-
ভূত-মুক্তি প্রজেক্ট
(– মোহাম্মদ শাহজামান শুভ)
রবিবার। গৌরীপুরের হাটের দিন। সকাল থেকেই বাজারে লোকে-লোকারণ্য। কাঁচা সবজি, মাছ, মুরগি, চাল-ডাল, ছাগল—সবকিছুরই রমরমা ব্যবসা। কিন্তু এই ভরা বাজারেই এক বিশেষ চরিত্রের আগমন ঘটে—আমার স্কুলবেলার বন্ধু আজিজ।
আজিজকে দেখামাত্রই বুঝলাম, আজ তার মুখে কোনো রহস্যের ছায়া আছে। চেনা মানুষটাকে মনে হলো একটু ভিন্নরকম—চোখের ভেতর অজানা ভয়, ঠোঁটে দ্বিধা, আর কপালে যেন কোনো অদৃশ্য দায়ভার। আমি তখন বাজার ঘুরে কিছু কলা আর নাশপাতি কিনছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে আজিজের ডাক,
“ওই শাহজামান! কী খবর রে ভাই?”
ঘুরে দেখি, হাতে বাঁশের দড়ি, আর দড়ির অপর প্রান্তে শূন্যতা। অর্থাৎ দড়িটা কিছু বেঁধে রাখার জন্য, কিন্তু সেখানে কিছুই নেই।
আমি হেসে বললাম, “দড়ি হাতে নিয়ে এভাবে ঘুরছিস কেন? কাউকে বেঁধে আনবি নাকি?”
আজিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখ, আজ তো পাঠা কেনার দিন। কিন্তু একটাও পাঠা বাজারে নেই!”
আমি একটু অবাক। “পাঠা? এই সময়ে? ঈদও তো না। কী করবে পাঠা দিয়ে?”
এই প্রশ্নের পর আজিজের মুখে এমন এক গল্প শুরু হলো, যা শুনে মনে হলো—ভৌতিক সাহিত্যেও এত সৃজনশীলতা থাকে না।
সে বলল, “আমাদের বাজারের পাশে যে বড় বটগাছটা আছে, জানিস তো? ওই গাছের নিচে মা কালীর এক ভক্ত ভূত বাস করে। গ্রামের সবাই জানে ব্যাপারটা। কয়েক বছর আগে আমার দুলাভাই সেই বটগাছের একটা ডাল কেটে ফেলেছিল। তারপর থেকে আমাদের সংসারে অশান্তি—গরু মরে গেল, ব্যাটারি ফেটে আগুন, ছেলেপুলে অসুস্থ, আমি নাকি রাতে ঘুমোতে গেলেই কেউ বুকের উপর বসে!”
আমি হাসি চেপে বললাম, “তুই নিশ্চিত, কেউ বসে, নাকি তোর ভুঁড়ি বেড়ে গেছে?”
আজিজ রাগে চোখ বড় বড় করে বলল, “মজা করিস না ভাই! আমি এখন সিরিয়াস বিপদে আছি। গত সপ্তাহে কবিরাজ সাহেব এসে বলেছে—অমাবস্যার রাতে মা কালীর নামে একখানা পাঠা বলি দিয়ে বটগাছের নিচে রেখে এলে তবেই মুক্তি। না হলে, ভূতটা পুরো বাড়ি উজাড় করে দেবে।”
বলে এমনভাবে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন পৃথিবীর শেষ পাঠাটাও তার ভাগ্যের সঙ্গে হারিয়ে গেছে।
আমি বললাম, “তাহলে তুই তো ভূত-মুক্তি প্রজেক্টে নেমেছিস দেখি!”
সে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল, “ঠিক তাই। আজ সেই প্রজেক্টের বাস্তবায়নের দিন।”
তার মুখের এমন অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসে আমি হেসে ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম—আজিজের মতো লোকজনই হয়তো আধুনিক যুগেও কুসংস্কারের ঘরে বাতি জ্বালায়।
আমি জানতে চাইলাম, “বলি তো, তোর এই ভূতটা কি সত্যিই মা কালীর ভক্ত?”
সে বলল, “অবশ্যই! সবাই বলে, সে একসময় খুব ধর্মপরায়ণ ছিল। মন্দিরে মোম জ্বালাত, পূজা দিত। মৃত্যুর পর আত্মাটাও সেই বটগাছের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে।”
আমি বললাম, “তাহলে তো ভালো! এমন ভক্ত ভূত পেলে আশীর্বাদ পাওয়ার কথা, ভয় নয়।”
আজিজ গম্ভীর গলায় বলল, “তুই বুঝবি না, ওটা ভক্ত ভূত, কিন্তু রাগী।”
আমি হেসে ফেললাম, “রাগী ভূত আর রাগী বউ—দু’জনের সঙ্গেই সাবধানে চলতে হয়। তোর তো অভ্যাস আছে।”
সে গম্ভীর থেকে গম্ভীরতর হলো। “ভাই, মজা করিস না। আমি তো আসলেই ভুগছি। কবিরাজ সাহেব বলেছে, যদি পাঠা না দেই, তাহলে ভূত আমার দুলাভাইয়ের বদলে এখন আমাকেই ধরবে।”
আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, “পাঠা কেনার বাজেট কত রেখেছিস?”
সে বলল, “পনেরো হাজার।”
আমি বললাম, “আরে! এত টাকা দিয়ে ভূতকে খাওয়াবি? ওই টাকায় বরং গরীব মানুষকে খাওয়াস। দেখবি, সব অমঙ্গল দূর হয়ে যাবে।”
সে বলল, “না না, ভূত এসব বোঝে না।”
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “তুই তো নিজেই এখন ভূতের মতো কথা বলছিস। আমার মনে হয়, আসল পাঠা তুই নিজেই!”
আজিজ একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “তুই যা-ই বলিস, আমি আজ পাঠা না পেলে কালকে বিপদ হবেই।”
আমি বললাম, “চল, চা খাই।”
আমরা দু’জন চায়ের দোকানে বসলাম। দোকানদার আমাদের দেখে বলল, “দুইজন ভূত-বিজ্ঞানী একসাথে! চা দেবো?”
আজিজের মুখ লাল হয়ে গেল। আমি হেসে বললাম, “হ্যাঁ ভাই, চা দিন, তবে চিনি একটু কম—একজনের মিষ্টতা বেশি।”
চা খেতে খেতে আমি একটু গল্প ঘুরিয়ে বললাম, “আজিজ, মনে আছে স্কুলে আমরা ভূত ধরার খেলাটা খেলতাম? তখনও তুই ‘ভূত-ভয়’ বলতিস, আজও তাই।”
সে বলল, “তুই তো পড়ালেখা করে বড়লোক হইছিস, এসব বুঝবি না। আমরা সাধারণ মানুষ, ভয় পাই।”
আমি বললাম, “ভয় পাওয়া খারাপ না, কিন্তু ভয়কে বুদ্ধি বানানোই সবচেয়ে ভয়ংকর।”
সে চুপ করে রইল। আমি বললাম, “দেখ আজিজ, বটগাছের নিচে একবার যাস, কিন্তু পাঠা নিয়ে না। ফুল নিয়ে যা। একটা সাদা ফুল রাখিস, মনে মনে বলিস—‘আমি ভয় পাই না, আমি ভালোবাসি’। দেখবি, ভূত দূর হবে। কারণ ভালোবাসার ভয় পায় এমন ভূত আজও জন্মায়নি।”
আজিজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুই তো অনেক বড় কথা বললি ভাই। তবে পাঠা না কিনে কি কবিরাজকে মানানো যাবে?”
আমি বললাম, “কবিরাজও মানুষ। তুই তাকে বোঝাস—ভূতের চেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের মনের ভয়। সেটা দূর করলেই সব ঠিক।”
কথা শেষ হতেই পাশের দোকানে কেউ বলল, “বাজারে পাঠা এসেছে!”
আজিজ দৌড় দিল। আমি হাসতে হাসতে পিছন থেকে বললাম, “দৌড়াস না ভাই, ভূত তো তোর অপেক্ষায়ই আছে!”
কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে সে বলল, “সব পাঠা আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। আজ আর পাব না।”
আমি বললাম, “দেখলি? মা কালী নিজেই তোর মুক্তির পথ বন্ধ করে দিলেন। তুই এবার বুদ্ধি ব্যবহার কর।”
আজিজ চুপচাপ বসে রইল। তারপর হঠাৎ হাসল। “তুই ঠিকই বলছিস ভাই। আসল পাঠা তো আমিই। আমি ভয়, অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের হাতে বলি হয়ে যাচ্ছিলাম। আজ থেকে আর না।”
আমি বললাম, “বাহ! এখন তুই সত্যিকারের মুক্ত মানুষ।”
সেদিন বিকেলে আমরা দু’জন বটগাছটার সামনে গেলাম। গাছটা দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের গৌরবে। তার ছায়ায় এক অদ্ভুত শান্তি। আমি বললাম, “দেখ, এখানে তো কোনো ভূত নেই, আছে শুধু প্রকৃতি।”
আজিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাই, সত্যি বলি—এতদিন ভূতকে ভয় পেতাম, আজ নিজের অন্ধবিশ্বাসকেই ভয় পেলাম।”
আমরা কিছুক্ষণ নিরব রইলাম। তারপর সে গাছের নিচে একটা ফুল রেখে ধীরে বলল, “মা কালী, আমি ভয় নয়, বুদ্ধি চাই।”
আমি হেসে বললাম, “এটাই তোর আসল বলি—অজ্ঞতাকে উৎসর্গ কর।”
সন্ধ্যা নেমে এলো। বাজারে ফেরার পথে আজিজ বলল, “তুই জানিস, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—আগামী অমাবস্যায় কোনো পাঠা না, আমি গরীব বাচ্চাদের দুধ খাওয়াব।”
আমি হেসে বললাম, “বাহ! ভূত-মুক্তি প্রজেক্ট এখন ‘মানব-মুক্তি প্রজেক্ট’-এ রূপ নিল।”
আজিজ বলল, “আর তুই আজ আমার কবিরাজ। তবে তোর ফি কত?”
আমি বললাম, “শুধু একটা কথা মনে রাখিস—যতদিন মাথায় অন্ধবিশ্বাস থাকবে, তোর মূল্য পনেরো হাজারই থাকবে; কিন্তু যখন জ্ঞান ও সহমর্মিতা শিখবি, তখন তুই অমূল্য হয়ে যাবি।”
আজিজ হেসে বলল, “তাহলে আজ থেকে আমি অমূল্য মানুষ!”
বলে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের ভিড়ে হারিয়ে গেল সে—একটা পাঠা না কিনেই, কিন্তু এক অদৃশ্য পাঠ শেখে ফেলে গেল।
সেদিন গৌরীপুর বাজারে পাঠা পাওয়া যায়নি, কিন্তু পাওয়া গিয়েছিল একজন মানুষের মুক্ত আত্মা—যে ভূতের ভয় জয় করে নিজের মনের অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে এসেছিল।
শেষ কথা:
ভূত থাকে না গাছের ডালে, থাকে মানুষের মনে। যতদিন না মনের ভয়, অজ্ঞতা আর কুসংস্কারকে বলি দিতে পারব—ততদিনই আমরা অদৃশ্য পাঠা খুঁজে মরব। আর যেদিন হাসতে হাসতে ভয়কে বিদায় জানাব, সেদিনই আমাদের জীবন হবে আসল “ভূত-মুক্তি প্রজেক্ট”।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


কুসংস্কার, ভয় এবং একজন বন্ধুত্বের মাধ্যমে সেই কুসংস্কার থেকে মুক্তির এক দারুণ আখ্যান।