-
“সাওদা নামের সেই মেয়েটি”
রুবা/
০৫.১০.২৪ ইংসেদিন ছিলো রমজান মাসের ১৭ তারিখ, সেহেরির শেষে ক্লান্ত বদনে ঘুমিয়ছিলো সারা গ্রাম।এরই মাঝে প্রসব যন্ত্রনায় তড়পাচ্ছিলো এক গ্রাম্য বধূ।ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিলো বাড়ির সবার দীর্ঘ নয় ঘন্টার চিৎকার-চেঁচামেচিতে।
অবশেষে সকলের মুখে স্বস্তির হাসির দেখা দিলো একটি কান্নার শব্দে! জন্ম হলো একটি কন্যার, যে ছিলোনা তার বাবা কিংবা মায়ের মতো ধবধবে সাদা গাত্র বর্ণের।সে জন্ম নিলো তার দাদামশাইয়ের মতো কালো হয়ে।
বাবা তার নাম রাখলেন সাওদা যার অর্থ হলো ‘কালো’। ধীরে ধীরে বড়ো হলো সাওদা, তিন বোনের মধ্যে সে-ই পেলো কালো বর্ণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরুতেই শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ।বাবা তার মাওলানা ছিলেন , চলে গেলেন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে।
এক রাতে চুপি চুপি তার বাবা ফিরে এলেন! পালাতে চান পাকিস্তানে বউ আর তিন কন্যাকে নিয়ে।কিন্তু মাওলানা সাহেবের আপন পিতা আর স্ত্রী পালাতে চাইলেন না তার সাথে।অগত্যা তিনি একাই চলে গেলেন পরিবারের মায়া ত্যাগ করে। সাওদাদের পরিবার পিতৃহীন হলো। কিছুদিন পর মারা গেলেন তার বৃদ্ধ দাদামশাই।
সাওদার চাচাগণ ঠিক করলেন বয়স খুব বেশি না হলেও বিয়ে দেবেন তিন ভাতিজীর। কারন বেঁচে থাকাই ছিলো কঠিন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে।সাওদার মা ছিলেন কঠিন কিন্তু নিরূপায়।অনিচ্ছাতেও তিনি বিয়ে দিতে রাজি হলেন তার মেয়েদের। বাধ সাজলো সাওদার গায়ের রং।সহজে কেউ তাকে বিয়ে করতে চাইলো না। আর তখনকার সময়ে বড় মেয়ের বিয়ের আগে ছোটদের বিয়ে হওয়া ছিলো একপ্রকার অসম্ভব।অবশেষে সাওদার বড় চাচা একজন পাত্র পেলেন সাওদার জন্য। পাত্রের দাদা ছিলেন জমিদার, পাত্র বিপত্নিক এবং সাওদার চেয়ে দুই বছরের বড় তার একজন ছেলে আর সাওদার সমবয়সী তার একজন মেয়ে সন্তান রয়েছে।
নিজ বৃদ্ধ মাতার সেবা-যত্নের জন্য তিনি সাওদার মতো ১৫বছরের কালো মেয়েটিকে বাছাই করলেন। সম্পদের পাহাড় সমান চাকচিক্যের কাছে হেরে গেলো সকলের বিবেক বোধ।
আড়ালে কাঁদলেন কেবল তার জন্মদাত্রী মাতা, যিনি জানতেন তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তিনি মৃত্যুকূপে পাঠাচ্ছেন।
আর সাওদা বুঝতে পারলেন তিনি কালো তাই পণ্য হিসেবে তিনি খুবই কমদামী। বধূ হলেন বাবার বয়সী একজনের, যত্ন নিতে চেষ্টা করলে ৮৫ বছরের বৃদ্ধা শাশুড়ির, ভালোভাবে পারতেননা বলে স্বামীর মারতো ছিলো নিত্যদিনের বিষয়। সতীনের ছেলে-মেয়ে কখনো ভালোবাসতো কখনো তারাও গায়ে হাত তুলতো।ভালোবাসতো কেবল সে-ই এক পায়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা তার বৃদ্ধ শাশুড়ি।
এমনি সময়ে সাওদার মাতা মারা গেলেন । বাবার বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো সাওদার।তবে সাওদা পরিণত হয়েছে ততদিনে, বুঝতে শিখেছে অনেক কিছু।তার কুলজুড়ে ততদিনে এসেছে ধবধবে সাদা রূপসী দুই মেয়ে।তার স্বামী আজকাল খুশি আর গায়ে হাত তুলেনা সাওদার।
সংসারে যেনো লক্ষী আসছিলো তার।তার বৃদ্ধ শাশুড়ী এক ভোরে বিদায় নিলেন ঘুমের মধ্যেই।মায়ের মৃত্যু যেনো মানতে পারলেন না সাওদার স্বামী! চারমাসের গর্ভবতী সাওদাকে রেখে বড়োছেলেকে সব বুঝিয়ে দিয়ে এক সপ্তাহ পরেই মারা গেলেন তার স্বামী ।
সাওদা এবার জন্ম দিলেন এক পুত্রের।কয়েক বছর ভালোই কাটছিলো ,কিন্তু ধীরে ধীরে শুরু হলো রেশারেশি। একদিন সতীনপুত্র জাকারিয়া একটি দলিল বের করে সবাইকে দেখিয়ে বললেন বাড়িখানা ছাড়া বাকিসব বাবা লিখে দিয়েছেন তার নামে।সাওদা মানতে নারাজ , ডাকলেন বড়ো উকিল, তাতে লাভ হলোনা । সব থাকতেও তার কিছুই রইলোনা, তবে জাকারিয়া তার ভরন-পোষনের ভার নিতে রাজি হলো।
রইলোনা কোন কাজের লোক, রইলোনা কোন জমিদারী আভিজাত্য।সাওদা তিন সন্তান নিয়ে কোনঠাঁসা হয়ে পরলেন।কিন্তু এবার আর মেনে নিতে পারলেননা বোনেদের কাছে সন্তানদের দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন নার্সিং এ ট্রেনিং নিতে।ট্রেনিং নিলেন , আল্লাহর রহমতে সরকারি চাকরি পেলেন।একসময় সন্তানদেরও নিয়ে গেলেন নিজের কোয়ার্টারে।
নিজেকে খুঁজে পেলেনে সকলের অবহেলার উর্দ্ধে, যেখানে বাকি সবাই তার গুরুত্ব বোঝে। ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনা শেখালেন , সবাই নিজ নিজ জীবনে খুশি।সৎপুত্র নিজের ভুল শুধরাতে সম্পত্তির কিছু অংশ দিলো ভাই-বোনদেরকে।
সবকিছু ঠিকঠাক দেখে সাওদা যেনো অস্বাভাবিক বোধ করলেন, তাই অভিমানে বিদায় নিলেন এক দুপুরে। কিছু না বলেই। নিরবে, নিভৃতে চিরতরে।সমাপ্ত//
2 Comments
Friends
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Md Rizwan Shuvo
@md-rizwan-ullah-shuvo
Abrar Jahin Ratul
@abrar123
অর্পিতা ঐশ্বর্য
@orpita-oyshorjo
Abul Hasan Tuhen
@abulhasantuhen
শোয়েব ইবনে শাহীন
@abir-shoaib
পি.কে. সরকার
@pksarker
Santo Chowdhury
@santo-chowdhury

ভালো লিখেছেন