-
এক বিকেল
দুপুরে রান্না করে খেয়ে রশীদ সাহেবের কেমন যেন লাগছে। পুরো রান্নার সময়টাতে যোগানদার হিসেবে ছিলেন পাশের বাড়ি আকবর নামে এক বৃদ্ধ। আকবরের স্ত্রী রশীদ সাহেবের সঙ্গে লেগে থাকাটা পছন্দ করেনা। কিন্তু আকবর সারাক্ষণ রশীদ সাহেবের সঙ্গে ছিলেন। রান্নাটাও মূলত আকবর করেছেন। রশীদ সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে একটু নেড়ে চেড়ে দিয়েছেন। মাছ কেটেকুটে দিলেন আকবর তারপর রশীদ সাহেব কড়াইয়ে তেল ঢেলে দিলেন। মাছের টুকরোগুলো আবার ভেজে দিলেন আকবর। মোটামুটি একটা পিকনিকের মতো ব্যাপার। কিন্তু রশীদ সাহেবের কেমন যেন লাগে ইদানিং। মন কেমন করে।
রশীদ সাহেবের স্ত্রী মারা গেছে সাড়ে চার বছর হলো। দুই মেয়ে বিয়ে করে সংসারী। বড় ছেলের বউ বাপের বাড়ির কাছে একটা স্কুলে চাকরি করে তাই সেখানে থাকে। মেঝ ছেলের নতুন বিয়ে হয়েছে। মেঝ ছেলের বউ ছেলের কাছে ঢাকা বেড়াতে গেছে। রশীদ সাহেব বিছানায় শুয়ে উশখুশ করতে লাগলেন। পাশের ঘরে তার ছোট ভাইয়ের নাতি আরাফাত কাদছে। ইদানিং রশীদ সাহেবের কেমন কেমন লাগে শুধু মন উদাস হয়ে যায়। মৃত বাবা-মায়ের কথা মনে পরে। তার ছোট ভাই মারা গেছে তিন বছর হলো। ছোট ভাই, সবার বড় দুই ভাই যারা অনেক আগে মারা গেছে তাদের কথাও মনে পরে।
রশীদ সাহেব বিছানা থেকে উঠলেন। আরাফাতকে ডাকলেন।
“চা খাবি?”
“হ”
“ল”, আরাফাত দৌড়ে দাদার পিছন নেয়।ব্রিজের ওপারে চায়ের দোকানের দিকে হাটতে থাকে দাদা ও নাতি। রশীদ সাহেব দোকানের সামনে বেঞ্চিটাতে বসে আরাফাতের হাতে বিস্কিটের প্যাকেট তুলে দেন। আরাফাত বিস্কিটের প্যাকেট খুলতে ব্যস্ত হয়ে পরে। দোকানের ছেলেটা চায়ের কাপে কনডেন্স মিল্ক আর চিনি দিয়ে প্রচন্ড বেগে চামচটা নাড়াতে থাকে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন রশীদ সাহেব। পাশের দোকানের সামনে কয়েকটা ছেলে ও দুইজন মাঝবয়সী রাজনীতির আলাপ করছে।
রশীদ সাহেব এতোদিন রাজনৈতিক আলাপে বিজ্ঞ মতামত দিতেন কিন্তু এখন ওসব তাকে টানছেনা। কিছুদিন আগেও ছোট ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে জায়গা জমি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে কিন্তু এখন তিনি অন্য মানুষ। উদাস দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আরাফাতকে জিজ্ঞেস করেন-
” কিরে আর কিছু খাবি?”
আরাফাত সলজ্জ দৃষ্টিতে মাথা নাড়ে।রশীদ সাহেব চাওয়ালাকে আরেক কাপ চা দিতে বলেন। চাওয়ালা ছেলেটি দ্রুত গতিতে চা বানায়। যদিও আর কোন কাস্টমার নেই। পাশের দোকানী রাজনৈতিক আলাপ শুরু করে আজ সবাইকে তার দোকানে টেনে নিয়েছে। রশীদ সাহেব মনোযোগ দিয়ে আরাফাতের চা খাওয়া দেখেন। আরাফাত ফু দিতে দিতে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে চায়ের কাপে। কী সুন্দর এইসব দেখতে! কখনো ভাবেননি রশীদ সাহেব। আজ আরাফাতের চা খাওয়া দেখে আরাফাত আর আশেপাশের সবার জন্য ভীষণ মায়া হয় তার। কী যেন বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলতে পারেননা। তার মন বলে সময় আর বেশি নাই! চলে যাওয়ার দিন এসে গেছে।
1 Comment
Friends
Rokter Sagor
@roktersagor
Promit Chowdhury
@promitchowdhury
Mahmudul Hasan
@mahmudulhasan1
Emran Hasan Najmul
@emranhasannajmul
Arif
@arif1
Dipankar Shuva
@dipu42dramagmail-com
Maizbhandari Sufi Academy
@maizbhandarisufiacademy
Sharmin
@sharmin1
Zahidul Islam Roni
@roni03


গল্পটি পড়ে বোঝা যায়, এটি রশীদ সাহেবের এক নিঃসঙ্গ, একঘেয়েমি কিন্তু নরম হৃদয়ের দিনের একটি ছোট্ট চিত্র। এখানে শুধু দৈনন্দিন জীবনই নয়, বরং স্মৃতির ভার, সময়ের প্রবাহ, একাকীত্ব এবং নাতি আরাফাতের সাথে স্নেহময় সম্পর্কের স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলোও ফুটে উঠেছে।