends
Hasina Sultana Rima Rima
@hasinasultanarimarima
আনিকা মারজান ইরা
@anikamarjanera
Marketing Online
@marketingonline
Munmun Chakraborty
@munmunchakraborty
Md Babul Hossain
@mdbabulhossain
আনিকা ইসলাম হৃদিতা
@hridita
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Song For Peace
@songforpeace
Sahriar Rubaiat
@sahriarrubaiat


আমার জানা মতে, পশ্চিমা দেশ গুলোতে এক জন চিকিৎসকদের সাথে দেখা করতে হলে কয়েক মাস সময় লাগে। শুধু মাত্র ইমারগেন্সি বিভাগ ছাড়া। সেখানে চিকিৎসকদের মূল্য অনেক। নেই কোণ প্রাইভেত প্র্যাকটিস। ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা যায় না। ইনস্যুরেন্স ছাড়া চিকিৎসা করান যায় না। ইনস্যুরেন্স থাকলে চিকিৎসার খরচ নেই। অ্দেআর দেশের চিকিৎসকরা তাদের সাধ্য মত চেষ্টা করেন । রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য সুবিধা কম। আমি একবার অসুস্থ হয়ে ঈদের দিন একটি সরকারি হাস্পাতালে গিয়েছিলাম। মাত্র দশ টাকার একটি টিকিটের বিনিময়ে চিকিৎসা নিয়েছিলাম। ঈদের দিন সকল আনন্দ ভুলে একজন কম বয়সী মহিলা ডাক্তার ফাঁকা হাসপাতালে তার কর্তব্য পালনকরছিলেন। চিকিৎসা বিদ্যা অমোঘ নয়। কখনো বলা হয় না চিকিৎসকরা সব সময় রোগীর জীবন বাঁচাতে পারবে, কারণ একটি এটি একটি পরীক্ষামুলক বিদ্যা। যে ওষুধ এক জনের জন্য কাজ করবে তা যে অন্য আরেকজনের জন্য কাজ করবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। এর কারণ বংশগতি। আমরা জাতিগত ভাবে নিতান্ত মূর্খ। চিকিৎসকদের অপমান করে সুখ পাই। এ দেশে চিকিৎসকের চেয়ে তান্ত্রিক, ওঝাদের সম্মান বেশি। ভাল থাকবেন। শুভ কামনা।বিঃদ্রঃ লেখা টির সম্পূর্ণ দায় ভার শুধু ই আমার।