-
আয়নার দু’প্রান্তে
তিতাস উপজেলার মফস্বল স্কুলটি খুব বড় নয়, কিন্তু চারপাশে লম্বা গাছ আর খোলা মাঠের জন্য জায়গাটা যেন প্রাণবন্ত। এই স্কুলেই দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন আনোয়ার স্যার। নীরব, নিয়মতান্ত্রিক, সদা প্রস্তুত। তাঁর রুটিনে ভুল ধরা যায় না। প্রতিদিন তিনি শ্রেণিকক্ষে যান ঠিক সময়ে, ডায়েরি আপডেট করেন, আর ছাত্রদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন—এমনভাবে যেন প্রত্যেকের জীবনে তিনি কিছু রেখে যেতে চান।এবছর নতুন নিয়োগে একজন তরুণ শিক্ষক এসেছেন—তাজুল ইসলাম। বয়স ত্রিশের আশেপাশে, ঢাকায় বেড়ে ওঠা, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা শহুরে অভ্যস্ততায় কেটেছে। স্কুলে ঢুকে প্রথম দিনেই একটু অস্বস্তি—এখানে ইন্টারনেট নেই, ল্যাপটপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, আর শিক্ষক রুমে মোবাইলও রাখা যায় না।
প্রথম দিনেই তাঁর পরিচয় হয় আনোয়ার স্যারের সঙ্গে।
— “আপনি তো নতুন, আমি আনোয়ার আহমেদ। ক্লাস শুরুর আগে প্ল্যান করে নিয়েছেন?”
তাজুল একটু ইতস্তত করে, “জি… মানে, এখনও ক্লাসরুমটা বুঝে উঠতে পারিনি।”আনোয়ার স্যার হেসে বলেন, “চলুন, একসাথে যাই।”
সেই যাত্রার শুরুতেই দুই জনে মিলে ছুঁয়ে যেতে থাকে গল্পের প্রতিটি স্তর। তাজুল প্রথমদিকে ভেবেছিলেন, গ্রামীণ স্কুলে এসে হয়তো সময়টা কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু তিনি বুঝতে শুরু করলেন—এখানে কেবল পাঠ্যবই নয়, মানুষ গড়ার স্কুল চলছে।
একদিন শ্রাবণ নামের ক্লাস সিক্সের একটি ছেলে প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে। তাজুল হঠাৎ থমকে যান। কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। আনোয়ার স্যার এগিয়ে গিয়ে হাত রাখেন শিশুটির কাঁধে।
— “ভয় পেলে ভুল বাড়ে। সাহস পেলে ভুলগুলোও শিখিয়ে দেয়।”
শ্রাবণ থেমে যায়। ক্লাস যেন নিঃশব্দ সম্মতিতে মাথা নাড়ে।
পরে তাজুল জিজ্ঞেস করেন,
— “স্যার, আপনি কিভাবে এত ধৈর্য ধরে থাকেন?”
আনোয়ার স্যার বলেছিলেন,
— “আমরা যারা শিক্ষক, তারা তো আয়নার মতো। শিশুদের সামনে দাঁড়ালে নিজের ভেতরের দাগগুলোও স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই সাবধানে হাঁটতে হয়।”তাজুল নিজের ক্লাসে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে চান। প্রজেক্টর, ভিডিও, স্লাইড—শহরে যা তিনি শিখেছেন, এখানে তার অভাব টের পান। কিন্তু আনোয়ার স্যার তাকে থামতে বলেন না। বরং উৎসাহ দেন।
— “তুমি যা জানো, সেটা আমাদের শেখাও। আর আমরা যা জানি, সেটা তোমাকে দিব। শিক্ষকতা একপথে চলে না, দুইদিকে পথ বাড়ায়।”তাদের এই সহযোগিতায় স্কুলে নতুন একটা পরিবর্তন আসে। তাজুলের হাত ধরে আসে ডিজিটাল লার্নিং পদ্ধতি, আর আনোয়ার স্যারের ছায়ায় গড়ে ওঠে নৈতিকতা ও মানবিক সম্পর্কের চর্চা।
একদিন অভিভাবক সমাবেশ। এক মা অভিযোগ করেন,
— “আমার মেয়ে রুবিনা এখন কিছুতেই পড়তে চায় না। সারাক্ষণ গোমড়া মুখে থাকে।”তাজুল একটু উত্তেজিত গলায় বলেন,
— “এই বয়সে মোবাইলের আসক্তি বেশি। ফোন নিষিদ্ধ করে দিলে ঠিক হয়ে যাবে।”আনোয়ার স্যার মৃদু হেসে বলেন,
— “নিষেধে নয়, বোঝাতে হয়। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখো—সেখানে কী হারিয়েছে সেটা আগে বোঝো।”সমাবেশ শেষে তাজুল বলেন,
— “স্যার, আপনি কখনো রাগ করেন না?”
— “রাগ করি। তবে প্রকাশ করলে ওরা আমার কথা নয়, আমার রাগটাই মনে রাখবে।”তাজুলের একটা বড় শিক্ষা হয়, যেদিন রুবিনার গল্পটা জানতে পারেন। আনোয়ার স্যার রাতে ফোন করেছিলেন মেয়েটির মাকে। পরদিন রুবিনা স্কুলে ফিরলে তাজুল অবাক হয়ে দেখেন—কেউ কোনো বকাঝকা করেনি, তবু মেয়েটির চোখে ফিরে এসেছে আত্মবিশ্বাস।
সে দিন তাজুল তাঁর ডায়েরিতে লেখেন,
“আজ বুঝলাম শিক্ষকতা শুধু তথ্য দেওয়া নয়, কিছু মানুষ ধরে রাখার আর্তি।”প্রতি শুক্রবার সকালবেলা আনোয়ার স্যার মসজিদের পাশের ছায়ায় বসেন কোরআন হাতে। তাজুল একদিন সেখানে এসে বলেন,
— “স্যার, আপনি এত বছর ধরে একই রুটিনে চলেছেন, কখনো ক্লান্ত লাগেনি?”আনোয়ার স্যার বলেন,
— “আমি মানুষকে শেখাই বলে স্রষ্টার কাছে দায়বদ্ধ। আমার ক্লাস, আমার প্রতিটি বাক্য, এমনকি ছাত্রের চোখের দিকে তাকানো—সবই একদিন আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। আমি যদি খেয়াল না রাখি, আমি নিজেই নিজের শিক্ষাকে খুন করব।”তাজুল চুপ করে বসে থাকেন। তার সামনে যেন এক আয়না ধরে কেউ তাকে দেখিয়ে দেয়—তোমার দায়িত্ব কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের প্রতিও।
2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


চমৎকার লেখা। এমন শিক্ষকই তো প্রকৃত শিক্ষাগুরু।