Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • “আবার উঠে দাঁড়ানো”
    রেলস্টেশনটার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল নিলয়। দুপুরের রোদে চারপাশ ধু ধু করছে, আর সে হাঁটছে মাথা নিচু করে, যেন মাথা তুলে তাকাতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছিল ঢাকায়, অনেক স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু সকালে ফলাফল এসেছে — তার নাম তালিকায় নেই।
    চারপাশের সবাই আনন্দে আত্মহারা, কেউ বাবা-মাকে ফোনে জানাচ্ছে তাদের সাফল্যের কথা, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে ধরছে — অথচ নিলয়ের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। যেন ওর কিছুই নেই এখন, না ভবিষ্যৎ, না দিকনির্দেশনা। একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ে সে। দোকানদার তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভাই, চা দেবো?”
    নিলয় কেবল মাথা নাড়ে।
    চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে, আর সেই ধোঁয়ার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে মা’র মুখ। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগের রাত, মা বলছিল, “যা হয় হোক, চেষ্টা করিস মন দিয়ে। হেরে গেলে ভাবিস না, আবার চেষ্টা করবি।” তখন যেন কথাগুলো হাওয়ায় ভেসে গিয়েছিল। এখন সেই কথাগুলোই বুকের ভেতর রিনরিন করে বাজছে।
    চায়ের দোকানের পাশেই এক ভিক্ষুক বসে ছিল, চোখে ছিল অন্ধত্ব, আর হাতে ছিল একটা সুরের বাঁশি। হঠাৎ সে বাঁশিতে সুর তুলল, এক অপার্থিব মায়ার সুর। নিলয় অবাক হয়ে তাকাল। অন্ধ মানুষটার চোখে আলো নেই, জীবনেও আলো নেই তেমন — কিন্তু সুরে কি অপার আনন্দ!
    “আপনার চোখ তো নেই, কিন্তু এত সুন্দর বাঁশি বাজান কীভাবে?” — অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে নিলয়।
    ভিক্ষুকটা হাসে। “চোখে আলো না থাকলে তো আর হৃদয়ে আলো থাকে না এমন নয়। আমি হেরে গিয়েছি চোখের খেলায়, কিন্তু সুরের খেলায় এখনো লড়ি। মানুষ হারে, কিন্তু যদি হার মানে, তবেই তো শেষ।”
    নিলয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এতদিন সে ভাবত, জীবন মানেই বড় চাকরি, বড় শহর, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ একজন অন্ধ মানুষ বাঁশি বাজিয়ে তাকে শেখাচ্ছে জীবনের আসল ভাষা — হার মানা মানেই হেরে যাওয়া নয়।
    সেদিন সন্ধ্যাবেলা নিলয় ট্রেনে করে বাড়ি ফিরে যায়। মা দরজা খুলে জড়িয়ে ধরেন, আর কিছু জিজ্ঞেস করেন না। শুধু বলেন, “চোখে দেখছি সব বুঝে গেছিস।” নিলয় শুধু মাথা নাড়ে।
    পরের দিন থেকে সে আবার পড়তে বসে, একদম নতুন উদ্যমে। এবার আর শুধু ভর্তি পরীক্ষার জন্য না, নিজের জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য। পাশের গ্রাম থেকে এক ছোট ভাই এসে বলে, “ভাইয়া, আমার ম্যাথসটা বোঝাও তো!” সে হাসিমুখে বোঝাতে শুরু করে। বুঝতে পারে — জ্ঞান শুধু নিজের মধ্যে রাখার জন্য না, ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আর মানুষ গড়ার চেয়ে বড় কিছু নেই।
    দিন যায়, মাস যায়। নিলয় আবার পরীক্ষা দেয়, আবার ঢাকায় আসে। ফলাফল আসে — এবার তার নাম তালিকায় প্রথমদিকে। চোখে জল চলে আসে, কিন্তু এবার সেটা শুধু আনন্দের নয়, যুদ্ধজয়েরও জল।
    ঢাকা শহরে পড়তে পড়তে সে একটা সংগঠনে যুক্ত হয় — ‘আলোকযোদ্ধা’। এখানে হতাশ তরুণদের নিয়ে কাজ হয়, তাদের কাউন্সেলিং, কর্মদক্ষতা উন্নয়ন, জীবন-দর্শন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা চলে। নিলয় নিজেই একদিন বলে — “আমি একদিন ভেঙে পড়েছিলাম, কিন্তু আবার দাঁড়িয়েছি। আজ আমার দায়িত্ব অন্যদেরও দাঁড়াতে সাহায্য করা।”
    তার কথা শুনে এক ছেলেমেয়ে হাততালি দেয়। একটা মেয়ে বলে, “আপনার গল্পটা শুনে মনে হচ্ছে আমিও পারবো।”
    নিলয় মুচকি হাসে। “জীবন একটাই, জানো? এই এক জীবনে তুমি যদি নিজের জন্য না লড়ো, তাহলে কে লড়বে?”
    সেই রাতে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিলয় ভাবে — জীবন যুদ্ধে যে পড়ে গিয়েছিল একদিন, সে-ই আজ অন্যদের হাতে শক্তির মশাল তুলে দিচ্ছে। হেরে যাওয়া খারাপ নয়, কিন্তু হেরে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোই তো আসল সাহস।
    সেই ভিক্ষুকের বাঁশির সুর এখনও ওর কানে বাজে। একজন যোদ্ধা কখনো হাল ছাড়ে না — এটা নিলয়ের জীবনের চিরন্তন সত্য।
    ________________________________________
    শেষ কথা:
    একবার হেরে গেলে কিছু আসে যায় না। জীবন এক বিশাল নাট্যমঞ্চ — প্রতিটি মঞ্চে নতুন চরিত্র, নতুন দৃশ্য, নতুন লড়াই। শুধু বিশ্বাস রেখো নিজের ভেতরের আলোয়। কারণ তুমি, আমি, আমরা সবাই — একেকজন নীরব যোদ্ধা। আর প্রতিটা যুদ্ধের শেষে জয়ের সম্ভাবনা থাকেই, যদি হাল না ছেড়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। 🌿

    4
    4 Comments
    • জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পগুলো ভালো লাগছে।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 21 June 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar