Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • ________________________________________
    আলোর প্রহরী
    ________________________________________
    তিতাস নদীর ঢেউয়ের মতোই ছিল তার চলন—নিরব, ধীর, অথচ গভীর। তিতাস চৌধুরীর নাম উচ্চারণ করলেই কেউ যেন থমকে যেত। কেউ ভাবত—এও কি সম্ভব? এমন এক মানুষ, যার জীবন ছিল নীরব সংগ্রামে ভরা, অথচ কোনও প্রচার ছিল না; যার কাজ ছিল পাহাড়সম, অথচ কণ্ঠ ছিল পাখির মতো শান্ত।
    সকাল সাতটায় ঘড়ির কাঁটা যখন একসঙ্গে ওঠে দাঁড়াত, তখন তিতাস চৌধুরী তার ঘাড়ে বইভরা ব্যাগ নিয়ে স্কুলের পথে রওনা হতেন। তার চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস, আর পায়ে ছিল ক্লান্তিহীন ছন্দ। শিক্ষকতা তার কাছে পেশা ছিল না—ছিল ব্রত। সমাজ যখন চাকরিকে একটি বেতনভিত্তিক চুক্তিতে রূপান্তর করেছিল, তখন তিতাস তা রূপ দিয়েছিলেন একটি আত্মিক দায়িত্বে।
    স্কুলটির নাম ছিল “তিতাস আদর্শ বিদ্যালয়”। নামের সঙ্গে মিল রেখে আদর্শিক শিক্ষাদানই ছিল এই বিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—ভাঙা বেঞ্চ, ছেঁড়া ব্ল্যাকবোর্ড, বাজেট সংকট, অনুন্নত শ্রেণিকক্ষ আর হতাশাগ্রস্ত অভিভাবকের ভিড়ে স্কুলের আদর্শ যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল। একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেই আদর্শকে প্রাণ দিয়ে ধরে রেখেছিলেন, তিনি তিতাস চৌধুরী।
    তিনি ছিলেন শিক্ষক, পরামর্শদাতা, কাউন্সেলর, এবং একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু—শিশুদের কাছে, অভিভাবকদের কাছে, এমনকি সহকর্মীদের কাছেও। তাঁর চোখে কোনো ছাত্র ‘খারাপ’ ছিল না, ‘অবাধ্য’ ছিল না, ‘অযোগ্য’ ছিল না। প্রত্যেকের ভেতরে তিনি খুঁজে নিতেন এক সম্ভাবনার বীজ। একবার হেড টিচার সভায় বলেছিলেন,
    —“প্রতিটি বাচ্চা একটি আলাদা গল্প। আমাদের কাজ হলো সেই গল্পের প্রথম পাতাটা সযত্নে উল্টানো। কীভাবে শেষ হবে, তা সময় জানে। কিন্তু শুরুর দায়িত্ব আমাদের।”
    তিতাস চৌধুরীর জীবনসঙ্গী ছিল না। পরিবারের চাপে বহু বিবাহ প্রস্তাব এলেও তিনি বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আমার সময় যারা দাবি করে তারা ছোট নয়। আমি তাদের প্রতিদিন বড় করে তুলছি।” এ কথা শুনে কেউ কেউ তাকে ‘অলৌকিক’ বলত, কেউ বলত ‘পাগল’। কিন্তু সে তো সব যুগেই হয়—যারা আদর্শ নিয়ে বাঁচে, তারা নিজের সময়েই উপহাস পায়, মরার পর পায় মহিমা।
    শুধু ছাত্রদের ভালোবাসা নয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্যও তার দরজা ছিল খোলা। সন্ধ্যায় বস্তির শিশুদের জন্য খোলা রাখতেন নিজের টিনশেড ঘরের বারান্দা। সেখানে মাটিতে বসেই চলত পাঠদান। কখনও ইংরেজি শেখাতেন, কখনও স্বপ্ন দেখাতেন—”তোমরা একদিন ডাক্তার হবে, শিক্ষক হবে, বড় মানুষ হবে। তবে আগে ভালো মানুষ হও।”
    রাজনীতির পরিচয় তার ছিল ঠিকই, কিন্তু তা যেন তার ব্যক্তিত্বের পোশাক ছিল না—ছিল অন্তর্লীন পরিচয়। জেলার এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও কখনো ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা পদমর্যাদার মোহ তাকে ছুঁতে পারেনি। একবার এক বড় নেতা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
    —“তোমার তো যোগ্যতা আছে, বললেই কলেজের অধ্যক্ষ করে দিতে পারি।”
    তিনি মাথা নাড়লেন, “আমার সন্তানেরা এখনো পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তাদের সঙ্গে থাকতে চাই।”
    তার রাজনীতি ছিল নীরব মানবিকতা—নাড়ি ভেজা মাটির সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন।
    এভাবেই কাটছিল দিন। হঠাৎ এক দিন ঘটল অঘটন। সেপ্টেম্বরের এক দুপুর। ক্লাস চলাকালে পুরোনো ভবনের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক-শিক্ষিকা-ছাত্র সবাই প্রাণপণে বের হয়ে যায়। কেবল তিতাস চৌধুরী ছিলেন অনুপস্থিত। কেউ খেয়াল করেনি তখন—তিনটি শিশু তখনও আটকে পড়েছিল ক্লাস টু-তে। ধোঁয়ার মধ্যে করুণ কান্না শুনে ছুটে যান তিনজন লোক, কিন্তু সাহস পাননি কেউই ভিতরে ঢুকতে। হঠাৎ কেউ চিৎকার করে ওঠে,
    —“তিতাস ম্যাডাম ভিতরে ঢুকেছেন!”
    অভিভাবকেরা আঁতকে ওঠে। ধোঁয়ার ভেতরে দেখা যায় তার সাদা ওড়নার আঁচল। আগুনকে উপেক্ষা করে তিনি জানালার গ্রিল খুলে তিনটি শিশুকে একে একে বের করে দেন। শেষ শিশুটি বেরিয়ে আসতেই ভবনের ছাদ ভেঙে পড়ে তার মাথার উপর।
    তার মুখে তখনো হাসি ছিল, চোখ বন্ধ, হৃদয় নিঃশব্দ। পরদিন জাতীয় পত্রিকার একটি ছোট কলামে লেখা হয়—“এক শিক্ষিকার আত্মবলিদান।”
    কিন্তু যারা তাকে চিনত, তারা জানত—এ শুধু এক দিনের ‘হিরোইজম’ নয়, বরং ছিল এক জীবনের প্রতিচ্ছবি।

    6
    2 Comments
Skip to toolbar