-
গরু হারানো প্রেমকথা
ঢাকা শহরের ভিড়ভাট্টার মাঝেও কিছু নিরিবিলি পার্ক আছে, যেখানে সন্ধ্যার পর প্রেমিক-প্রেমিকাদের আনাগোনা জমে ওঠে। লেকের ধারে গাছতলায় বসে দুইজন হাত ধরাধরি করে পৃথিবীকে ভুলে যায়। সেই রকমই এক পার্কে বসে আছে রাহুল আর তৃষা।
রাহুল অনেক দিন ধরেই সুযোগ খুঁজছিল তৃষাকে একটু ইমপ্রেস করার। অনেকবার ফুল দিয়েও চেষ্টা করেছে, কবিতা লিখেও পাঠিয়েছে, এমনকি একবার ইংরেজিতে “আই লাভ ইউ” বলার পর “তুমি তো বাংলা ভালোবাসো, ইংরেজি কেন?” শুনে একেবারে চুপসে গিয়েছিল। আজ মনে মনে ঠিক করেছে—যা হোক, এবার কথার জাদু দিয়েই তৃষার মন জয় করবে।
হাওয়া টানছিল নরম, পাখিরা ডাকছিল বাসার পথে ফেরার ডাক। রাহুল চোখে স্বপ্নের মায়া মেখে বলল,
— তৃষা, জানো? তোমার চোখ দুটো অদ্ভুত সুন্দর।
তৃষা একটু অবাক হয়ে তাকাল।
— সত্যি? নাকি আগের মতো আবার গল্প ঘুরাচ্ছো?
রাহুল বুক ফুলিয়ে উত্তর দিল,
— একেবারে সত্যি। আমি তোমার চোখে পুরো পৃথিবী দেখতে পাচ্ছি। সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের রূপ, এমনকি নক্ষত্রের আলোও লুকিয়ে আছে তোমার ওই চোখে।
তৃষা লজ্জা পেয়ে ঠোঁট কামড়ে ফেলল। ভেবেই পাচ্ছিল না, হঠাৎ রাহুল কেমন যেন কবি হয়ে গেল। এর মাঝেই পিছন থেকে হঠাৎ এক বৃদ্ধ গলা চড়িয়ে বললেন,
— বাবা, যেহেতু তুমি চোখে সারাবিশ্ব দেখতে পাও, আমার একটা উপকার করো না? আমার গরুটাকে কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। তোমার ওই চোখে একটু তাকিয়ে দ্যাখো তো, গরুটাকে পাওয়া যায় কি না।
এই অপ্রত্যাশিত কথায় তৃষার হাসি ফস করে বেরিয়ে এল। আর রাহুলের মুখ মুহূর্তেই টক হয়ে গেল। রাহুল তো পৃথিবী দেখার কথা বলেছিল, গরু খোঁজার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
বৃদ্ধ কিন্তু একেবারেই সিরিয়াস। তিনি একটা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, গায়ে পুরনো ধুতি, মাথায় সাদা টুপি। বারবার বলছেন,
— বাবা, তোমার মতো ছেলেরা এখনো আছে দেখে মনটা ভরে যায়। চলো, আমার সঙ্গে একটু খোঁজ করে দাও না। তুমি তো চোখে নক্ষত্র দেখতে পাও, গরু তো খুব ছোট ব্যাপার!
তৃষা তখন হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রাহুল চুপ করে রইল, কিন্তু মুখ লাল হয়ে গেছে। প্রেমিকার সামনে যে ইমপ্রেস করার স্বপ্ন দেখেছিল, তা একেবারে ভেস্তে গেল।
তৃষা হাসতে হাসতেই বলল,
— রাহুল, যাও না একটু গরুটা খুঁজে দাও। প্রমাণ হয়ে যাবে সত্যিই তুমি দারুণ রোমান্টিক আর অলৌকিক ক্ষমতার মালিক।
বৃদ্ধ আবার জোর দিলেন,
— গরুটা কাল বিকেলে হাটের দিকে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, দড়িটাই নেই। তখন থেকে সারারাত খুঁজছি, পাচ্ছি না। আমার স্ত্রী কাঁদছে, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি যদি সাহায্য করো…
রাহুল মনে মনে ভাবল, “বাবা, আমি প্রেমের বাজারে খাতির জমানোর চেষ্টা করছি, গরুর বাজারে নয়।” কিন্তু তৃষার চোখে মজা, বৃদ্ধের চোখে আশা—দুটো মিলে তাকে জোর করল।
তারা তিনজন মিলে পার্কের ভেতরেই হাঁটতে লাগল। রাহুল একদিকে তৃষার হাত শক্ত করে ধরে আছে, অন্যদিকে দেখাচ্ছে—
— ওই গাছটার পেছনে হয়তো লুকিয়েছে, ওই ঝোপের ভেতরও দেখা যাক।
তৃষা হাঁসফাঁস করে বলল,
— রাহুল, গরু কি লুকোচুরি খেলে নাকি?
বৃদ্ধ গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন,
— মেয়ে, গরু হলো মানুষের মতো, যখন খেয়াল আসে তখন সব কিছু করতে পারে।
এই কথায় তৃষার হাসি আরও বেড়ে গেল।
হঠাৎই তারা ঝোপের ভেতর একটা শব্দ শুনল। সবাই চমকে তাকাল। রাহুল মনে মনে প্রস্তুত হলো—যদি গরু বেরোয়, তবে সেদিনের নায়ক সে-ই হবে। কিন্তু ভেতর থেকে বের হলো একটা ছাগল।
তৃষা হেসে বলল,
— দেখেছো, বিশ্বচোখে গরুর বদলে ছাগল দেখা যাচ্ছে।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
— এ তো আমাদের ছাগল রুপাই। কিন্তু গরু নেই!
রাহুল ঘেমে নাকাল। সে হাল ছাড়ল না, তৃষার হাত ধরে বলল,
— গরু যদি না মেলে, আমরা অন্তত এই শহরের আলোর ভেতর একে অপরকে পেলাম, সেটাই তো বড় পাওয়া।
তৃষা মিষ্টি হেসে তাকাল, কিন্তু তার আগে বৃদ্ধের গলা আবার শোনা গেল,
— বাবা, তোমার ওই দর্শন দিয়ে আমাদের সংসার চালবে না। গরুই লাগবে।
অবশেষে ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর হাল ছেড়ে সবাই বেঞ্চিতে বসল। রাহুল হাঁপাতে হাঁপাতে পানীয় কিনে আনল। তৃষা মজা করে বলল,
— তোমার চোখে গরু দেখা না গেলেও, আমি অন্তত হাসির খোরাক পেয়েছি।
বৃদ্ধ মুখ চুন করে বললেন,
— বাবা, তুমি যদি সংসার শুরু করো, মনে রেখো, শুধু চোখে দুনিয়া দেখলেই হবে না, ভাতের জন্য গরুও লাগবে।
তৃষা এবার সত্যি হেসে ফেলল। রাহুল একটু বিরক্ত হলেও শেষে মুচকি হাসল। কারণ আজকের দিনটা নিছক প্রেমের নয়, বরং এক হাস্যকর অভিজ্ঞতার দিন হয়ে গেল।
তারা পার্ক থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে তৃষা বলল,
— জানো রাহুল, তোমার ওই “চোখে দুনিয়া দেখা” ডায়লগটা আসলেই দারুণ ছিল। যদিও গরু খুঁজে পেলে আরও দারুণ হতো!
রাহুল মাথা চুলকালো।
— আচ্ছা, কাল থেকে গরু-ছাগল বাদ দিয়ে শুধু তোমাকেই দেখব।
তৃষা হেসে গালে আঙুল বোলাল।
— দেখো, গরু পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি তো আছি।
রাহুল তখনই বুঝল—ভালোবাসা মানে গরু নয়, ভালোবাসা মানে হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি। বৃদ্ধ হয়তো গরু পায়নি, কিন্তু রাহুল আর তৃষা পেয়েছিল এক স্মরণীয় হাসির গল্প, যা সারাজীবন তাদের কাছে পার্কের সেই সন্ধ্যাকে মনে করিয়ে দেবে।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


আপনার এই লেখাটি কেবল একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং জীবন এবং ভালোবাসার এক মিশ্র উপাখ্যান, যেখানে রোমান্টিক ডায়লগগুলো বাস্তবতার আঘাতে কীভাবে হাস্যরসে রূপান্তরিত হয়, তার চমৎকার চিত্রায়ণ করা হয়েছে। গল্পটি সতেজ, মজার এবং পাঠককে আনন্দ দিতে সক্ষম।