-
সূর্য ভাইয়ের টিউশন
তিতাস উপজেলার দক্ষিণপাড়া গ্রামের মানুষদের সকালে ঘুম ভাঙে মুরগির ডাক, কলার ছোবড়া আর মসজিদের মাইকে আজানের শব্দে। কিন্তু এই গ্রামের এক ব্যতিক্রম মানুষ আছেন—তার নাম রহিম মিয়া। অন্যরা যেখানে ভোরের আলো দেখেই পিঁড়ি ধরেন চায়ের দোকানে, সেখানে রহিম মিয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে ঘড়ি মাপে। কারণ তিনি এখন এক মহৎ অভিযানে নেমেছেন—ভিটামিন ডি সংগ্রহ অভিযানে!
সবকিছুর শুরু হয়েছিল এক সকালে, যখন রহিম মিয়ার স্ত্রী হালিমা বেগম গরম ভাতে ডাল ঢালতে ঢালতে বলেছিলেন,
—“শোনো, পাশের বাড়ির কালু ভাই বলতেছে, তুমারে নাকি রোদে দাঁড়াইতে হবে! ভিটামিন ডি নাকি শরীরে নাই!”
রহিম মিয়া ভাতের মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—“ভিটামিন ডি? আমি কি দোকানে গিয়া কিনে আনমু? না কি রোদে দাঁড়াইলেই পইরা যাবে শরীরে?”
তখন হালিমা এমন এক ভঙ্গিতে চোখ ঘুরালেন যেন বহু বছর ধরে বিজ্ঞান পড়েছেন।
—“বইয়ে লেখা আছে, সকাল দশটা থেইকা দুপুর তিনটা পর্যন্ত সূর্যের আলোতে দাঁড়াইলেই শরীরে ভিটামিন ডি হয়।”
এই তথ্য রহিম মিয়ার কানে এমনভাবে ঢুকলো, যেন কেউ বলেছে—“রোদে দাঁড়ালে লটারি লাগবে।”
পরদিন সকাল দশটা বাজতেই রহিম মিয়া গামছা কাঁধে নিয়ে উঠানে বের হলেন। লুঙ্গিটা একটু উপরে উঠিয়ে দিলেন—‘শরীরের বেশি অংশ উন্মুক্ত রাখলে নাকি বেশি ভিটামিন ডি হয়।’ পাড়ার ছেলেরা তখন ক্রিকেট খেলছিলো। ওরা তাকিয়ে বললো,
—“চাচা, মাঠে নামবেন নাকি?”
রহিম মিয়া গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন,
—“না রে, আমি এখন সূর্য ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলবো। শরীরে ডি নামক ভিটামিন ডাউনলোড করতেছি।”
ছেলেরা হো হো করে হেসে উঠলো।
কিন্তু রহিম মিয়া থামলেন না। সূর্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“ওরে সূর্য ভাই, তুমিই একমাত্র ফ্রি থেরাপিস্ট। তোমার আলোয় আমি এখন নিখরচায় চিকিৎসা নিচ্ছি।”
এভাবে কয়েকদিন চললো। সকালে গামছা পরে রোদে দাঁড়ান, দুপুরে ছায়ায় বসে পানি খান। গ্রামের মানুষ এখন তাকে নতুন নাম দিয়েছে—“ভিটামিন রহিম।”
একদিন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সহকারী জয়নাল সাহেব ভিজিটে এলেন। রহিম মিয়াকে দেখে বললেন,
—“আরে ভাই, এতক্ষণ রোদে কেন?”
রহিম মিয়া গর্বভরে বললেন,
—“ডাক্তারে কইছে, সূর্যের আলোতে দাঁড়াইলে শরীর নিজেরাই ভিটামিন ডি বানায়। আমি এখন নিজেই নিজের ফ্যাক্টরি।”
জয়নাল সাহেব হেসে বললেন,
—“ভালো কথা, কিন্তু দুপুর বারোটা পার হলে রোদটা ক্ষতিকর হতে পারে।”
রহিম মিয়া বললেন,
—“তা জানি, তাই আমি ছায়া মেপে দেখি। যখন ছায়া ছোট হয়, বুঝি রোদ কাজ করছে।”
পরেরদিন পাড়ার বাচ্চারা খেলতে খেলতে রহিম মিয়ার ছায়া মাপতে লাগলো।
—“চাচা, এখন আপনার ছায়া ছোট!”
—“তাহলে কাজ শুরু!” বলে রহিম মিয়া উল্লাসে হাত তুললেন।
এভাবেই গ্রামে এক অভিনব দৃশ্য দেখা গেল। কেউ গরু চরাচ্ছে, কেউ মাছ ধরছে, আর এক কোণে দাঁড়িয়ে রহিম মিয়া সূর্যের সাথে প্রেমালাপে মত্ত।
কিছুদিন পর রহিম মিয়া রোদে দাঁড়ানোকে শিল্পে পরিণত করলেন। তিনি এখন ‘সানবাথ কোচ’। সকালে পাড়ার বুড়োরা তার কাছে আসে। তিনি বোর্ডে লিখে রাখেন—
“ভিটামিন ডি ক্লাস: সকাল ১০টা থেকে ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। পোশাক: লাইট কালার লুঙ্গি। অবস্থান: আমগাছের নিচে।”
গ্রামের মানুষজন হেসে কুটিপাটি হয়, কিন্তু সবাই জানে—রহিম মিয়ার মুখে এখন এক বিশেষ আভা আছে। মুখে বলি রেখা কমেছে, মনেও প্রশান্তি।
একদিন রহিম মিয়ার বন্ধু শফিক এসে বলল,
—“রহিম, আমি শুনছি তুমি রোদে দাঁড়ায়ে নাকি রোগ সারাও?”
—“শুধু রোগ না ভাই, মনও ভালো হয়। রোদ মানে জীবন।”
—“তাহলে আমার বউয়ের রাগ সারাতে পারবি?”
—“রোদে দাঁড়ায়ে দেখ। হইতে পারে তার ভিটামিন ডি কম।”
এমনভাবেই রহিম মিয়ার ‘রোদ থেরাপি’ গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। একদিন স্কুলের শিক্ষক আসেন ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা করতে—“রোদে দাঁড়ালে কি মানুষ হাসিখুশি হয়?” পরীক্ষার ফলাফল দেখে সবাই অবাক! যারা রোদে দাঁড়িয়েছে, তারা সেদিন সবচেয়ে বেশি হাসছিলো।
রহিম মিয়া বললেন,
—“দেখছেন? সূর্য ভাই কেবল আলো দেন না, মনেও আলো ঢালেন।”
তবে সব আনন্দের মাঝেই একদিন বিপত্তি ঘটলো। হালিমা বেগম এক দুপুরে দেখলেন, রহিম মিয়া ছাদে বসে মাথায় গামছা বেঁধে ঘামছে।
—“এই রহিম! রোদে পুড়তেছো কেন?”
—“আমি নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতেছি। দুপুরের তিনটার রোদে একটু বাড়তি ডি ধইরা ফেলতে পারি কিনা দেখি।”
হালিমা বললেন,
—“এইভাবে ডি না, ডিহাইড্রেশন হইয়া মারা যাইবা!”
তারপর থেকে রহিম মিয়া শিখে গেলেন—“অতিরিক্ত রোদে দাঁড়ানো মানে বেশি ভিটামিন না, বেশি বিপদ।”
এখন তিনি সকাল দশটায় উঠানে আসেন, ঘড়ি দেখে ১৫ মিনিট রোদে দাঁড়ান, তারপর শান্তভাবে ছায়ায় বসে এক কাপ লেবুর শরবত খান। পাড়ার বাচ্চারা তাকে দেখলে বলে—
—“চাচা, আজও ডি ডাউনলোড করলেন?”
রহিম মিয়া হাসেন,
—“হ্যাঁ রে, আপডেট ভার্সন। এখন আর গরম লাগে না, শুধু মনটা আলোয় ভরে যায়।”
এভাবেই রহিম মিয়া শিখে নিলেন প্রকৃতির এক সুন্দর পাঠ—সূর্য কেবল আকাশের প্রদীপ নয়, সে জীবন, সে ওষুধ, সে বন্ধু।
রহিম মিয়া এখন গ্রামে জনপ্রিয় বক্তা। মসজিদের সামনে, চায়ের দোকানে, স্কুলে—সবখানেই তিনি বলেন,
—“ভাইসব, ভিটামিন ডি শুধু শরীর না, মনও ভালো রাখে। তাই রোদকে ভয় না পেয়ে ভালোবাসেন, তবে বুদ্ধি খাটাইয়া।”
তার বক্তৃতা শেষে সবাই হাততালি দেয়, কেউ বলে—“চাচা, আপনি তো সূর্যরশ্মির কবি!”
রহিম মিয়া হেসে বলেন,
—“আমি কিছু না ভাই, আমি কেবল সূর্য ভাইয়ের ছাত্র।”
এভাবে একদিন গ্রামজুড়ে হাসি ছড়িয়ে দিলেন রহিম মিয়া—ভিটামিন ডির রোদমাখা হাসি।
রোদে দাঁড়িয়ে তিনি এখনো বলেন,
—“জীবনে আলো পেতে চাইলে, কখনো কখনো সূর্যের নিচে একটু দাঁড়াতে হয়।” 🌞✨4 Comments-
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 31 October 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


রহিম মিয়ার ‘ভিটামিন ডি সংগ্রহ অভিযান’—গ্রামীণ সরলতা, ভুল ধারণা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহের এক চমৎকার মিশ্রণ।