-
শেষ রোদ্দুরের মানুষ
লেখকের নামঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদ গ্রাম তখনো ছিল শান্ত-নিস্তব্ধ। চারপাশে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর দূরে পাহাড়ের নীলাভ রেখা। ১৯২৯ সালের ৬ আগস্টের ভোরে, যখন পাখির ডাক আর হালকা কুয়াশা মিলে গ্রামজুড়ে এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তখন জন্ম নিল এক শিশু—যার নাম রাখা হলো আবদুল গফুর।
ছোটবেলা থেকেই গফুর ছিল একটু আলাদা। অন্য ছেলেরা মাঠে দৌড়ঝাঁপে মেতে উঠলেও সে এক কোণে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে থাকত। কখনো শুনত বাড়ির আঙিনায় নারীদের গলা ভেসে আসা লালনগীতি, কখনো বা কোনো মাইজভান্ডারি সুর। তার মনে হতো, এসব গান যেন তাকে টেনে নিচ্ছে এক গভীর দরজার ভেতর, যেখানে মানুষের সব দুঃখ আর ভালোবাসা মিলেমিশে আছে।
পড়াশোনায় তেমন মন বসত না তার। স্কুলে যাওয়া-আসা করলেও মন পড়ে থাকত মানুষের কথায়—তাদের গল্প, হাসি, কান্না, আর গান। সে বুঝে গিয়েছিল, বইয়ের বাইরের জীবনই তাকে শেখাবে আসল শিক্ষা।
গফুরের গান শেখা হয়েছিল অদ্ভুত পথে। কোনো গুরু ছিল না, কোনো তালিমের পাঠশালা ছিল না। তার পাঠশালা ছিল গ্রাম, হাটবাজার আর আখড়ার আসর। বয়স্ক গায়েনদের গলায় মাইজভান্ডারি, মুর্শিদি আর মারফতি গান শুনে শুনেই সে সুরের ভেতরের গভীরতা অনুভব করতে শিখেছিল। সেই সুরে লুকিয়ে থাকা দার্শনিকতা আর সাধারণ মানুষের জীবনের কষ্ট সে নিজের ভেতর গেঁথে নিল।
একদিন পটিয়ার সাপ্তাহিক হাটে, যখন মানুষের ভিড় জমে উঠেছে, তাকে গাইতে বলা হলো। লজ্জা আর দ্বিধা মেখে গফুর গাইল—
“দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই হাটের কোলাহল থেমে গেল। দোকানি, কৃষক, মাঝি—সবাই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, তারা গান শুনছে না, বরং নিজেদের হৃদয়ের কথা শুনছে।
এরপর এল আরও গান—“সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা”—যা প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক সাধকদের মনও ছুঁয়ে গেল।
তবে জীবন তার জন্য সহজ ছিল না। ভোরে নদীতে জাল ফেলতে যেত, দুপুরে ক্ষেতের কাজে লাগত, আর রাতে উঠোনে বা হাটে গান গাইত। সংসারের অভাব, সমাজের অবহেলা—সব কিছু পেরিয়ে সে নিজের সুরের পথেই চলল। ধীরে ধীরে তার গান পৌঁছে গেল পটিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম শহরে, তারপর পুরো বাংলাদেশে। মানুষ বলতে লাগল, “গফুর ভাইয়ের গান শোনা মানে নিজের জীবনের কথা শোনা।”
বছরের পর বছর ধরে গফুর লিখল দুই হাজারেরও বেশি গান—চট্টগ্রামিয়া আঞ্চলিক গান, মাইজভান্ডারি গান, মুর্শিদি-মারফতি, হামদ, নাত। প্রতিটি গানে ছিল সহজ ভাষা, সরল কিন্তু গভীর সুর, আর মানুষের জীবনের সত্য প্রতিচ্ছবি। এক সাংবাদিক তাকে একবার জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত গান লেখেন কেমন করে?” গফুর মুচকি হেসে উত্তর দিল, “আমি গান লিখি না ভাই, গান নিজেরাই এসে আমার কাছে বসে পড়ে।”
তার গান মাইজভান্ডারি আখড়ায় যেমন বাজত, তেমনি মাঝিদের নৌকায় বা হাটের পানশালাতেও গাওয়া হতো। ধনী-গরিব, শহরের মানুষ বা গ্রামের কৃষক—সবাই তার গানের ভেতরে নিজের জীবন খুঁজে পেত। গফুর শিখিয়েছিলেন, দুঃখ ভাগ করলে তা হালকা হয়, আর ভালোবাসা দিলে তা বহুগুণে ফিরে আসে।
শেষ জীবনে তিনি বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগলেও গান লেখা থামাননি। ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বরের এক শীতল সকালে, কুয়াশা ঢাকা রশিদাবাদ গ্রামে তিনি চুপচাপ চলে গেলেন। সেই দিন চট্টগ্রামের আকাশে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। তবু তার গান বাজতে থাকল মানুষের মুখে মুখে—হাটে, ঘাটে, রেডিওতে, সামাজিক মাধ্যমে।
আজও তরুণ গায়করা বলে, “আমরা যারা আজ গান করি, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে গফুর হালির গান থেকে শিখেছি।” তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, ছিলেন এক যুগের প্রতিনিধি। তার জীবন প্রমাণ করে, সংস্কৃতি বড় শহরের মঞ্চে জন্মায় না—তা জন্ম নেয় গ্রামের ধুলোমাখা পথে, মানুষের কণ্ঠে, জীবনের সহজ অথচ গভীর অভিজ্ঞতায়।
এ কারণেই তাকে চট্টগ্রামের গানওয়ালা মানুষ বলা হয়। তার সুর, তার গান, তার জীবন—সবই হয়ে আছে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক অবিনশ্বর অধ্যায়।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


এমন একজন সংগীত সাধককের জীবন-কর্ম আমাদের সবার জন্যই অনুপ্রেরণার। আপনাকে ধন্যবাদ