-
একচোখে দেখা স্বপ্ন
লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
নয়নপুর গ্রামটি যেন সময়ের বাইরে থাকা কোনো উপাখ্যানের নাম। চারপাশে ধানক্ষেত, মেঠোপথ, বাঁশঝাড় আর খড়ের চালা ঘরে গড়া মানুষের জীবন। এই গ্রামেরই এক কোণে ছিল উলুখানের ঘর—একতলা, মাটির দেয়াল আর বাঁশের বেড়া ঘেরা উঠোন। উঠোনজুড়ে ছিলো তিনটি ছেলের দৌড়াদৌড়ি, হাঁস-মুরগির কলকাকলি আর জানোয়ারা নামের এক নারীর নিঃশব্দ সংগ্রাম।
উলুখান ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো অজানা শহরে, রোজগারের আশায় প্রবাসী। বছরে একটা চিঠি, মাঝেমধ্যে টাকাপাঠানো আর ফোনে দুই মিনিটের কথা—এই ছিল তার সংসারের অংশগ্রহণ। বাড়ির সব দায়িত্ব জানোয়ারার কাঁধে। সে একা সামলাতো ঘর, সন্তান আর সমাজের চোখ।
তিন সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে আসে বাশিক—এক চোখ অন্ধ, কিন্তু বুদ্ধিমত্তায় চোখ ধাঁধানো। গ্রামের মানুষ তাকে ‘কানা বাশিক’ বলে, যেন নামেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের বিদ্রুপ। কিন্তু এই বাশিক অন্যরকম। লেখাপড়ায় পারদর্শী, কথায় মিষ্টতা, চোখে রহস্যের ঝিলিক।
প্রথম দিন থেকেই জানোয়ারা বুঝেছিলো, বাশিকের অন্ধ চোখটা পুরোপুরি অন্ধ নয়। যখন সে ছেলেদের পড়াতে বসতো, সেই চোখ খাতার পৃষ্ঠার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতো জানোয়ারার বুকের দিকে তাকিয়ে। জানোয়ারা নিজেকে বোঝাতো—”অন্ধ চোখ, নিশ্চয়ই কিছুই দেখে না।” কিন্তু নারী-অভিজ্ঞতা বলে দেয়, কোন চোখ কী দেখছে। সে দৃষ্টি ধীরে ধীরে এক ধরণের উত্তাপ ছড়াতে থাকে।
উলুখান চিঠি ছাড়া আর কিছুই পাঠায় না, ফোনও তেমন করে না। একাকীত্ব, অবহেলা আর দীর্ঘশ্বাস জমে জমে জানোয়ারাকে ক্লান্ত করে তুলেছিলো। বাশিকের উপস্থিতি যেন সেই ধূসর জীবনে কিছু রঙ এনে দিলো। এক সন্ধ্যায় বাশিক বলে উঠলো, “আপা, আপনার চুলে রোদ লেগেছে, মনে হয় সোনার মুকুট।” জানোয়ারা হেসে ওঠে—লজ্জা নয়, এক অজানা আকর্ষণে।
মাস খানেকের মধ্যেই সেই হাসি পরিণত হয় গাল ছোঁয়ায়, তারপর ঠোঁট ছোঁয়ায়। প্রেম, বাসনা আর নির্ভরতার মিশেলে এক নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাশিক হয়ে ওঠে জানোয়ারার রাতের সঙ্গী। ছেলেরা সন্দেহ করে, বিশেষ করে বড় ছেলেটি। একদিন সে জিজ্ঞেস করে, “মা, বাবা কি আর আসবে না? এই মামা কি আমাদের নতুন বাবা?”
জানোয়ারার উত্তর নেই। সে এক রাতে সিদ্ধান্ত নেয়—উলুখানকে তালাক পাঠাবে। বাশিকের সঙ্গে ঘর বাঁধবে। সন্তানদের কান্না তাকে থামাতে পারে না। সে তখন প্রেমে মগ্ন, যা তাকে সত্য-মিথ্যা সব ভুলিয়ে দেয়।
বাশিকের সঙ্গে নতুন জীবনের শুরুতে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে। বাশিকের চোখে কেবল জানোয়ারা নয়, আরও অনেক নারী। কখনো দেখা যায় সে চায়ের দোকানে হাসছে সুন্দরী বিধবা হাসনেয়ার সঙ্গে, কখনো হাটে কোনো মেয়ের গায়ে হাত রেখে রসিকতা করছে।
এক রাতে জানোয়ারা জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি আমার সঙ্গে প্রেম করেছিলে না আমার শরীরের সঙ্গে?” বাশিক কোনো উত্তর দেয় না। শুধু সেই পুরনো চোখে চেয়ে থাকে তার বুকের দিকে। জানোয়ারা বুঝে যায়, এই পুরুষ ভালোবাসেনি, শুধু ভোগ করতে চেয়েছে।
এমন সময় গ্রামে আসে আশিক—একজন এনজিও কর্মকর্তা। শিক্ষিত, ভদ্র, সুদর্শন। জানোয়ারার মনে হয়, এই মানুষটি তাকে সম্মান করবে, ভালোবাসবে। সে রান্না করে দেয়, ঘরে ডাকে, গল্প করে। কিন্তু আশিক যখন জানোয়ারার গভীর অভিপ্রায় বুঝতে পারে, তখনই বদলি নিয়ে চলে যায় দূরে।
জানোয়ারার জীবন থেমে যায় এক অচেনা ডোবার জলে। কোথাও এগোয় না, কোথাও পিছু হটে না। একদিন সে জানতে পারে, বাশিক লুকিয়ে বিয়ে করেছে হাসনেয়াকে। তখন তার শরীর শিউরে ওঠে, গলা ফাটিয়ে কাঁদে, দেয়ালে মাথা ঠুকে। তারপর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে ভেতরে ভেতরে।
সে আর কাপড় পরে না, রাতে মাঠে হেঁটে বেড়ায়, পুকুরে চিৎকার করে। মানুষ তাকে পাগলী বলে, কেউ পাথর ছুঁড়ে মারে, কেউ ভিডিও তোলে। গ্রামের লোকেরা তামাশা বানায় তার জীবনকে।
একদিন উলুখানের বড় ছেলে আসে। মাকে দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তার চোখে বিস্ময়, ঘৃণা আর একধরনের করুণা। তারপর বলে, “চলো মা, তোমায় এখন শান্তির জায়গায় নিয়ে যাই।”
সে জানোয়ারাকে নিয়ে যায় এক মানসিক হাসপাতালে। সবুজ চাদর পাতা বিছানায় জানোয়ারা বসে থাকে, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে অন্ধকার, মুখে নিরবতা।
একদিন এক নার্স এসে তার চুল আচঁড়ায়। জানোয়ারা ধীরে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “তুমি কি কানা বাশিক? তুমি কি এখনো কেবল আমার বুকটাই দেখো?”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে, জানালার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ছে ক্লান্ত আলো। জানোয়ারার একচোখে দেখা স্বপ্নের রঙ ততক্ষণে ধূসর হয়ে গেছে।4 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe



🤔…দারুণ