-
শ্বাসের হিসেব
ফিরোজা বেগম কাশছিলেন টানা সাত দিন। প্রথমে মনে হলো, আবহাওয়া বদলের প্রভাব। কখনও কখনও বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে, যেন পুরোনো কোনো দুঃখ জমে আছে ফুসফুসে। কিন্তু এবার কেমন জানি অন্য রকম—একটানা হাঁটতে গেলে শ্বাস ছোট হয়ে আসে, ঘুমের সময় মাঝেমাঝে দম আটকে যায়। বুকের পাঁজরে যেন কারও অদৃশ্য মুঠো।
তামান্না, তাঁর একমাত্র মেয়ে, এইসব দেখেও চুপচাপ ছিল কিছুদিন। ভাবছিল, হয়তো মায়ের বয়স বেড়েছে, হয়তো একটু অলসতা চেপে বসেছে শরীরে। তবে চিন্তার ছায়া তার চোখের কোণ ঘিরে ফেলল যেদিন ফিরোজা বাথরুমে ঢুকে পড়ে গেলেন। হাত-পা কাঁপছিল, জিভ শুকিয়ে কাঠ।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। নানা পরীক্ষার পর চিকিৎসক মুখে একটা গাঢ় রঙ ছায়া নিয়ে বললেন, “আপনার মায়ের ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়েছে, দ্বিতীয় স্তরে। এখনই চিকিৎসা না শুরু করলে জটিল হতে পারে।”
তামান্না যেন হঠাৎই বড় হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল বাবার সিগারেট-ভরা জীবনের কথা। ছোটবেলায় সে মায়ের আঁচলে লুকিয়ে থাকত যখন বাবা খাওয়ার টেবিলেই ধোঁয়ার কুয়াশা তৈরি করতেন। তখন ফিরোজা কিছু বলতেন না। বলতেও পারতেন না। স্বামী রাগ করবেন, মেয়েকে ছোট করবেন—এই আশঙ্কার দেয়ালে ঠেকে থেকেছেন সবসময়।
সেই নীরবতার খেসারত এখন তাঁর ফুসফুস দিচ্ছে।
ডাক্তার বলেছিলেন, ধূমপান না করলেও আশপাশের ধোঁয়া বহু বছরের বিষ ছড়িয়ে দেয়। একটা মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ধরে অন্য কারও ধূমপানের ধোঁয়া গ্রহণ করে, তখন সে নিজের অজান্তেই নিজের শরীরে বিষ জমায়।
তবে কেবল ধোঁয়াই নয়। ফিরোজার দিন কাটত সোফায় হেলান দিয়ে, কখনও বিছানায় আধশোয়া হয়ে। টিভি দেখা, খাওয়া আর তামান্নার জন্য রান্না করা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের রুটিন। হাঁটাহাঁটি নেই, শরীর সচল রাখার কোনো অভ্যেস নেই। অলসতা চুপিচুপিই দেহে বাসা বেঁধেছিল, আর সে অলসতা ফুসফুসের রক্তসঞ্চালনেও ছায়া ফেলেছিল।
আর ছিল সেইসব সুগন্ধি—তামান্না ঘর ভালো রাখতে নানা রকম রুম ফ্রেশনার ছিটাতেন। ফিরোজা কখনও বলেননি কিছু, বরং হাসিমুখেই মেয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই কৃত্রিম সুগন্ধির ভেতর লুকানো রাসায়নিক ধীরে ধীরে তাঁর শ্বাসনালীকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
এইসব বুঝে উঠতে সময় লাগেনি তামান্নার। কেমোথেরাপির পর মা যখন নিস্তেজ হয়ে বসে থাকতেন, তখন মেয়ের ভিতরে চলত অপরাধবোধের যুদ্ধ। নিজের শৈশবের, নিজের অবহেলার, নিজের না বোঝার দুঃখে একেকটা রাত ছিল শ্বাসরুদ্ধকর।
তবু ফিরোজা বাঁচতে চেয়েছিলেন। অন্তত নিজের গল্পটা বলে যেতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, “তামান্না, যদি আমি পুরোপুরি না-ও সেরে উঠি, তুই আমার অভিজ্ঞতাটা অন্যদের শোনাস। যেন কেউ আর চুপ করে না থাকে, যেন কেউ আর ‘আমি ধূমপান করি না, তাই নিরাপদ’ এমন ভুল না করে।”
এরপর তাঁদের দুজনের জীবন বদলে গেল। ফিরোজা প্রতিটি কেমোথেরাপির পর একটু করে হাঁটতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে উঠানে পা রাখলেন। তাঁর চলাফেরা সীমিত থাকলেও চিন্তা ছড়িয়ে গেল শহরের নানা প্রান্তে।
তামান্না স্থানীয় স্কুলে, নারীকেন্দ্রের আড্ডায়, এমনকি অনলাইনেও শুরু করল এক নতুন ধারার আলোচনা—’শ্বাসের অধিকার’ নিয়ে। ফিরোজা কখনও লাইভে এসে নিজের গল্প বলতেন, কখনও ভিডিও বার্তায় শোনাতেন জীবনের নিঃশব্দ যন্ত্রণাগুলো। তিনি বলতেন, “আমি শিখেছি—ঘরের ভদ্রতা, নীরবতা কিংবা সহনশীলতাও কখনও কখনও মৃত্যুর ডাকে সাড়া দেয়। আজ আমি জানি, কেবল সিগারেট নয়—অলসতা, ভুল অভ্যাস, পরিবেশের বিষাক্ততা সবকিছুই আমার শ্বাস কেড়ে নিচ্ছিল ধীরে ধীরে।”
একদিন এক ছোট্ট মেয়েটি একটি ছবি এঁকে পাঠাল। ছবিতে দেখা গেল—একজন নারী সোফায় হেলান দিয়ে বসে, তার সামনে হুক্কা থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া। পাশে বসে আছে একটা ছোট ছেলে, যার মুখে মাস্ক। ফিরোজা ছবিটি হাতে নিয়ে বললেন, “এই ছোট্ট ছবিই বলে দিচ্ছে, আমরা আর নিঃশ্বাসকে অবহেলা করতে পারি না।”
জীবনের শেষ দিকে এসে ফিরোজা বুঝলেন, জীবন কেবল দীর্ঘ হওয়ার জন্য নয়—সচেতন হওয়ার জন্য। তাঁর গল্প কেবল একজন মায়ের অসুখ নয়, এটি এক জীবনের অনুচ্চারিত ইতিহাস।
তাঁর কষ্ট এক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করুক—এই ছিল তাঁর একান্ত কামনা।
তামান্না একদিন একটি লাইভে বললেন, “আমার মা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—শুধু খাবার, পানি বা ঘুম নয়, শুদ্ধ বাতাসও জীবন ধারণের অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার জন্য কখনও কখনও একটা নিঃশ্বাসই প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।”
ফিরোজা বেগমের গল্প তাই শেষ হয় না। তাঁর প্রতিটি শ্বাস এখন গল্প হয় অন্যের বাঁচার জন্য। শুধু শ্বাস নেওয়া মানেই জীবন নয়—জীবন মানে শুদ্ধভাবে বাঁচা।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

জীবন মানে শুদ্ধভাবে বাঁচা।……………………চমৎকার অভিব্যক্তি