-
গ্রামের পোটলি
বাংলার অন্তহীন সবুজের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে ধানের সোনালি ঢেউ, নদীর তীরে বাঁশবন, কাশফুলের দোলায় ভরা সরল জীবনের গ্রাম। সেই গ্রামেই বাস করত রফিক। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে সারাদিন জমিতে কাজ করত সে। গরু চরানো, ক্ষেতের আগাছা তোলা, মাছ ধরা—সবকিছু মিলিয়েই তার সংসার চলত। পড়াশোনা বেশিদূর হয়নি, কিন্তু তার মন ছিল নির্মল আর সরল, যেন গ্রামের সকালবেলার শিশিরভেজা ঘাসের মতো।
রফিকের শৈশবের সঙ্গী ছিল সামিউল। একই স্কুলে পড়া, একই পুকুরে সাঁতার, গাছে উঠে কাঁঠাল ছিঁড়তে গিয়ে দুজনের হাত কেটে যাওয়া—সব স্মৃতি একসঙ্গে বাঁধা ছিল তাদের। কিন্তু ভাগ্যের স্রোতে একসময় ভিন্নপথে ভেসে গেল দুজনের জীবন। সামিউল পড়াশোনার জন্য শহরে চলে গেল। সেখানেই ধীরে ধীরে ব্যবসা ধরল, বড়লোক হলো, নামডাক হলো। আর রফিক রয়ে গেল গ্রামের মাটিতে—চাষাবাদ করে, গরু ছাগল চরিয়ে, দিন আনে দিন খায় এমন জীবনে।
বছরের পর বছর কেটে গেল। হঠাৎ একদিন খবর এল—সামিউল এখন শহরের প্রভাবশালী মানুষ, তার দোতলা বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা সব আছে। এ খবর শুনে রফিকের মনে পুরোনো বন্ধুকে দেখার তীব্র ইচ্ছে জাগল। সে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করল।
—“শোনো, আমি শহরে সামিউলের কাছে যাব ভাবছি। কিন্তু খালি হাতে গেলে কেমন দেখায়? কিছু একটা উপহার নিতে হবে।”
স্ত্রী গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল স্বামীর দিকে।
—“আমাদের দেবার মতো ধন-সম্পদ কোথায়? তবে যা আছে, তাই নিয়ে যাও। আমাদের জমির কুমড়া, শসা, ডাটাশাক, কাচামরিচ, আর গাঙ্গের টাটকা মাছ। শহরে তো এ রকম জিনিস পাওয়া যায় না।”
স্ত্রীর পরামর্শে রফিক খুশি হলো। সত্যিই তো—যা পাওয়া যায় না, তাই আসল সম্পদ। ভোরবেলা কুমড়া তুলে নিল, শসা ঝাড়ল, ডাটাশাক বেঁধে ফেলল, কাচামরিচ ঝুড়িতে রাখল, আর গাঙ্গে ধরা টাটকা মাছ কাদামাখা ঝোলায় ভরে বাঁধল। সব মিলিয়ে একটা পোটলি তৈরি হলো—ছোট্ট হলেও আন্তরিকতার ভার ছিল তাতে।
কাঁচা রাস্তা ধরে রফিক হাঁটা শুরু করল শহরের দিকে। ভ্যাপসা গরম, ধুলোবালি, পথে কাঁটা, কাদা—সবকিছু পেরিয়ে রোদে ঘেমে ক্লান্ত দেহ নিয়ে সে এগোতে লাগল। পোটলিটা মাথায়, কাঁধে লাঠি, হাতে বাঁশের ঝুড়ি—ঠিক যেন এক গ্রামীণ যাত্রীর প্রতিচ্ছবি।
একদিন একরাত কেটে, অবশেষে শহরের আলো ঝলমলে রাস্তায় পা রাখল রফিক। উঁচু দালান, গর্জন করা গাড়ি, বিদ্যুতের আলো—সব দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মনে হলো, যেন অন্য এক দুনিয়ায় চলে এসেছে।
অবশেষে সামিউলের দোতলা বাড়ির সামনে পৌঁছল। গেট খুলতেই সামিউল দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখে আনন্দাশ্রু।
—“রে রফিক! কত বছর পর তোকে দেখছি! এতোদিন কোথায় ছিলি?”
রফিক লাজুক হেসে পোটলি নামিয়ে রাখল।
—“তোকে দেওয়ার মতো বড় কিছু পাইনি। ভেবেছি, আমাদের গ্রামের জমির কুমড়া, শসা, ডাটাশাক, কাচামরিচ আর গাঙ্গের মাছই তোকে দেব। ভাবলাম, শহরে এগুলো কে দেবে তোকে?”
সামিউল পোটলিটার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার শহুরে চাকচিক্য যেন ম্লান হয়ে গেল। চোখে ভেসে উঠল শৈশবের সেই সবুজ মাঠ, পুকুরপাড়ের খেলা, দুজনের দুষ্টুমি। সামিউল পোটলিকে বুকের কাছে টেনে নিল, যেন অমূল্য রত্ন।
সেদিন রাতে সামিউল সেই শাকসবজি আর মাছ দিয়ে গ্রামের মতো করে রান্না করাল। শহরের চাকচিক্যময় খাবারের ভিড়ে সেই গ্রামের স্বাদ তাকে অন্যরকম সুখ দিল।
পরের দিন রফিক যখন ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, সামিউল তার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিতে চাইল। কিন্তু রফিক বিনীত কণ্ঠে বলল—
—“বন্ধু, আমি তোকে ভালোবাসা দিতে এসেছি, ভিক্ষে চাইতে নয়। এ পোটলির ভেতরেই আমার আন্তরিকতা আছে। তুই যদি সেটা গ্রহণ করিস, সেটাই আমার প্রাপ্তি।”
শহরের ভিড়ে দাঁড়িয়ে রফিক যখন গ্রামে ফেরার পথে রওনা দিল, তখন সামিউল অনেকক্ষণ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছিল।
ফিরতি পথে রফিক ভাবছিল—বন্ধুত্বের আসল মানে ধন-সম্পদ নয়, বরং আন্তরিকতা। গ্রামের সেই ছোট্ট পোটলি, সামিউলের কাছে লাখ টাকার দামের থেকেও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠল।
সেদিন থেকে গ্রাম আর শহরের মাঝের দূরত্ব যেন কিছুটা কমে গেল। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের সেতু গড়ে ওঠে পোটলির মতো ছোট্ট ভালোবাসার মধ্য দিয়েই।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


সম্পদের চেয়ে আন্তরিকতার মূল্য অনেক বেশি—এটা খুব সহজভাবে ও আবেগ দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।