-
চুপ থাকা নয়
শহরের ভোরের ব্যস্ততা যেন প্রতিদিন একই ছন্দে শুরু হয়। স্কুলগামী বাচ্চাদের হইচই, অফিসগামী মানুষের তাড়াহুড়া, আর ভিড়ভাট্টায় ঠাসা বাসগুলো। গৌতমী তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। বয়স মাত্র এগারো-বারো। ভোরবেলা বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রতিদিনের মতো বাসে উঠে দাঁড়ায়।
তার শরীরটা ছোট, তাই ভিড়ে ঠাসা বাসে সে প্রায়শই খুঁজে পায় না সিট। হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সেদিনও দাঁড়ানো—জানলার পাশেই। রোদ একটু একটু করে বাসের ভেতরে ঢুকছিল, আর সেই আলোয় গৌতমীর মুখে ছায়া-আলো খেলা করছিল।
হঠাৎ করেই ঘটল অপ্রত্যাশিত কিছু। পিছন থেকে এক অচেনা হাত তার কোমরের কাছে এলো, তারপর নামতে নামতে সোজা প্যান্টের ভেতরে ঢুকে গেল।
প্রথম মুহূর্তে কিছুই বুঝতে পারেনি গৌতমী। বয়স তো তখনো কচি। কিন্তু শরীর থমকে গেল, বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করতে লাগল। কিছুক্ষণ যেন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল সে। যখন পুরোপুরি বোঝার মতো হলো, তখন গা শিউরে উঠল ভয়ে আর ঘৃণায়।
সে চিৎকার করতে পারল না। মনে হচ্ছিল, গলা শুকিয়ে গেছে। চোখে পানি এসে গেল। হঠাৎ করেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আতঙ্ক জমে উঠল—এই লোকটা কি বাস থেকে নামার পরও তার পেছন পেছন আসবে?
স্টপেজ আসতেই দ্রুত নেমে পড়ল সে। চারপাশে ভিড়, মানুষের কোলাহল, অথচ তার মনে হচ্ছিল চারদিক ফাঁকা। শীতল ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল কপাল বেয়ে। বাসটা চলে গেল, আর সে দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার পাশে, হাঁপাতে হাঁপাতে।
বাড়ি ফিরল ধীর পায়ে। মনের মধ্যে তখন শুধু একটাই চিন্তা—এটা যদি মা জানতে পারে, তাহলে কী হবে? মা কি রাগ করবে? না কি বলবে, ‘তুমি হয়তো ভুল বুঝেছ’?
মায়ের সামনে দাঁড়াতেই চোখের ভাষায় সব বলে দিল গৌতমী। মা একদম থমকে গেলেন। বসতে বললেন, শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে।
গৌতমী ভয়ে ভয়ে সব খুলে বলল। কান্না আটকে রাখা গেল না।
মা শুনে চুপ করে রইলেন না। মায়ের চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
—“শোনো গৌতমী,” মা বললেন, “এভাবে চুপ করে থাকা যাবে না। তুমি মেয়ে—এটা তোমার দুর্বলতা নয়। ওই মুহূর্তে তোমাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে চড় মারতে হবে। জোরে চিৎকার করতে হবে।”
গৌতমী বিস্মিত হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল মা হয়তো বলবেন, ‘এই কথা কাউকে বলবে না, এটা লজ্জার।’ কিন্তু মা উল্টো শিখিয়ে দিচ্ছেন লড়াইয়ের মন্ত্র।
—“মনে রাখবে, শরীর তোমার, অধিকারও তোমার। কেউ ছুঁতে চাইলে অনুমতি চাইবে, জোর করে ছোঁয়ার অধিকার কারও নেই। তুমি তখনই প্রতিবাদ করবে। হাত ধরে ফেলবে, জুতো দিয়ে মারবে। প্রয়োজনে চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকবে।”
গৌতমীর বুকের ভেতর কাঁপুনি তখনও থামেনি, কিন্তু মায়ের কথা শুনে মনে হচ্ছিল সে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছে।
পরের দিন স্কুল থেকে ফেরার সময় বাসে উঠতে গিয়ে বুক কেঁপে উঠল আবার। মনে হচ্ছিল, যে-কোনও মুহূর্তে আবার কেউ ছুঁয়ে দেবে। হাত কাঁপছিল, চোখে ভয় কাজ করছিল। কিন্তু মায়ের শেখানো কথা মনে পড়তেই মনে হলো, সে একা নয়। তার ভেতরেই শক্তি আছে।
কিছুদিন কেটে গেল। একদিন ফেরার পথে আবার একইরকম ভিড়। হঠাৎ করেই অনুভব করল—পেছন থেকে কেউ অস্বাভাবিকভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। শরীরটা হঠাৎ কুঁকড়ে গেল। এবার সে ভয় পেলেও স্থির থাকল না। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—
—“এই! কী করছ তুমি?”
চারপাশের মানুষ তাকিয়ে গেল। পেছনে দাঁড়ানো লোকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল, মুখ নামিয়ে নিল।
গৌতমী এবার মায়ের পরামর্শ মতো হাত বাড়িয়ে লোকটার কব্জি ধরে ফেলল। সবাইকে দেখিয়ে বলল—“এই লোক আমাকে বারবার ছুঁচ্ছিল।”
চারপাশে গুঞ্জন উঠল, কেউ বলল—“ছিঃ! ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ!” কেউ আবার বলল—“এরা আসলে অসুস্থ।”
লোকটা ভিড়ের মধ্যে লজ্জায় পালিয়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু গৌতমী হাত ছাড়ল না। ভয়ে বুক ধুকপুক করছিল, তবু দাঁতে দাঁত চেপে থাকল। শেষমেশ কন্ডাক্টর এসে লোকটাকে নামিয়ে দিল জোর করে।
বাসে তখন তালি বাজল। গৌতমী মাথা নিচু করে বসে পড়ল। চোখে জল এসে গিয়েছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল ভেতর থেকে একটা বড় পাথর সরে গেছে।
বাড়ি ফিরে সব বলল মাকে। মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন, চোখ ভিজে উঠল। বললেন—
—“এইভাবে দাঁড়াতে হবে, মা। ভয় পেলে হবে না। মনে রেখো, চুপ থাকা মানেই অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো। আমরা মেয়েরা যতদিন চুপ থাকব, ততদিন এরা আরও সাহসী হবে।”
গৌতমী সেদিন থেকে বুঝেছিল, নারীর জীবনে হয়তো প্রতিদিনই কোনো না কোনো হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। বয়স, পোশাক, সৌন্দর্য—কিছুই এর জন্য দায়ী নয়। দায়ী হলো সেই অসুস্থ মানসিকতা। আর তার প্রতিষেধক একটাই—চুপ না থাকা, প্রতিবাদ করা।
বছর কয়েক পর সে বড় হলো, পড়াশোনা শেষ করে অভিনয়ের জগতে নামল। মানুষ তাকে চিনতে শুরু করল, ভালোবাসল। ‘স্পেশ্যাল অপস’-এর মতো কাজ তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিল।
তবুও ভেতরে ভেতরে সেই পুরোনো ক্ষত রয়ে গেল। ষষ্ঠ শ্রেণির এক বিকেল, এক অচেনা হাত, এক ভয়ের রাত—সব যেন মনে করিয়ে দেয়, তার ভেতরের শক্তি কীভাবে গড়ে উঠেছিল।
গৌতমী আজও অনেক মেয়েকে শেখায়—
—“ভয় পেও না। তোমরা মেয়ে বলে দুর্বল নও। শরীর তোমাদের অধিকার। যদি কেউ স্পর্শ করতে আসে, তাকে থামাতে হবে। হাত চেপে ধরো, জোরে চিৎকার করো, প্রয়োজনে জুতো দিয়েও মারো। কিন্তু চুপ থেকো না।”
কারণ সে জানে, প্রতিবাদ করাই একমাত্র উপায়।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe



প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।