-
নীরব শ্রেণিকক্ষের বাতাস
সকাল হতেই রাশিদ আলী তার প্রিয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে পা বাড়ালেন। ধুলোমাখা সড়ক, হাওয়ার সঙ্গে মিশে থাকা খড়ের গন্ধ, এবং দূরে ভেসে আসা শিশুরা স্কুলের ছাদে দৌড়ঝাঁপ করছে—এ সবকিছু যেন রাশিদের কাছে একটা অপরিসীম শান্তির প্রতীক। তিনি জানতেন, এই ছোট্ট বিদ্যালয়ের পেছনের কুটির থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত বাজার পর্যন্ত, শিক্ষার আলো পৌঁছানো একটি অবিরাম সংগ্রাম।
রাশিদ সহকারী শিক্ষক ছিলেন, সেই গ্রেডে যেখানে বেতন কম, পদোন্নতি দীর্ঘদিন বন্ধ, আর শ্রমিকের মতো গিয়ে যেন দিন গুণে চলে। অথচ তিনি জানতেন, ছোট্ট শিশুদের চোখে যে আগ্রহ, যে জ্ঞানলালসা—তাতে এই সকল বঞ্চনা কিছুতেই বড় মনে হয় না।
“শ্রেণিকক্ষে বসো, আজ আমরা নতুন সংখ্যা শিখব,” তিনি শিশুসুলভ মুখে বললেন। শিশুরা আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু রাশিদের মনে বাজছে অন্য এক দমবন্ধানো সুর।
বেতন ১৩তম গ্রেডে, পদোন্নতি অজানা, এবং জীবনটা যেন একধরনের অনিশ্চিত ধাঁধা। কিন্তু শিক্ষার প্রতি প্রেম, শিশুরা যে তাঁর কাছে ভরসা করে—এটাই তাঁর একমাত্র শক্তি।
শিশুরা এক এক করে নতুন সংখ্যা, নতুন অক্ষর শিখতে লাগল। রাশিদ তাঁদের হাতে হাতে খাতা ধরালেন, দেখলেন কতো পরিশ্রম, কতো সততা। তিনি ভাবলেন, “এই ছোট্ট হাতগুলোই আমাদের দেশের ভবিষ্যত। আর এই ভবিষ্যত গড়তে গেলে আমাকে ধৈর্য ধরে, যত্নের সঙ্গে এগোতে হবে।”
এক সময়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসে জানালেন, ‘বেতনবৃদ্ধি আর পদোন্নতির জন্য আন্দোলন চলছে। আশা করি এবার সরকারি কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ নেবে।’ রাশিদ জানতেন, সরকারি আশ্বাস প্রায়ই বাতাসের মতো উড়ে যায়। কখনও বাস্তবায়িত হয় না। তিনি শুধু নীরবভাবে মাথা নাড়লেন। আন্দোলন, আদালত, প্রতিশ্রুতি—সবই যেন কাগজের টুকরো। তবে তিনি জানতেন, এই কাগজের টুকরোও কখনও কখনও শিক্ষকের সাহস বাড়ায়।
বিদ্যালয়ের কক্ষে হঠাৎ দমবন্ধানো গরম, বইয়ের গন্ধ আর শিশুর চিৎকার—সব মিলিয়ে যেন একটি জীবন্ত সংগীত। রাশিদ ভেবেছিলেন, জীবনের সব কষ্ট, সব বঞ্চনা, সব অনিয়ম—সবকিছু একপাশে রেখেই তিনি এখানেই খুঁজে পাবেন আনন্দ।
তার দিনের মধ্যে একটি ছোট্ট মুহূর্ত ছিল, যা তার প্রাণে দীপ্তি জ্বালায়। একটি শিশু অজানাই ভুলে একটি অঙ্কের উত্তর লিখল ভুল, কিন্তু রাশিদ ধৈর্য ধরে তাকে সঠিক উত্তর দেখালেন। শিশুটি হাসল, “স্যার, এবার বুঝেছি!” সেই হাসি যেন রাশিদের মনে বেজে উঠল এক অপার্থিব সুর।
স্কুলের শেষ ঘণ্টায়, রাশিদ জানতেন, তিনি নিঃশব্দ এক যোদ্ধা। নীরব শ্রেণিকক্ষে, যেখানে শব্দ কম, কিন্তু ভালোবাসা অগাধ। বেতন কম, পদোন্নতি দেরিতে, সামাজিক মর্যাদা কম—সবকিছুতে বঞ্চিত থাকলেও তিনি জানতেন, তিনি দেশের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।
রাশিদের জীবন শুধু স্বপ্ন বা বাস্তবতার লড়াই নয়, এটি ছিল এক ধরনের নিঃশব্দ ধর্ম। তিনি জানতেন, দেশের জন্য ভালো শিক্ষক হওয়া মানে কেবল বই পড়ানো নয়, শিশুদের মননে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সাহসের বীজ বোনা। এই বীজই একদিন বড় গাছ হয়ে উঠবে, যা দেশের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথ দেখাবে।
সন্ধ্যা বেজে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাঠে শিশুরা খেলা বন্ধ করল। রাশিদ তাঁদের বিদায় জানালেন, “কাল আবার দেখা হবে, নতুন অঙ্ক, নতুন গল্প।” শিশুরা হাসল, এবং বিদায় জানিয়ে হেঁটে গেল। রাশিদ জানতেন, আজকের ক্লাসে শিশুরা হয়তো কিছু ভুলও করেছে, কিন্তু শিক্ষকের সাহস ও ধৈর্য তাদের চিরকাল স্মরণে থাকবে।
স্কুল ছেড়ে বাড়ির দিকে ফেরার পথে রাশিদ ভাবলেন, দেশের শিক্ষকরা অনেক কষ্টে আছেন। ন্যায্য বেতন নেই, পদোন্নতি নেই, মর্যাদা নেই। অথচ এই সকল বাধা সত্ত্বেও শিক্ষকের সাহস, ধৈর্য, এবং আত্মত্যাগ দেশের জন্য নিঃস্বার্থ দান। তিনি মনে মনে অঙ্গীকার করলেন, যতই কঠিন হোক, যতই সমাজ অবহেলা করুক, তিনি এই শিক্ষার দীপ্তি নিঃশ্বাসের মতো ছড়াবেন।
রাশিদের চোখে নদীর মতো নিরব তৃষ্ণা, কিন্তু হৃদয়ে আলো—শিক্ষার আলোকবর্তিকা। পথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, ‘আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। কিন্তু আমাদের জীবন প্রতিটি দিনই শিক্ষকতার দিবস। প্রতিটি শিশুর হাসি, প্রতিটি বোঝানো পাঠ, প্রতিটি সহানুভূতিশীল পরামর্শ—এগুলোই আমাদের উৎসব।’
বাড়িতে পৌঁছে রাশিদ জানালেন স্ত্রীকে, “আজ আবার একশিশুর মুখে হাসি দেখলাম। এটাই যথেষ্ট।” স্ত্রী কিছুই বললেন না, শুধু চোখে ভালোবাসা ভরা একটি দৃষ্টি।
রাশিদ জানতেন, দেশের শিক্ষকেরা আজও যুদ্ধ করছেন। নীরবভাবে, অদৃশ্যভাবে, কিন্তু অদম্য সাহসে। এই শিক্ষকরা শুধুই জ্ঞান নয়, ভালোবাসা, ধৈর্য, এবং মানবতার বীজ বুনছেন। বেতন কম, মর্যাদা কম, পদোন্নতি নেই—সব কিছুই তাদের পথরোধ করতে পারবে না।
রাশিদ আলী জানতেন, এই নীরব শ্রেণিকক্ষের বাতাসে শিক্ষা দীপ্তি জ্বলে। তিনি জানতেন, একদিন দেশের সমস্ত শিক্ষকরা প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পাবেন। সেই দিন না আসা পর্যন্ত, তিনি নিঃশব্দভাবে, নিঃস্বার্থভাবে চলতে থাকবেন—শিক্ষার অগ্নিপথে, দেশের ভবিষ্যত গড়তে।3 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


দেশের ভবিষ্যত যারা গড়ছেন, আমরা কি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিচ্ছি?