-
আগুনের ভেতরেও আলো থাকে
রাত তখন প্রায় দশটা। শহরের রাস্তাগুলো ফাঁকা হতে শুরু করেছে। অফিসের কাজ শেষে তানিয়া বাস ধরার জন্য ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলো। একটা নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নিজের ফোনটা শক্ত করে ধরে রাখল। মায়ের ফোন আসার অপেক্ষায় ছিল সে। প্রতিদিনের মতো আজও মা জিজ্ঞেস করবেন—
“তুই ঠিকঠাক বের হয়েছিস তো মা?”
তানিয়া ছোট্ট করে উত্তর দেবে, “হ্যাঁ মা, চিন্তা করো না।”
কিন্তু আজ ফোনটা নীরব। হয়তো মা সেলাই মেশিনের শব্দে শুনতে পাচ্ছেন না। ঘরে বাবা শয্যাশায়ী, দুটো ছোট ভাই-বোন পড়ার টেবিলে বসে হয়তো আলোর নিচে স্বপ্ন আঁকছে—ভাই ডাক্তার হবে, বোন শিক্ষক। সেই স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আজ এই মেয়েটার কাঁধে।
তানিয়া জানে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে আছে এক অদৃশ্য সংগ্রাম। সমাজ যাকে “বেপরোয়া” বলে, সেই মেয়েটিই সংসারের একমাত্র ভরসা। তার বাবার চোখে অসহায় কৃতজ্ঞতা, মায়ের মুখে নিঃশব্দ আশীর্বাদ, আর ভাইবোনের ভবিষ্যৎ যেন তানিয়ার চলার ইন্ধন।
কিন্তু সমাজ? সমাজের চোখে সে এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। রাতে একা ফেরে, পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে, নিজের সিদ্ধান্তে চলে—তাই সে সন্দেহভাজন।
সেদিনের ঘটনাটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। অফিসের সিনিয়র এক সহকর্মী, যাকে তানিয়া সবসময় শ্রদ্ধা করতো, একদিন হঠাৎ বললো—
“তুমি যদি একটু ফ্রেন্ডলি হতে পারো, তোমার প্রমোশনটা সহজ হবে।”
তানিয়া তখন চুপ করে ছিল। কিন্তু ভেতরে আগুন জ্বলছিল। সে জানতো, প্রতিবাদ মানেই ঝুঁকি—চাকরি হারানোর ঝুঁকি, সম্মান হারানোর ঝুঁকি। কিন্তু সে ভাবলো, “যদি আমি চুপ থাকি, তবে আমার মতো মেয়েরা চুপ করেই মরবে।”
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিলো—ভয় নয়, প্রতিরোধই তার অস্ত্র।
পরদিন থেকেই সে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলো। পাশের থানার মহিলা কনস্টেবলরা সপ্তাহে দুদিন মেয়েদের জন্য একটি ফ্রি সেলফ-ডিফেন্স ক্লাস নেয়—সেখানে যোগ দিলো তানিয়া। প্রথম দিন মুষ্টি বন্ধ করতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই সে শিখে গেলো কীভাবে আক্রমণকারীকে নিরস্ত করতে হয়, কীভাবে ভয়কে জয় করতে হয়।
একদিন ক্লাসে ট্রেনার বললেন,
“নারীর সুরক্ষা শুরু হয় তার মানসিক শক্তি থেকে। তুমি যত আত্মবিশ্বাসী হবে, অপরাধী তত পিছিয়ে যাবে।”
তানিয়া যেন নিজের ভেতরে নতুন আলো খুঁজে পেল।
এক মাস পর এক ভয়াবহ রাত। অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়তেই তিনজন লোক তার পিছু নিলো। তাদের চোখে সেই শিকারি দৃষ্টি—যা মেয়েরা হাজার বছর ধরে চিনে এসেছে। চারপাশ নির্জন, বাতাস থমথমে।
তানিয়া থামলো না। সে ব্যাগ থেকে দ্রুত পেপার স্প্রে বের করলো। একটা লোক সামনে এসে দাঁড়াতেই তার চোখে ছুড়ে দিলো স্প্রেটা। অন্যজন কাছে আসতেই তানিয়া তার কণ্ঠে জোর এনে চিৎকার করলো—“বাঁচাও!”
রাস্তায় আলো জ্বলে উঠলো, পাশের দোকান থেকে কয়েকজন দৌড়ে এলেন। তিনজনই পালিয়ে গেল।
তানিয়ার বুক ধকধক করছিল, কিন্তু সে জানতো—সে জিতেছে।
প্রথমবার নিজের ভেতরের শক্তিটাকে সে চিনলো।
পরদিন সে থানায় গেলো। অফিসারের টেবিলে বসে বললো,
“আমি অভিযোগ করতে এসেছি। আপনি যদি দায়িত্ব না নেন, আমি মিডিয়ার কাছে যাব।”
অফিসার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এই শহরে এমন সাহসী মেয়ের দেখা তিনি কমই পান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ ঐ তিনজনকে ধরে ফেলে। তানিয়া মিডিয়ার কাছে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি, শুধু বলেছিলো—
“আমি চাই, মেয়েরা ভয় পেয়ে চুপ না থাকুক।”
সেদিনের পর থেকে তার জীবনে অনেক কিছু বদলে গেল। অফিসের সহকর্মীরা তাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করলো। কেউ কেউ বললো, “তুমি সত্যিকারের হিরো।”
কিন্তু তানিয়া জানে, সে কোনো নায়ক নয়—সে কেবল একজন সাধারণ মেয়ে, যাকে সমাজ একসময় “অসাধারণ” হতে বাধ্য করেছে।
মাস কয়েক পর তানিয়া নিজের এলাকায় একটি বিনামূল্যের “নারীর আত্মরক্ষা কর্মশালা” চালু করে। সেখানে গ্রামের মেয়েরা আসে—গৃহবধূ, কলেজছাত্রী, গার্মেন্টস কর্মী। তানিয়া তাদের শেখায়, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়, কীভাবে মোবাইলের সেফটি অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে ভয় নয়, সাহস নিয়ে বাঁচতে হয়।
একদিন এক মেয়ে ক্লাস শেষে বললো,
“আপা, আগে রাতে বাসা ফেরার সময় মনে হতো সব ছায়া যেন আমাকে গিলে খাবে। এখন আমি ভয় পাই না।”
তানিয়া হাসলো। সেই হাসির ভেতর ছিল শান্তি আর আত্মমর্যাদার দীপ্তি।
সন্ধ্যার সময় ঘরে ফিরে সে মায়ের কোলে মাথা রাখলো। মা মৃদু কণ্ঠে বললেন,
“তুই এখন শুধু আমার মেয়ে না মা, তুই অন্য মেয়েদের আশ্রয়।”
তানিয়া চোখ বন্ধ করলো। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে, বাতাসে শীতলতা। কিন্তু তার বুকের ভেতর জ্বলছে এক আগুন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভয়কে জয়ের আগুন।
সে জানে, পৃথিবী বদলাতে একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যদি প্রতিটি নারী নিজের ভেতরে এই আলো জ্বালাতে পারে, তাহলে সমাজের অন্ধকারও একদিন সরে যাবে।
শেষরাতে সে জানালার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বললো,
“আমি এখন আর ভয় পাই না। আমি জানি, আগুনের ভেতরেও আলো থাকে।”
________________________________________
এই গল্পের বার্তা:
নারীর শক্তি তার সাহস, সচেতনতা এবং আত্মরক্ষার ক্ষমতাতেই নিহিত। সমাজ যতই কঠিন হোক, যদি নারীরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসে জ্বালিয়ে রাখে আগুনের আলো, তাহলে কোনো অন্ধকারই তাদের গ্রাস করতে পারবে না।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


সমাজের পুরুষতান্ত্রিক চাপ এবং নারীর ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াইকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।