Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • আলোপথের যাত্রী
    সুমনা চোখে সে ছিল প্রাণবন্ত, হাসিখুশি আর কর্মঠ। কিন্তু এই বাইরের উজ্জ্বল মুখের আড়ালে এক ছিল একটি সাধারণ মেয়ের নাম। সে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করত। বন্ধুবান্ধবদের বিষণ্ণ পৃথিবী গড়ে উঠছিল, যেটা কেউ বুঝতে পারত না— এমনকি সুমনাও ঠিক করে বুঝে উঠতে পারত না কী ঘটছে তার ভেতরে।
    সেই শুরুটা হয়েছিল হঠাৎ করেই—কোনো এক মন খারাপের দিন। খুব ছোট কিছু, তবুও গভীর কিছু। একটা পরীক্ষায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না আসা, প্রিয় বন্ধুর সাথে একটুখানি ভুল বোঝাবুঝি, কিংবা পরিবারের চাপে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে বাধ্য হওয়া—এই সবকিছু মিলে সে ধীরে ধীরে ভিতরে ভিতরে খসে পড়ছিল।
    প্রথমদিকে সুমনা খেয়ালই করেনি, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে পারল, তার আগ্রহগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আগে যে গান সে গলা ছেড়ে গাইত, এখন সেটাও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বই পড়া, ছবি আঁকা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা—সব যেন তার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠেছিল। রাতে ঘুম আসত না, চোখের পাতা এক করলেও মাথায় চলত নেতিবাচক চিন্তার ঝড়। দিনে উঠে ক্লাসে যেত, কিন্তু মন থাকত না। সে শুধুই চাইত, কেউ যেন তাকে না ডাকে, না চিনে, না কিছু জিজ্ঞাসা করে।
    একদিন ক্লাসের এক শিক্ষকের প্রশ্নে সে চুপ করে ছিল—উত্তর জানা ছিল, তবুও ঠোঁট যেন শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেদিন তার এক বন্ধু, অন্তু, দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিল, “তুই আগের মতো নেই রে, সুমনা।”
    এই “আগের মতো নেই” কথাটা খুব নাড়া দিয়েছিল তাকে। হ্যাঁ, সে বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু এই বদল তার নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এক রাতে সে ঠিক করল, সব লিখে ফেলবে। টেবিলের ডায়েরিতে সে লিখল, “আমি জানি না কেন এমন হচ্ছে। আমি ক্লান্ত, অথচ ঘুমাতে পারি না। কেউ পাশে নেই বলে মনে হয়। একা একা বাঁচা কঠিন। আমি চাই—এই যন্ত্রণাটা শেষ হোক। কেউ যদি বুঝত…”
    এই “কেউ যদি বুঝত”—এই আকুতি থেকে সে শেষ পর্যন্ত সাহস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেন্টারে গেল। দরজা খুলেই সে বলেছিল, “আমি জানি না আমার কী হয়েছে, কিন্তু আমি আর আগের মতো নেই।” মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ধৈর্য ধরে তার সব কথা শুনলেন, মুখের রেখায় কোনো তাড়াহুড়ো বা বিচার-বিশ্লেষণ ছিল না, ছিল শুধু একরাশ সহানুভূতি।
    কাউন্সেলর তাকে বুঝিয়ে বললেন হতাশার নানা দিক—জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, পারিপার্শ্বিক কারণ। বললেন, “এই অনুভূতিগুলো অস্বাভাবিক নয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়।”
    এরপর শুরু হয় সুমনার ভেতরকার যুদ্ধে আলো ফিরিয়ে আনার লড়াই।
    সুমনা থেরাপি নিতে লাগল। CBT বা কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিতে সে নিজের নেতিবাচক চিন্তাগুলো চিহ্নিত করতে শিখল। আগে যে চিন্তা করত—“আমি কোনো কাজেই পারি না”—এখন সে চিন্তা করে, “আমি হয়তো সবসময় সফল না, কিন্তু আমি চেষ্টা করি এবং আমি এগিয়ে যেতে পারি।”
    ওষুধও দিতে হয়েছিল কিছুদিন। চিকিৎসকের পরামর্শে সে সেগুলো নিয়ম মেনে খেয়েছে। ঘুম আসা শুরু করল, আগের চেয়ে ভালো লাগতে লাগল ধীরে ধীরে।
    এক পর্যায়ে সে নিজের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন আনল। প্রতিদিন সকালে সে ঘুম থেকে উঠে হেঁটে আসত ছাদে। সূর্যের আলো গায়ে মেখে দম নিয়ে সে নিজেকে বলত—“আজ আমি একটু ভালো বোধ করছি।” সে আবার শুরু করল গান গাওয়া, ছবি আঁকা। বইয়ের পাতায় হাত ছোঁয়াল, কবিতার ছত্রে চোখ রেখে মন বসাল।
    বন্ধু অন্তু ওর পাশে ছিল শুরু থেকেই। অন্তু একদিন বলেছিল, “তুই ভাবিস না, আমরা আছি। সবসময়।” এই ‘আমরা আছি’ শব্দগুলো সুমনার মনে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। সুমনা বুঝতে পারছিল, সামাজিক সমর্থনের গুরুত্ব কতটা।
    সে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হতাশাজনিত সচেতনতা সেমিনারে নিজের গল্প বলেছিল। তার কথা শুনে অনেকেই চোখ মুছেছিল। কারণ, তারা দেখেছিল—একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসে।
    সুমনা এখন মাসে একদিন সাপোর্ট গ্রুপে যায়, অন্য হতাশায় ভোগা মানুষদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের ভয়গুলো ভাগ করে। সে জানে, কিছু যন্ত্রণার ভাষা হয় না, কিন্তু কেউ পাশে থাকলে, সেই যন্ত্রণা কিছুটা হালকা হয়।

    2
    2 Comments
Skip to toolbar