-
একতারার প্রেমকাহিনি
নূরপুর বোয়ালী গ্রামের মাটির গন্ধে যে ছেলেটির শৈশব মিশে ছিল, সে তখনো জানত না, একদিন তার জীবনের গান হবে ভালোবাসার এক অপূর্ব অধ্যায়। তার নাম আব্দুল হক আকন্দ, কিন্তু সবাই তাকে ‘উকিল’ বলেই চিনত—একটা ছোট্ট ডাকনাম, তবু এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছিল, যেন নামটাই তার প্রকৃত পরিচয়। দশ বছর বয়সেই পিতৃহীন হয়ে এতিম হওয়া উকিলকে আশ্রয় দেয় মোহনগঞ্জের জালালপুর গ্রামের কাজী আলিম উদ্দিনের পরিবার। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, আর একটা শান্ত হাওর-বেষ্টিত গ্রাম—এখানেই গড়ে উঠতে থাকে উকিলের মনোজগৎ, যেখানে প্রেম, প্রকৃতি আর সুর একাকার হয়ে যায়।
তখনো সে জানত না, তার জীবন পাল্টে দিতে আসছে আরেকটি হৃদয়, একজোড়া চোখ, এক মিষ্টি হাসি—হামিদা আক্তার। লবু হোসেনের একমাত্র কন্যা, গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরীদের একজন। কিন্তু তার সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক ছিল না; ছিল একরকম কোমলতা, যা যে কাউকে গভীর করে ফেলত। উকিল প্রথম তাকে দেখে এক হাওরের ঘাটে, যখন মেয়েটি কলসিতে জল ভরছিল। জল ভরার সময় তার হাত থেকে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ল মাটিতে, আর সেই দৃশ্য যেন কোনো অলৌকিক কাব্যের মতো হৃদয়ে গেঁথে গেল উকিলের।
এরপর থেকে হাওরের ধারে, মেলার মঞ্চে কিংবা কোনো ঝিলের পাশে দেখা হতে লাগল দুজনের। কথাবার্তা প্রথমে ছিল না, শুধু চোখের ইশারা, হাসির ছায়া, আর কখনোবা হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। উকিলের বাউল মন ততদিনে সুর খুঁজে পেতে শিখে গেছে। কিন্তু এবার সে যে সুর খুঁজে পেয়েছে, তা কেবল প্রকৃতির বা সমাজের নয়—এ সুর ছিল ভালোবাসার।
এক রাতে, গাঁয়ের নির্জন এক প্রান্তে বসে উকিল একটি গান লিখল। মাটির পিঁড়িতে বসে একতারার তারে যখন সে আঙুল বুলাতে শুরু করল, তখন সেই গান নিজের মতো করে তৈরি হতে লাগল—
“তোমার চোখে চুপি চুপি, জীবন আমার গলে যায়
হাওরের জলে যেমন, চাঁদের আলো খেলে যায়…”
পরদিন মেলার মঞ্চে গানটি গাওয়া হলো। হামিদা উপস্থিত ছিল। হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে উকিলের চোখ খুঁজে বের করল সেই একজোড়া চোখ, যেখানে এতদিন তার নিজের প্রেম লুকিয়ে ছিল। গান চলাকালীন একবার চোখাচোখি হলো, আর সেখানেই যেন স্বীকৃতির একটি মৌন চুক্তি হয়ে গেল—তারা দুজনই জানে, ভালোবাসে।
তবে প্রেম কি সহজে পথ পায়? সমাজের নিয়ম, পরিবারে ভ্রু কুঁচকানো দৃষ্টি, আর নানান বাধা তখনো ছিল। হামিদার মা খোলাখুলি বলেই দিলেন—”একতারা বাজায় যে ছেলে, সংসার চালাবে কীভাবে?” কিন্তু প্রেম তো হাওরের ঢেউয়ের মতো, বাঁধা দিলে আরও জোরে ধাক্কা দেয়। লবু হোসেন, একদিন একান্তে উকিলের গান শোনার পর বললেন, “যে ছেলে ভালোবাসার ভাষা জানে, সে সংসারও বুঝবে।”
বিয়ের প্রস্তাব এল হঠাৎ করেই, যেন এক বিস্ময়। পুরো গ্রাম জানল, প্রেম জয়ী হয়েছে। আর সেই বিয়ের রাতে, উকিল আর হামিদা পাশাপাশি বসে যখন গ্রামের মেয়েদের গলায় নিজেদের প্রেমের গান শুনছিল, তখন দুজনের চোখে ছিল একরাশ নিশ্চিন্ততা—একটা গল্পের শুরু হলো আজ, যে গল্পে দুঃখ থাকবে, বিভ্রান্তি থাকবে, কিন্তু থাকবে গভীর প্রেমের এক স্রোত।
বিয়ের পর দিনগুলো ছিল এক অপূর্ব জীবন-সংগীত। উকিল হামিদার হাসিতে খুঁজে পেত গানের রাগ, তার অভিমানে পেত বিরহের সুর। একদিন বলেছিল, “তুমি আমার গানের সুর, আমার প্রতিটা কথার ছায়া।”
তাদের সংসার সাদামাটা হলেও ভালোবাসার রং ছিল গাঢ়। উকিলের গান তখন নতুন মাত্রা পায়। প্রেম থেকে ওঠে জীবনের দিকে, সংসারের দিকে, আর স্রষ্টার দিকে। একসময় তিনি শরিয়তের পীর মোজাফফর আহম্মদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পীর সাহেব তাকে বলেন, “তোমার প্রেম এখন বিস্তৃত হওয়া দরকার।” উকিল তখন বলে, “আমি হামিদার চোখে স্রষ্টার প্রেম দেখেছি।”
জীবনের শেষ দিকে উকিল আর বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন না। শুধু নিজের ভরাট গলায়, চোখ বন্ধ করে গান গাইতেন। তবু প্রতিটি গানে এক অদৃশ্য নারী চরিত্র থাকত, যার হাসি, চোখ আর কোমলতা ছিল অমোঘ। সে চরিত্রের নাম কেউ জানত না, কিন্তু গ্রামের লোকেরা বুঝত, সেই চরিত্রের নাম হামিদা।
এক বিকেলে, শেষ গানটি লেখার সময় উকিল জানত, এটাই হয়তো তার জীবনের শেষ গান। তিনি লিখলেন—
“জীবন যদি নদী হয়, তুমিই সে স্রোত
ভালোবাসা একবার আসে, বারবার নয়…”
গান শেষ হলে, উকিলের চোখে জল এসে গিয়েছিল। পাশে বসে থাকা হামিদা তাঁর হাত ধরে বলেছিল, “তুমি গানের মানুষ, কিন্তু আমার চোখে তুমি আমার জীবন। যে জীবন আমি ভালোবেসে গেছি চিরকাল।”2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


চমৎকার