-
মড়ার খাটিয়া ও চোরের মিলনমেলা
শেষ রাতের অন্ধকারে গ্রামের গৃহস্থবাড়ি থেকে চুরি করতে গিয়ে চোরেদের দল যেন মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ লড়ে ফেলল। কারও হাত ভেঙে গেল, কারও হাঁটুতে চোট, কেউ আবার দৌড়াতে গিয়ে গরুর গোয়ালে পড়ে গেল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে গনিমতের মাল নিয়ে তারা এক জায়গায় এসে জড়ো হলো। তামার কলসি, পিতলের থালা, পেতলের বদনা, লোহার হাঁড়ি—সব কিছু দেখে সবার বুক আনন্দে ভরে উঠল।
কিন্তু আনন্দের সেই চিত্র সকাল ফুটতেই দুঃখে রূপ নিল। কারও মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি এলো—”আরে ভাই, এতো বড় মালামাল এখন দিনের আলোয় আমরা নিয়ে যাব কোথায়? গ্রামের লোকজন আমাদের দেখলেই ধরে ফেলবে।” সবাই চুপ মেরে গেল। এক চোর তো কপালে হাত ঠুকতে ঠুকতে কেঁদেই ফেলল, “হায়রে রে, বাসন চুরি করে মরলাম।”
ঠিক তখনই সর্দার তার বুদ্ধি ঝাড়ল। পাশেই ছিল সহিসের আস্তাবল। সেখানে খাটিয়া পড়ে ছিল। সর্দার বলল, “এই খাটিয়া চুরি করি, মালপত্রগুলো রাখি, আর মড়া বানিয়ে নিয়ে যাই। কেউ সন্দেহ করবে না। সবাই ভাববে দাহ করতে যাচ্ছি।”
মিনিটের মধ্যে প্ল্যান কার্যকর হলো। খাটিয়ায় সব বাসন সাজানো হলো, তার ওপরে সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। তারপর “হরি হরি, বল হরি হরিবোল” বলে তারা শোভাযাত্রা শুরু করল। চোরেরা গলা ফাটিয়ে এমন অভিনয় করছিল যে গ্রামবাসী মনে করল, নিশ্চয়ই গৃহস্থ পাড়া থেকে কেউ মারা গেছে। মহিলারা শোকভরে চোখ মুছছিল, ছেলেরা দূরে দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে ছিল।
কেউ একবারও সন্দেহ করল না। চোরেরা ভাবল—”যাহ্, প্ল্যান সাকসেস!”
কিন্তু তখনই এলো মোড় ঘোরানো দৃশ্য। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়েছিল পাকা চোর। সে জীবনে এত চুরি করেছে যে, চুরি না করলে পেট খালি থাকত। চোখ এত তীক্ষ্ণ যে মাকড়সার জাল থেকেও সে সোনার দুল চিনে ফেলতে পারত। খাটিয়ার ওপরে সাদা কাপড় দেখে সে প্রথমে কিছুই বলল না। কিন্তু হঠাৎ কাপড়ের নিচে থেকে বদনার নলটা উঁকি দিতেই তার হাসি চেপে রাখা দায় হলো। সে বুঝে গেল—”আরে, মড়া নয় তো, মাল ভর্তি খাটিয়া!”
সে এগিয়ে গিয়ে কানে কানে সর্দারকে বলল, “দাদা, মড়ার ভেতরে কিন্তু হাঁড়ি-পাতিলের প্রাণবায়ু আছে। আমি চাইলে এখুনি চিৎকার দিয়ে সবাইকে ডেকে ফেলতে পারি।”
চোর সর্দার প্রথমে আঁতকে উঠল। তারপর ভেবে বলল, “শালা মড়ার খাটিয়া বহন করতে এসে আমাদের ধরা খাওয়াবি নাকি? যা, দলে যোগ দে। মাল সমান ভাগে পাবি।”
পাকা চোরের মুখে তখন কান থেকে কান হাসি। সে খাটিয়ার পাশে গিয়ে কাঁধে হাত লাগাল। কিন্তু বাহানা করে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে বাকি চোরেদের ঘাবড়ে দিল। সে গলা ভারী করে জনসমক্ষে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোমাদের মেসো কখন মরল?”
সব চোর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কেউ উত্তর দিল না। গ্রামের লোকজনও কান পেতে শুনল। একজন মহিলা বলল, “আহারে! এত সকালে তো শুনিনি!” আরেকজন পুরুষ গম্ভীর মুখে বলল, “হয়তো রাতেই মারা গেছে।”
পাকা চোর আবার বলল, “বাহ্, ভালো হলো। এমনকি মারা গিয়েও হাঁড়ি-পাতিল আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।” তার কথা শুনে চোরেদের মুখ কালো হয়ে গেল, তবে গ্রামের লোকজন এতই সরল যে তারা ভাবল শোকগ্রস্ত ভাতিজার হাবভাব।
খাটিয়া চলতে লাগল, তবে এবার দৃশ্য অন্যরকম। সামনে-পেছনে মানুষজন ভিড় করছে, কেউ হরিনাম করছে, কেউ আবার ফিসফিস করে বলছে, “বৃদ্ধ মেসো নাকি ভীষণ খাইয়ে ছিলেন, তাই তো মরেও বাসন ছাড়েননি।”
চোরেরা একদিকে ঘামছে, অন্যদিকে মনে মনে হাসছে। এ যেন শবযাত্রা নয়, বরং চুরির উৎসবের মহাযাত্রা। পাকা চোর আবার নতুন কাণ্ড করল। সে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে হঠাৎ নাচ শুরু করে দিল—”হরি হরি, হরিবোল!” লোকজন দেখল, শোকের মধ্যেও ভাতিজা ভক্তিভরে নাচছে। কেউ কেউ ভাবল, আহা, দুঃখ ভুলে ভজন করছে।
শেষ পর্যন্ত চোরেদের দল নিরাপদে নদীর ধারে পৌঁছাল। সবার বুক ধড়ফড় করছে, যদি কেউ কাপড় সরিয়ে দেখে ফেলে! কিন্তু ভাগ্য ভালো, কেউ এতদূর কৌতূহল দেখাল না। তারা ঘাটে পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে খাটিয়ার মাল নামিয়ে রাখল। লোকজন মনে করল, চিতা সাজানোর প্রস্তুতি চলছে।
তারপর সর্দার ফিসফিস করে বলল, “এইবার ভাগাভাগির পালা।” পাকা চোর চোখ টিপে বলল, “দাদা, এ মড়া বহনের কাজটা জীবনে প্রথম পেলাম। কাঁধও ব্যথা হলো, তবে ভাগটা মোটা হলে ব্যথা কমে যাবে।”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল। নদীর ধারে হাসির রোল পড়ে গেল। যেখান থেকে শবযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে শোকের সুর ছিল, আর যেখানে শেষ হলো সেখানে আনন্দের মেলা।
লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে বলল, “বাহ্, কীরকম ভাগ্যবান পরিবার! মরা মানুষও খুশি করে দিল চারপাশকে।”
অন্যদিকে চোরেরা মাল ভাগ করে নিল সমানভাবে। কেউ ঠাট্টা করে বলল, “আসলে আজ আমাদের আসল মড়া হলো লোভ, আর তাকে বহন করে নিয়ে আসতেই সবাই এক হলো।”
পাকা চোর উত্তর দিল, “ঠিকই বলেছ। এক মড়া বহনের অভিনয় করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে মিলন হলো।”2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


আপনার লেখাটি একটি অসাধারণ রম্য গল্প, যা চুরির মতো একটি নেতিবাচক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের ভণ্ডামি, বুদ্ধিমত্তা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। এটি কেবল একটি চুরির গল্প নয়, বরং এক সামাজিক ব্যঙ্গচিত্র।