-
মা
~~~~~~~~~~~~~~
পর্ব – ১
বিপ…বিপ…বিপ…বিপ…বিপ…
সকালটা শুরু হল ঘড়ির এলার্মের শব্দে।
কম্বলের নিচে বড় একটা অবয়ব একটু নড়ল এবং বিরক্তিভরা স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“উফ… বন্ধ… কর।”
সাথে সাথে কেউ একজন অ্যালার্ম বন্ধ করে দিল। সেটা ছিল জুলি।
ভোর ৬টা বাজে। ভারী পর্দা সূর্যের আলো আটকে রেখেছে, তাই ঘরটি এখনও অন্ধকার। ছোট একটি ঘর, তবে সুন্দরভাবে সাজানো। আইস পার্পল রঙের দেয়াল, ফ্রোজেনের দুর্গ ও তুষারফুলের সুন্দর ছবি দেয়ালে টানানো। দেয়ালটি যতবার দেখে, জুলি ততবারই গর্ব বোধ করে, কারণ এই ছবিগুলি আর কেউ নয়, স্বয়ং তার মেয়ে এঁকেছে। ঘরের ভারী পর্দাগুলি গাঢ় বেগুনি রঙের। ঘরে একটি বিছানা এবং তার উল্টোদিকে একটি স্টাডি টেবিল রয়েছে, যদিও টেবিলটি একটু এলোমেলো। টেবিলের পাশে একটি বড় বইয়ের আলমারি, যেখানে অনেক বই রাখা আছে, বেশিরভাগই উপন্যাস। সিলিং থেকে বিশেষ কায়দায় ঝুলানো ছোট ছোট গাছের টবও রয়েছে ঘরে। সম্পূর্ণ তার মেয়ের কাজ। কেউ ঘরে ঢুকলে বলবেই, ‘ওয়াও, কত সুন্দর!’
জুলি নিঃশব্দে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। সে পর্দা সরিয়ে জানালা খুলল। আর একটা শীতল হাওয়া রুমে এসে ঢুকলো। সুন্দর মিষ্টি একটা ঘ্রাণ এল। শীতের সকালে হালকা রোদ উঠলে ঠিক যেমনটি পাওয়া যায়, এই ঘ্রাণকেই সম্ভবত বলা হয় ‘স্মেল অফ সান’। জুলি বুক ভরে ঘ্রাণ নিল। এরপর পেছন ফিরে তাকাতেই নজর পড়ল তার মেয়ের স্টাডি টেবিলে। টেবিলের দিকে তাকাতেই একটু অবাক হল, কারণ তার মেয়ে পরিচ্ছন্নতা খুব বেশি পছন্দ করে এবং কোনও জিনিস এলোমেলো হলে ঘৃণা করে, বিশেষ করে তার নিজের ঘরে। তার ঘর সব সময় পরিপাটি থাকতে হবে। না হলে, সে এত রেগে যায় যে তাকে শান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপর জুলি মনে করল, তার মেয়ে নিশ্চয় সারারাত পড়াশোনা করেছে তার আসন্ন পরীক্ষার জন্য, আর এত ক্লান্ত ছিল যে বিছানায় যাওয়ার আগে টেবিলটিও ঠিক করতে পারেনি। তার মেয়ে এপ্রিল, একাদশ শ্রেণির ছাত্রী, খুব মেধাবী।
জুলি হাসল এবং টেবিল ঠিক করতে এগিয়ে গেল। হাসিমুখে নিজের আপনমনে বলল,
“ঠিক আছে, মা। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”
টেবিল ঠিক করার পর, সে বিছানার কাছে গিয়ে বসে পড়ল। বিছানার কম্বলের নিচে লুকিয়ে থাকা অবয়বের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি ফুটল তার মুখে। সে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়া দিল।
“ওঠো, মা। এখন ৬:১০ বাজে। ওঠো।”
এপ্রিল বিরক্ত হয়ে কম্বলের ভিতর থেকেই ফিসফিস করে বলল, “মা, আমাকে ঘুমোতে দাও।”
জুলি হাসিমুখেই বলল, “এমন বল না। উঠো, মা।”
“বলেছি তো, ঘুমোতে দাও!” এইবারও এপ্রিল বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল।
“কিন্তু তোমার দেরি হবে, মা।”
“থামো, বলেছি ‘বেরিয়ে যাও’!!!”
এপ্রিল চিৎকার করে উঠল, জুলি থমকে গেল। এরপর এপ্রিল বিছানা থেকে উঠে মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে টেনে বের করে দিল। তারপর ঘরের দরজা তার মুখের উপর বন্ধ করে দিল।
জুলি এতটাই হতবাক হয়েছিল যে কী ঘটল সেটাই প্রথমে বোঝেনি। এগুলি এত দ্রুত ঘটল যে সে কিছুক্ষণের জন্য পুরো ঘটনাটি বুঝতেই পারেনি। সে দরজায় হাত রেখে বলল,
“কিন্তু মা, তোমার দেরি হবে।”
কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। মনে হল তার মেয়ে আর কোনো উত্তর দিতে চায় না। জুলির চোখে অশ্রু জমতে লাগল। কিন্তু সে নিজেকে কোনোরকমে সামলাল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে, অন্য ঘরের দিকে তাকাল। সেখানে দুটি ছোট ঘর পাশাপাশি রয়েছে। পাশের ঘরটির সামনে দাঁড়িয়ে আবারও চোখ ভিজতে শুরু করল। সে গভীর শ্বাস নিল এবং মুখে হাসি আনল। আর সেই হাসি নিয়েই দরজা খুলল। এই ঘরটি আগের থেকে ছোট এবং বেশ মজার। দেয়াল সবুজ রঙের, এবং দেয়ালে আঁকা রয়েছে গাছ, পাখি ও প্রাণীর ছবি। সে ঘরে ঢুকে দেখল তার ছেলে স্টাডি টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। সে হাসল এবং চুপিচুপি টেবিলের কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখল। উষ্ণ স্বরে বলল,
“ওঠো, আমার ছোট্ট খরগোশ। তোমার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।”
ছেলে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকাল।
“সুপ্রভাত, মা।”
বলেই মাকে জড়িয়ে ধরল।
“সুপ্রভাত, আমার ছোট্ট খরগোশ।”
“মা, তুমি কেন চোখের জল আটকানোর চেষ্টা করছ?”
ছেলে আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে, মা?”
জুলি জানত, যতোই চেষ্টা করুক, তার ছেলেকে সে বোকা বানাতে পারবে না। চোখে আবারও অশ্রু ভেসে উঠল। সে অন্যদিকে তাকিয়ে এটা লুকানোর চেষ্টা করল। একমাত্র এই বাচ্চা ছেলেটি তার মা’কে অনেক ভালোবাসে, আর মায়ের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। ছেলেটি বলল, “জানি।”
জুলি হতভম্ব হয়ে বলল, “কী?”
“আবার কিছু হয়েছে। সে আবার কিছু করেছে, তাই না?”
“না, আমার লক্ষ্মীটি, কিছুই হয়নি। শুধু একটু মাথাব্যথা।”
ছোট ছেলেটি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
“একদম।”
“তাহলে একটু হাসো তো, আমি তোমার হাসি দেখতে চাই।”
এবার জুলি সত্যিকারের হাসি হাসল।
“ঠিক আছে, এখন উঠে তৈরি হয়ে নাও। তোমার পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে আজ। সেজেগুজে তৈরি হও, আমার খরগোশছানা।”
“হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত যে আমি প্রথম হব।”
“আমার খরগোশ, ঠিক তাই।”
সে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঠিক তখনই অন্য ঘর থেকে এপ্রিল চিৎকার করে ডাকল,
“মা, তাড়াতাড়ি এসো!”
জুলি ছুটে ঘরে ঢুকল। দেখল, এপ্রিল তার চুল এলোমেলো অবস্থায় ইউনিফর্ম পরে হয়রান হয়ে কিছু একটা খুঁজছে।
“কী হয়েছে, মা?”
“তুমি আজ সকালে আমার জিনিসে হাত দিয়েছো? আমার খাতাটা কোথায় লুকিয়েছ?!”
“আমি লুকাইনি।”
“ওহ, নাটক বন্ধ করো!! তাড়াতাড়ি বলো, খাতাটা কোথায়?!”
“ঠিক আছে, আমি সাহায্য করছি।”
“না, আর কোনও সাহায্য চাই না। বেরিয়ে যাও।”
“কিন্তু আমাকে সাহায্য করতে দাও, মা।”
“না, বেরিয়ে যাও।”
জুলি তার মেয়েকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেও সে আর সুযোগ দিল না। সে মায়ের হাত ধরে তাকে আবার ঘর থেকে টেনে বের করে দিল।
“বেরিয়ে যাও। আর আমার সামনে আসবে না।”
এবং আজ দ্বিতীয়বারের মত দরজাটা জোরে জুলির মুখের ওপর বন্ধ করে দিল।
জুলির চোখ কান্নায় ভরে উঠল। কী ভুল করেছিল সে? কেন তার মেয়ে তার সাথে এমন আচরণ করে? সে তো কেবল সাহায্য করতে চেয়েছিল। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রাখতে চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হল।
তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সে, যখন শুনতে পেল পদশব্দ ধীরে ধীরে তার দিকে আসছে, যেন কেউ খুব সাবধানে এগিয়ে আসছে, তাকে যেন জুলি ভয় না পায়। সে যতটা সম্ভব নীরবে কাঁদতে থাকল।
ধীরে ধীরে সেই পদশব্দ আরও কাছে এসে থেমে গেল, একেবারে তার সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেই জায়গায়। জুলি জানে, কে এসেছে। তাই মুখ তুলে তাকাল না।
তারপর সেই পদশব্দের মালিক তাকে গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরল, এবং এই উষ্ণ আলিঙ্গনে সে আরও ভেঙে পড়ল।
তার কান্না আরও প্রবল হয়ে উঠল, এবং সে সেই আলিঙ্গনে নিজেকে আরও হারিয়ে ফেলল।
সেই পদশব্দের মালিক গভীর নিশ্বাস ছেড়ে মৃদুস্বরে বলল,
“মা, কেঁদো না, প্লিজ…”
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
চলবে…
মা
নি:সঙ্গ সামুদ্রিক পাখি
©️ All rights reserved
সম্পূর্ণ পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে লেখা এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক যদিও এমন সামাজিক গল্প লিখতে গেলে অনেকেই দাবি করেন এই ঘটনা আপনাদের জীবন থেকে নেয়া, কিন্তু বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কাউকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। আশা করছি গল্পটি সবার ভালো লাগবে। গল্প সম্পর্কে যেকোন মন্তব্য কমেন্ট সেকশনে করুন। ধন্যবাদ সবাইকে।❤️
Friends
মো: নাজমুল আখতার
@faith
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
Anik Biswas
@anikbiswas
মাহীম খান
@meho
Jannatun Nur
@jannatun-nur
Syed Farah
@syedfarah
অয়ন আবদুল্লাহ
@ayonabdullah140
Abcde gh.
@abcdegh
Asif Rahman
@asifaaron62

