Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • ________________________________________
    ধরিত্রীর কান্না
    অরণ্যের কোলে এক ছোট্ট গ্রাম ছিল, নাম তার বনগ্রাম। চারপাশে ছিল প্রাচীন শাল, গর্জন, মহুয়া, পলাশ, তেঁতুল আর বটগাছের ছায়া। সকাল হলেই শালবনের ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ত গ্রামের মাটিতে। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যেত কাকলী নদী। সেই নদীর জলে সূর্য পড়ার সময় লাল আভা দেখা যেত, যেন নদী নিজেই লাল শাড়ি পরে সেজেছে। নদীর তীরে বসে গ্রামের শিশুরা নেমে আসা বিকেলে জলকেলি করত, আর পাড়ের কচুরিপানায় শাপলা-শালুক ফুটে থাকত রঙিন হাসির মতো। নদীর জলে স্নান করত গ্রামের গরু-বাছুর। সন্ধ্যায় শীতল বাতাস বইত নদীর দিক থেকে, গাছের পাতাগুলো দুলত, আর কাকলীর কুলুকুলু ধ্বনি মিশে যেত পাখির গানের সাথে।
    সেই গ্রামে ছিল এক বয়স্কা বৃক্ষ। গ্রামের মানুষেরা যাকে ডাকত “ধরিত্রী মা”। আসলে সে ছিল এক প্রাচীন বটগাছ। তার বিশাল ডালপালা গ্রামটিকে ছায়া দিত, আর শেকড় মাটির অনেক গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল। গাছটির কাণ্ডে হাত দিয়ে গ্রামের বয়স্করা বলত,
    – “এই গাছ আমাদের মায়ের মতো। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন এ গ্রামে এসেছিল, তখনও এই গাছ ছিল। আমরা যেদিন থাকব না, সেদিনও থাকবে।”
    গাছের কোটরে বাসা বেঁধেছিল কাঠঠোকরা, লালবউ, সবুজ টিয়া। বিকেলে শালিক আর দোয়েল খেলা করত বটগাছের ডালে। গ্রামের বুড়ো-বুড়িরা গাছতলায় বসে গল্প করত, শিশুরা গাছের মূল ধরে দোল খেত। সন্ধ্যা হলে হরিশ চাচা নামাজ শেষে এসে বসতেন ধরিত্রী মায়ের তলায়। তিনি বলতেন,
    – “এই গাছের ছায়ায় বসলে মনে হয় মায়ের কোলে বসেছি।”
    কিন্তু পরিবর্তন শুরু হয়েছিল অদৃশ্যেই। একদিন সকালে কাকলী নদীর তীরে শোরগোল শুরু হলো। শহর থেকে কিছু লোক এসেছিল, তাদের হাতে নকশা, কাগজপত্র আর লাল ফিতা বাঁধা পরিমাপের যন্ত্র। তারা মাটি মাপছিল, নদীর পাড়ে লাল রঙের খুঁটি গেঁথে যাচ্ছিল।
    গ্রামের মানুষ ভয়ে কাঁপছিল। বৃদ্ধ হরিশ চাচা, যার বয়স আশির বেশি, কাঁপা কাঁপা পায়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
    – “কী হচ্ছে বাবারা?”
    এক ইঞ্জিনিয়ার মাথা তুলে চশমা ঠিক করে বলল,
    – “এখানে বড় ফ্যাক্টরি হবে। নদীর জল ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। আর রাস্তা হবে শহর পর্যন্ত। উন্নয়ন হবে কাকলী পাড়ের।”
    হরিশ চাচা নিঃশব্দে আকাশের দিকে তাকালেন। তার চোখ ভিজে উঠেছিল। সেদিন বিকেলে তিনি ধরিত্রী মায়ের কাছে গিয়ে মাথা ঠেকালেন। বটগাছটির গুঁড়িতে হাত রেখে ফিসফিস করে বললেন,
    – “মা, আমাদের ক্ষমা করো। আমরা কিছুই করতে পারছি না।”
    ________________________________________
    এরপর শুরু হলো নির্মাণকাজ। প্রথমে বনে ঢুকল বড় বড় ক্রেন, বুলডোজার, ট্রাক। দিন-রাত থেমে থাকল না গাছ কাটার শব্দ। শাল, গর্জন, তেঁতুল – সব একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। যে পাখিরা গাছের ডালে বাসা বেঁধেছিল, তারা ভয় পেয়ে উড়ে গেল দূর অজানায়। কাঠঠোকরা, খাটাশ, গুইসাপ, হনুমান – সবাই উদ্বাস্তু। তাদের চোখে ছিল আতঙ্ক। রাতের পর রাত মাটি কেঁপে উঠল, বাতাস ভারী হলো করাতকলের গন্ধে।
    একদিন ছোট্ট রুমানা তার মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল, বটগাছটির এক বিশাল ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। সেই ডাল থেকে সাদা আঠার মতো রস ঝরছে। রুমানা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
    – “মা, গাছটা কাঁদছে না?”
    তার মা চুপ করে রইল। কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
    ধীরে ধীরে কাকলী নদীর জল ঘোলা হতে লাগল। ফ্যাক্টরির বর্জ্যে নদীর মাছ মরে ভেসে উঠতে লাগল। শিশুদের শরীরে দেখা দিল অদ্ভুত চুলকানি, চোখ লাল হয়ে যেত। মেয়েরা কুয়ো থেকে জল তুলতে গিয়ে দেখতে পেল জলে কালচে আভা। এক সন্ধ্যায় গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো –
    – “সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। কুয়োর জল আর নদীর জল পান করবেন না।”
    ________________________________________
    বৃদ্ধ হরিশ চাচা দিন দিন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলেন। সেই শরীর নিয়েই এক বিকেলে তিনি ধরিত্রী মায়ের কাছে এলেন। বটগাছটির শরীরে বিশাল দাগ, কেটে ফেলা ডালের স্থান শুকনো হয়ে বাদামী রঙ ধারণ করেছে। গাছের চারপাশে মাটি খুঁড়ে রাখা, যেন তার শিকড়ও উপড়ে ফেলার প্রস্তুতি। হরিশ চাচা গাছের গুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন,
    – “মা, তোমার কান্না আমরা শুনতে পাই না, কিন্তু প্রকৃতি শুনতে পায়। তাই তো এত ঝড়-বৃষ্টি, খরা-বন্যা। এসব তোমার রাগ নয় মা, তোমার ক্রন্দন। আমাদের লোভ তোমাকে শেষ করে দিচ্ছে।”
    সেই রাতে হঠাৎ ঝড় উঠল। বিদ্যুতের তীব্র আলোয় পুরো গ্রাম বারবার ঝলসে উঠছিল। গ্রামের শিশুদের মনে হলো আকাশ কাঁদছে। বাতাসে হাহাকার, বৃষ্টি যেন শোকের অশ্রু। তারা ভয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরল।
    সকালে দেখা গেল – ধরিত্রী মা আর নেই। শতবর্ষের প্রাচীন বটগাছটি ঝড়ে উপড়ে গেছে। গোড়ার মাটি থেকে বেরিয়ে এসেছে শিকড়। গাছটির চারপাশে শূন্যতা, মৃতপ্রায় শেকড়গুলো খোলা আকাশের নিচে শুকোচ্ছে। যেন শত বছরের ইতিহাস মিশে গেল নোনাজলে।
    ________________________________________
    তবুও থামল না মানুষের লোভ। কয়েক বছরের মধ্যেই বনগ্রাম রূপান্তরিত হলো শহরে। ফ্যাক্টরির কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে থাকত। কাকলী নদী শুকিয়ে গেল, নদীর তলদেশে জমে রইল পলিথিন, বিষাক্ত বর্জ্য আর কালো পাথরের স্তূপ। ফুল ফুটত না, পাখি ডাকত না। জীববৈচিত্র্য নিঃশব্দে হারিয়ে গেল।
    কিন্তু মানুষের শান্তিও ছিল না। শিশুদের ফুসফুসে কাশি, হাঁপানি লেগেই থাকত। বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে গেল। কখনো তীব্র খরা, মাঠের ফসল পুড়ে ছাই; কখনো অঝোর বৃষ্টি, বাড়িঘর ভেসে যেত। চারপাশে শুধু মৃত্যুর গন্ধ। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে জায়গা হতো না। বাতাসে ভয়, নদীতে শূন্যতা, আর মানুষের চোখে অনিশ্চয়তা।
    ________________________________________
    একদিন শহরের একটি স্কুলে পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষক বললেন,
    – “বাচ্চারা, আজ তোমাদের একটি গল্প বলি। এই যে আমাদের শহর, একসময় এখানে ছিল বনগ্রাম। ছিল প্রাচীন বটগাছ, নাম ছিল ধরিত্রী মা। ছিল কাকলী নদী, শাল, মহুয়া, পলাশ, আর পাখির কোলাহল। আমরা মানুষরা সেই বন কেটে ফেলে শহর বানিয়েছি। নদী মেরে ফেলেছি। বটগাছ উপড়ে ফেলেছি। তাই আজ ধরিত্রী মা কাঁদছে। আর সেই কান্না নেমে আসছে ঝড়, খরা, বন্যা, রোগ আর মৃত্যুর রূপে।”
    এক শিশু হাত তুলল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল। সে বলল,
    – “স্যার, আমরা কি আবার ধরিত্রী মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে পারি?”
    শিক্ষক চোখ মুছলেন। বললেন,
    – “হ্যাঁ বাছা। আমরা যদি আবার গাছ লাগাই, নদীর জল দূষণ না করি, প্লাস্টিক কমাই, প্রকৃতিকে ভালোবাসি, তাহলে হয়তো একদিন ধরিত্রী মা আমাদের ক্ষমা করবেন।”
    ________________________________________
    সেই বিকেলে স্কুলের বাচ্চারা শিক্ষককে নিয়ে স্কুলের পেছনে গিয়ে গর্ত খুঁড়ল। এক শিশু রোপণ করল বটগাছের চারা, আরেকজন জামগাছ, আরেকজন শিমুল। তারা চারা গাছের গোড়ায় পানি ঢেলে বলল,
    – “মা, আমরা তোমাকে আবার ফিরিয়ে আনবো। তুমি আবার হাসবে, আমরা আবার তুমার ছায়ায় খেলবো।”
    আকাশে তখনও অস্ত যাওয়া সূর্য লাল আভা ছড়াচ্ছিল। মৃদু বাতাসে পাতাগুলো দুলছিল। দূরে কোথাও যেন শোনা গেল এক দীর্ঘশ্বাসের মতো –
    – “আমার সন্তানরা যদি সত্যিই ভালোবাসে, তবে হয়তো আবার আমি সবুজ হবো।”
    ________________________________________
    মূলমন্ত্রঃ
    ধরিত্রী শুধু গল্পের চরিত্র নয়। তিনি আমাদের মা। তার কান্না থামাতে হলে আমাদেরকেই বদলাতে হবে। কারণ পৃথিবী বাঁচলে তবেই আমরা বাঁচবো।

    4
    5 Comments
    • অসাধারণ

    • আমরা প্রাণ-প্রকৃতিরই অংশ। ধরিত্রি মা বা প্রকৃতিকে বিনস্ট করে আমরা ভালো থাকবো, এ হতেই পারে না। বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে আনার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 04 July 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar