Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • কলাগাছের ভেলায় ভেসে
    পশ্চিম লোন্দা গ্রামে ভোর মানেই শুধু সূর্য ওঠা নয়—এ যেন জল আর জীবনের প্রতিদিনের দ্বন্দ্বের নতুন সূচনা। গ্রীষ্ম হোক কিংবা শীত, বাতাসে লবণাক্ততার ধুলো মিশে থাকে, মাটির গন্ধে লেগে থাকে একরকম বিষণ্নতা। গ্রামটিকে ঘিরে আছে নদীর ধূসর জল, আর দূরে, অনেক দূরে, সমুদ্রের গর্জন যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনা যায়।
    হালিমা আয়শার ঘুম ভাঙল তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটেনি। বাঁশের বেড়া ফাঁক করে জানালা দিয়ে তাকাতেই তার বুক ধক করে উঠল—উঠান জুড়ে কাদামাখা পানি, রাতের জোয়ারে আবারও ঢুকে পড়েছে। উঠানে রাখা মাটির হাঁড়ি, গামলা, এমনকি হাঁসের খাবারের পাত্রও ভেসে বেড়াচ্ছে। দরজার সামনে বাঁশ দিয়ে বাঁধা কলাগাছের ভেলাটাই এখন হাঁটার রাস্তা।
    পাশের ঘর থেকে শাহীন মোল্লার ডাক এল—
    “আয়শা আপা, উঠছেন?”
    “হ, উঠছি ভাই। আজ তো সকালেই সবাই জমবে, দেরি করলে চলবে না।”
    আজকের দিনটা পশ্চিম লোন্দায় অন্য রকম। নদীর মাঝখানে কলাগাছের ভেলায় ভেসে তারা সংবাদ সম্মেলন করবে—টেকসই বেড়িবাঁধ চাই, এই একটাই দাবি। খবরটা দুই দিন আগে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে, আর তখন থেকেই একধরনের উত্তেজনা বইছে। তবে সেই উত্তেজনায় মিশে আছে গভীর ক্লান্তি—বছরের পর বছর লড়াই করেও তো কোনো সুরাহা হয়নি।
    হালিমা চুলে আঁচড় দিল, গায়ের পুরনো শালটা কাঁধে চাপাল। বাইরে বের হতেই দেখল আকাশ মেঘলা, কিন্তু মেঘের ফাঁক গলে সূর্যের এক টুকরো আলো পড়েছে পানির ওপর। আলোটা নদীর ধূসর জলে মিশে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তৈরি করেছে—সৌন্দর্য যা কেবল বাইরের চোখে সুন্দর, ভেতরের মানুষদের কাছে বিষাদময়।
    ________________________________________
    নদী ও মানুষের সম্পর্ক পশ্চিম লোন্দায় চিরকালীন—বন্ধুত্বও আছে, শত্রুতাও আছে। একসময় এই নদী জমিকে উর্বর করত। বর্ষার শেষে ধান, ডাল, তিল—সব ফসল উঠত সোনার মতো ঝলমল করে। শাহীন মোল্লা তখন ছিলেন চাষাবাদের ওস্তাদ, আর তার বাবা ছিলেন এলাকার সেরা কৃষক। কিন্তু গত পাঁচ বছরে নদী বদলে গেছে। পানির ওঠানামা এখন আর ঋতুর নিয়ম মানে না, বরং বছরের অর্ধেক সময় গ্রামকে ডুবিয়ে রাখে।
    “আমার দাদার আমল থেকে আমরা কৃষক,” একদিন হালিমাকে বলেছিল শাহীন, “এখন আমরা কৃষক না, আমরা জোয়ার-ভাটার ভাসমান মানুষ।”
    সকাল গড়ালে প্রস্তুতি শুরু হলো। পুরুষেরা বাঁশ কেটে, কলাগাছের গোঁড়া বেঁধে শক্ত করছে। নারীরা পাটের দড়ি দিয়ে ভেলাগুলো জোড়া লাগাচ্ছে, শিশুরা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। কারও হাতে আছে চা, কারও হাতে আছে ভেলার জন্য কেটে আনা কলাগাছের মোটা গুঁড়ি। গাছের সবুজ রঙে ভিজে আছে সবার হাত।
    তৃতীয় শ্রেণির নাইমুল হালিমার কাছে এসে হাত টেনে বলল,
    “আপা, আমি ভেলায় উঠব কেমন করে?”
    হালিমা হেসে বলল,
    “তুই উঠবি, আমি তোকে ধরে রাখব। আজ তুই-ও বলবি, স্কুলে যেতে না পারলে কেমন লাগে।”
    নাইমুল গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
    “হ, বলব। আমাদের মাঠে ক্রিকেট খেলাও বন্ধ।”
    মাঝেমধ্যে কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। পানির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা রোকেয়া বেগম বলল,
    “আপা, পানির জন্য আমাদের ঘরের ভিতরে হাঁস সাঁতার কাটে। বাইরে গেলে কাপড় ভিজে যায়, ভিতরে বসে থাকলে পেট খালি থাকে।”
    ________________________________________
    দুপুরের আগেই নদীর ধারে মানুষের ভিড় জমে গেল। দেড়শ মানুষ, কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে হাতে-তৈরি পোস্টার—“টেকসই বেড়িবাঁধ চাই—আমাদের বাঁচার অধিকার চাই”। ভেলার একপাশে বসানো হলো পুরনো মাটির হাঁড়ি, তাতে গুঁজে রাখা পোস্টার। কারও মুখে দৃঢ়তা, কারও মুখে ক্লান্তি, তবে সবার চোখে এক ধরনের জেদ।
    হালিমা ভেলার ওপর দাঁড়িয়ে বলল,
    “আপনারা জানেন, আমরা গত বছর থেকে আন্দোলন করছি। পানিতে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছি, পাউবো অফিসে গেছি, আবেদন দিয়েছি—তবুও কিছু হয়নি। আজ আমরা ভেলায় ভেসে কথা বলছি, কারণ আমাদের গ্রামও তো এমন ভেলায় ভেসে থাকে—আমরা চাই বা না চাই।”
    শাহীন মোল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
    “আমাদের প্রায় দুইশ একর জমি সারাবছর পানির নিচে। আগে এই জমিতে তিন ফসল হতো, এখন একটাও হয় না। মাছও নেই, নদীও কেবল ক্ষুধা নিয়ে আসে।”
    গ্রামের প্রবীণ নূরুল হক মিয়া তখন মাইক্রোফোনে এসে বললেন,
    “চল্লিশ বছর আগে এখানে এসে দেখি নদী ছিল দূরে। জোয়ারে পানি উঠত, কিন্তু বেড়িবাঁধ থাকায় গ্রাম বাঁচত। পাঁচ-ছয় বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদ একটা রিং বাঁধ করেছিল, এখন সেটা ভেঙে গেছে। যদি তখন মেরামত করত, আমরা আজও কৃষক থাকতে পারতাম।”
    তার কণ্ঠে হতাশা যেমন ছিল, তেমনই ছিল ক্ষোভের শীতল সুর।
    ________________________________________
    সংবাদ সম্মেলনের শেষে সবাই হাত তুলে শপথ করল—দাবি না মানা পর্যন্ত লড়াই থামবে না।
    “বেড়িবাঁধ চাই, জীবন বাঁচাই!”
    “জোয়ার-ভাটার অভিশাপ দূর করো!”
    শিশুরাও স্লোগানে গলা মেলাল। নাইমুল চিৎকার করে বলল, আর হালিমা হাসিমুখে তাকিয়ে বলল,
    “দেখিস, একদিন তুই-ই এই গ্রামের নেতা হবি।”
    গ্রামের বাইরে এই দাবির প্রতিধ্বনি তেমন জোরে পৌঁছাল না। পাউবো বলল, জায়গাটা তাদের দায়িত্বের বাইরে। এলজিইডি বলল, তাদের কাছে কোনো আবেদন আসেনি। মানুষ বুঝল—সমাধান পেতে হলে লড়াই দীর্ঘ হবে।
    ________________________________________
    বিকেল শেষে সবাই ভেলা থেকে নেমে এল। ভেজা কাপড় গায়ে লেপ্টে আছে, কাদামাটি পায়ের পাতায় ঠান্ডা হয়ে আছে। আকাশে সূর্য ডুবছে, রঙিন আলো পানিতে লালচে আভা ফেলেছে। দূরে সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে—মনে হচ্ছে এই গর্জনের ভেতরে আছে এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি, হয়তো লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি।
    হালিমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবল—আজকের ভেলার সংবাদ হয়তো কোনো কাগজে ছাপা হবে, হয়তো কেউ দেখবেও না। কিন্তু আজ গ্রামের সবাই এক ছিল, এটাই বড় কথা। ঐক্যের ঢেউ যদি টিকে থাকে, তাহলে একদিন হয়তো জোয়ারের ঢেউও থামানো যাবে।
    ________________________________________
    রাত নেমে এলে পশ্চিম লোন্দা ডুবে গেল নিরবতায়। কুকুরের ডাক ভেঙে দিচ্ছিল সেই নীরবতা, তারপর আবার ফিরে আসছিল সমুদ্রের গর্জন। শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু বড়দের চোখে ঘুম নেই। সবার মনে একই প্রশ্ন—“কবে আসবে সেই বেড়িবাঁধ?”
    হালিমা শুয়ে ছাদের বাঁশের ফাঁক দিয়ে তারাভরা আকাশ দেখল। মনে মনে বলল—কাল হয়তো পানি কমবে, হয়তো না। কিন্তু লড়াই চলবেই। এই গ্রাম, এই মানুষ, এই শিশুদের জন্য—যতদিন না পশ্চিম লোন্দা শুকনো মাটিতে দাঁড়াতে পারে, ততদিন কলাগাছের ভেলায় ভেসেই চলবে সংগ্রাম।

    5
    4 Comments
Skip to toolbar