Profile Photo

Kanej-RoksanaOffline

  • Kanej-Roksana
  • Profile picture of Kanej-Roksana

    Kanej-Roksana

    • 1 year, 3 months ago

    জোমাত

    গ্রামের শেষ প্রান্তে যে মোল্লা বাড়ি আছে সেখানেও দাওয়াত পৌঁছে দেয় হাবিব। বংশ তাদের এক। এখন বাড়িগুলো ছড়িয়ে গেছে শুধু। বাড়ির মেঝ বৌটা মারা গেছে আজ দুই দিন। সেই বৌয়ের নামে জোমাত খাওয়া। বড় ভাই একটা গরু জবাই করতে বলেছে। খরচ হিসেবে বিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। অন্য ভাইয়েরাও কিছু কিছু দেবে। হাবিব পান চিবুতে চিবুতে হালকা পায়ে হেটে চলে। শেষ পর্যন্ত সব কিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছে। মেঝ বৌয়ের না ছিল কোন টান বা খিচুনি। উপজেলা থেকে সাগর ডাক্তার প্যারামেডিককে আনা হয়েছে দুই বার। শেষটা ভালোই ছিল মেঝ বৌয়ের। বাড়িতে বাড়িতে দাওয়াত পৌঁছে দেয় হাবিব। চাচিরা তাকে আবার আবার পান খেতে দেয়। সেও মনের আনন্দে পান চিবায়।

    পরের দিন খুব সকালে চার ভাই মিলে গরু জবাই দেয়। বাড়ির বৌরা চা করে পাঠায় ফ্লাস্কে। ফ্লাস্ক থেকে প্রথম চা ঢালে মেঝ ভাই। বৌ মরায় তারই আগে ভাগে এক কাপ চায়ের বেশি প্রয়োজন। বৌয়ের প্রতি তার রাগ ছিল অনেক। প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া লাগতো। বৌ একবার বিষও খেয়েছিল। সেই থেকে তার রোগটাও বেড়েছিল। কিন্তু শেষের দিনগুলোতে সে কম যত্ন করেনি। বরিশাল নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে। উপজেলা থেকে সাগর ডাক্তারকে নিয়ে এসেছে। দুপুর বেলা মাঝে মাঝে চুলায় রান্না বসিয়ে দিয়েছে। বউ যে বাচেনি তাতে তার কীইবা করার আছে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা।

    গরুটার বয়স অল্প। এক দেড় বছরের বাছুর। মাংস কাটতে বেশি সময় লাগলো না। বড় ভাইয়ের ছেলে করিম এক পিরিচ বিস্কুট নিয়ে আসছে। রক্ত মাখা আংগুল দিয়ে টুক করে ধরে ধরে সবাই ভাগাভাগি করে বিস্কুট খেল। ভাইয়ে ভাইয়ে মিল আছে। রহিমের মনে পরে চাচির কথা। মেঝ চাচিই সবচেয়ে ভালো ছিল। সবাইকে সবচেয়ে বেশি খাওয়াতো। ওই কবরে যেতে হবে থাকবে নাতো সাথী- “রহিম কলিজার মাংস্টা ফ্রিজে নিয়ে রাখতো।” মেঝ চাচার হুকুমে কবরের কথা ভুলে যায় রহিম। ছোট চাচা কয়েকদিন আগে একটা ফ্রিজ কিনেছে। টুকটুকে লাল ফ্রিজটার কথা মনে ভেসে ওঠে তার। দ্রুত সে কলিজার মাংস নিয়ে ছোটে।

    সবাই তিন চার মাস ধরে এই মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিল। তাই কাউকেই তেমন দু:খিত দেখালো না। মেঝ বৌয়ের মেয়ে ডুমুর মাকে যতোটা পারে ফল ফলাদি খাইয়েছে। সেও দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে বসে আছে। চারদিকে চাচিরা কেউ মশল্লা বাটছে, কেউ সকালের রান্না বসিয়েছে। গত দুই দিন পাশের বাড়ি থেকে খাবার পাঠিয়েছে। বাড়ির সবার খাওয়া দাওয়া এক সাথে। বাড়ি জেগে উঠেছে শিশু আর বড়দের কথা বার্তায়। সবাই খুব ব্যস্ত। অনেক মানুষের জোমাতের রান্না। ডুমুরের ভাইটার বয়স কম। তার মন খারাপ। বোন এক কাপ চা দেয় ভাইকে। আস্তে আস্তে শোক সামলে উঠবে। মরতে তো সবাইকেই হবে।

    মরতে সবাইকে হবে-এই কথাটা যদিও সবাই বলাবলি করছে। কিন্তু বাড়িতে যে উতসব উতসব ভাব তা চেপে রাখা যাচ্ছে না। যে বউগুলো এতোদিন জা’য়ের তেমন খোঁজ খবর করেনি। তারাই সব দিকে মন দেয়। সব কিছুর পরে বাড়ির মান ইজ্জত। কোন কিছুতে যেন ত্রুটি না থাকে। ডুমুরের শাশুড়িকে চা বিস্কুট এনে দেয় এক চাচি। হু সবাইকে মরতে হবে একদিন।

    বাড়ির ছেলেরা মাংস ধুয়ে আনে কলপাড় থেকে। ডেকচিতে তেল ঢালে সেজ বৌয়ের বাপ। পাশেই বাড়ি তার। রান্না বান্না ভালো পারে। এ কর্তব্যের বোঝা তার। খুব সকালেই অসুস্থ শরীর নিয়ে হাজির সে। দায়িত্ব কর্তব্যে অবহেলা করার লোক না সে।

    যে ছেলেটা মন খারাপ করে বসে ছিল। সেও এবার উদাস চোখে তাকিয়ে উঠানের রান্না দেখে। অনেক মানুষের জন্য জোমাতের রান্না। মায়ের পেটে যখন পানি জমতে জমতে অনেক ফুলে উঠেছিল তখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে ছিল না কারো। যখন নিয়ে গেছে তখন ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে-ক্যান্সার। ক্যান্সার তার মায়ের ক্যান্সার আর বেশিদিন টিকবে না। সবাই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে আকারে ঈংগিতে। মায়ের জন্য ঢাকা থেকে আপেল কমলা কিনে আনতো সে। মা খুশি হতো যদিও মুখে বলতো, ‘তুই এইগুলা টাকা খরচ করে আনলি ক্যান’। মা, তার মা শুয়ে আছে কবরে-আর ফিরে আসবে না। দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে শুধু কয়েকবার।

    4
    1 Comment
Skip to toolbar