-
অপেক্ষা
নুরুল হক সাহেবের জ্বরের দিনগুলোতে খুব কৈ মাছের দোপিয়াজি খাওয়ার ইচ্ছে হলো। তিনি জ্বরের দিনগুলোতে তেমন কিছুই খেলেন না। ফ্রিজে দুধ ছিল। বুয়াকে ব্রেড কিনে আনতে বলেছিলেন। জ্বরের দিনগুলোতে ব্রেড তাওয়ায় সেকে আর দুধ গরম করে সেই দুধে ব্রেড চুবিয়ে খেয়ে নিলেন।
অনেক দিন আগে তার বোনের কালা জ্বর হয়েছিল। কবিরাজ তাকে না খাওয়ার বিধান দিয়েছিলেন। বোনটি একটু মাছ-ভাত খাওয়ার জন্য খুব কাদতো। কবিরাজের বিধান ছিল খুব কঠোর। বোনটিকে কেউ কিছু খেতে দিল না। একদিন সেই বোন মরে গেল।
নুরুল হক সাহেব জ্বর থেকে উঠে বাজারে গেলেন। উদ্দেশ্য কৈ মাছ কেনা। এই ভরা বর্ষায় বাজারে প্রায় সব মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু তার চোখ খুজছিল কৈ মাছ। একটু খুজেতেই পেয়ে গেলেন কৈ মাছ। চাষের কৈ না একেবারে আসল কৈ। এজন্যই তিনি বাজারে এসেছেন। ছোটবেলার মতো কৈ এর দোপিয়াজি খাবেন বলে এতো কষ্ট করে বাজার করছেন।
আপাতত তিনি জ্বর বিষয়ক ছুটি কাটাবেন বলে ঠিক করেছেন। তাই নিশ্চিন্ত ছিলেন তিনি। কলেজ থেকে তার ছুটি নেওয়া হয়না বললেই চলে। তারপরেও তিনি সুযোগ পেলেই অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে থাকেন। অনেক ছাত্র ছাত্রী আসে তার বাসায়। অকৃতদার নুরুল হক সাহেবের সময় খুব ভালো কাটে।
বুয়ার জন্য অপেক্ষা না করে কাপড় বদলে মাছ কাটতে ও ধুতে শুরু করলেন তিনি। এই বর্ষায় বাড়িতে থাকলে অনেক মাছ ধরতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা সিপ হাতে পুকুর পাড়ে বসে থাকতেন। কখনো কখনো মায়ের সঙ্গে বসে মাছ রান্নাও করতেন। বাড়িতে একটা উতসব উতসব আবহ তৈরি হতো।
তাই মাছ কাটা ও রান্না করা তার কাছে নতুন কিছুই না। বেশ উৎসাহের সঙ্গে মাছ রান্না করার পরে বুয়া উকি দিল। ভাত রান্না বুয়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে উঠে পরলেন তিনি। পেটের মধ্যে একটা খিদের ভাব ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গোসল করে ভাত খেতে বসলেন কিন্তু কিছুই তেমন খেতে পারলেন না। হাত মুখ ধুয়ে উঠে পরলেন।
তখন থেকে ব্যালকনিতে বসে সামনের মাঠের দিকে খেয়াল রাখছেন ক্ষুধার্ত কাউকে পেলে ভাত মাছ খেতে ডাকবেন। কিন্তু কাউকে তেমন দেখা গেল না। রাষ্ট্র ভিখিরি শুন্য হয়ে উঠেছে। এখন কেউ বাসা বাড়িতে ভিক্ষা নিতেও আসে না। বুয়াকে দেওয়া যাবে না। বুয়ারা তার চেয়ে ভালোই খায়।
মুন্সির গ্যারেজের দিকে একজন অন্ধ ভিখিরি বসে। তার জন্য ভাত আর মাছ একটা বক্সে করে নিয়ে যাবেন ভাবলেন তিনি। মুন্সির গ্যারেজে গিয়ে অনেকক্ষণ হাটাহাটি ও চা খাওয়ার পরে ভিখিরিটিকে খুজে পেলেন তিনি। কিন্তু এই লোককে খাইয়ে কোন তৃপ্তি নেই। ভাবলেশহীন মুখ। নাটকীয় সংলাপ উচ্চারণ করে ভিক্ষা চায়। নুরুল হক সাহেব বক্স নিয়ে ফিরে আসলেন।
এই মাছ তিনি কোন কিশোর বা কিশোরীকে খাওয়াবেন যারা খুব আহ্লাদের সঙ্গে মাছ-ভাত খাবে।
সেরকম একজনের জন্য অপেক্ষা করে রইলেন তিনি।4 Comments-
-
“অপেক্ষা” একটি অন্তর্মুখী ও সংবেদনশীল গদ্য, যেখানে নুরুল হক সাহেব নামের এক নিঃসঙ্গ, মধ্যবয়সী কলেজশিক্ষকের জ্বরাবস্থায় কৈ মাছের জন্য আকুলতা থেকে একটি গভীর মানবিক অপেক্ষা তৈরি হয়। কৈ মাছ রান্না কেবলমাত্র খাবার নয়, এটি তার শৈশব, স্মৃতি ও হারানো সম্পর্কের প্রতি এক অন্তর্গত টান।
গল্পের মধ্যে একদিকে যেমন আছে ব্যক্তিগত স্মৃতির কোমলতা—বোনের মৃত্যুর যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা, মাছ ধরার আনন্দময় দিনগুলি—তেমনি অন্যদিকে বর্তমানের নিঃসঙ্গতা ও ‘দেয়ার মানুষ’ না পাওয়ার হাহাকার।
শেষ পর্যন্ত, এই গল্প একরকম প্রতীক হয়ে ওঠে—যেখানে কৈ মাছের দোপিয়াজি কেবল রন্ধনপ্রণালী নয়, বরং ভালোবাসা, শেয়ার করা, এবং সেইসব মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা, যা জীবনের একাকীত্ব ভেঙে দেয়।
মূল বক্তব্য:
খাবার কেবল ক্ষুধা মেটায় না—তা আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসারও বাহক। সেই ভালোবাসা কাকে দেওয়া যাবে—এই প্রশ্নই হয়ে ওঠে গল্পের মূল অপেক্ষা।সংক্ষেপে:
একটি নরম, ধীর ও আবেগঘন গদ্য যা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায় নিঃশব্দে।
-
Friends
Rokter Sagor
@roktersagor
Promit Chowdhury
@promitchowdhury
Mahmudul Hasan
@mahmudulhasan1
Emran Hasan Najmul
@emranhasannajmul
Arif
@arif1
Dipankar Shuva
@dipu42dramagmail-com
Maizbhandari Sufi Academy
@maizbhandarisufiacademy
Sharmin
@sharmin1
Zahidul Islam Roni
@roni03

অসাধারন