Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • ### **অন্ধকারের ভেতরে আলো**

    ঢাকার রাতগুলো এখন আর নিস্তব্ধ হয় না। গলির মাথায় চায়ের দোকান, রাস্তার পাশে অনলাইন রাইডারদের অপেক্ষা, বিল্ডিংয়ের ছাদে নরম আলোতে একাকী ফোনে কথা বলা কেউ—সবকিছু মিলিয়ে রাত যেন এখন জীবনেরই একটা বড় অংশ। কিন্তু এই আলোর নিচে, এক নিঃশব্দ ক্লান্তি জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। এই ক্লান্তিই ধীরে ধীরে গ্রাস করছে সাদিকের জীবনকে—যে একসময় ছিল প্রাণবন্ত, উদ্যমী, স্বপ্নবাজ এক তরুণ।

    সাদিক কাজ করে একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানে। সকাল দশটায় অফিস শুরু, কিন্তু বাস্তবে দিন শুরু হয় দুপুরে—কারণ সে ভোর তিনটার আগে ঘুমাতে পারে না। ল্যাপটপের আলো, ক্যাফেইনের তীব্রতা আর অনবরত আসা ইমেইল—এই তিন জিনিসে কাটে তার রাতগুলো। একসময় ঘুমানোর চেষ্টা করলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোডের লাইন, ক্লায়েন্টের অভিযোগ, আর অসমাপ্ত প্রজেক্টের চাপ। তারপর সে নিজেই বলে, “আরেকটা ঘণ্টা কাজ করি, তারপর ঘুমাবো।” কিন্তু সেই “একটা ঘণ্টা” কেমন করে সকাল ছয়টা হয়ে যায়, সে নিজেই বুঝতে পারে না।

    প্রথমদিকে সাদিক ভেবেছিল এটা সাময়িক। “সবাই তো রাত জাগে,” সে নিজেকে বোঝাত। কিন্তু মাস পেরিয়ে বছর গড়ায়, ঘুমের ঘাটতি তার শরীরের ভেতরে এক অদৃশ্য আগুন জ্বালিয়ে তোলে। সকালে অফিসে পৌঁছেই মাথা ঝিমঝিম করে, চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ, আর মেজাজ—সবসময় বিরক্তিকর। সহকর্মীরা হাসত, “তুই দেখি জোম্বি হয়ে গেছিস!” কিন্তু সাদিক জানত, হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্য—সে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে।

    একদিন দুপুরে অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎ তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। বুকের ভেতরে অদ্ভুত চাপ, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ। সহকর্মীরা তাকে ধরে হাসপাতালে নেয়। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করলেন, তারপর চোখ তুলে বললেন, “তুমি শেষ কবে ভালো করে ঘুমিয়েছ?” সাদিক চুপ করে রইল। তারপর ডাক্তার জানালেন—তার রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, আর রক্তে শর্করার মাত্রাও বেড়েছে। “তুমি প্রিডায়াবেটিক,” বললেন ডাক্তার শান্তভাবে। “আর এভাবে চললে, কয়েক বছরের মধ্যে পূর্ণ ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।”

    সেদিন বাড়ি ফিরে সাদিক আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মুখে বয়সের ছাপ, চোখের নিচে গাঢ় ছায়া, ঠোঁটে শুকনো রেখা। যেন রাতগুলো তার মুখে দাগ কেটে গেছে। মায়ের ফোন আসে—“বাবা, খাওয়া হলো?” সে বলে, “হ্যাঁ মা, এখন খাচ্ছি।” কিন্তু বাস্তবে তার সামনে ঠান্ডা কফির কাপ ছাড়া কিছু নেই।

    রাতে সে বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকে—ঘুম কি সত্যিই এত জরুরি? কাজের চাপ তো কমানো যাবে না, স্বপ্নের জন্য লড়তে হয়, তাই না? কিন্তু শরীর যেন উত্তর দেয় অন্যভাবে। বুকে ধুকপুকানি বাড়ে, ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, মাথার ভেতর কুয়াশা জমে। সে বুঝতে পারে, ঘুম না শুধু বিশ্রাম, ঘুমই হয়তো জীবনের পুনর্জন্ম।

    কিছুদিন পর সে এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যায়। ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে বলেন, “তুমি শরীরের নয়, মনের ক্লান্তিতে ভুগছো। তুমি জেগে থেকে ঘুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছো, অথচ এই যুদ্ধের জয় মানে মৃত্যু।” ডাক্তার তাকে কিছু ওষুধ দেন, নিয়মিত সময়মতো ঘুমানোর পরামর্শ দেন। “তুমি যদি মেশিনের মতো বাঁচতে চাও, শরীর তোমাকে থামিয়ে দেবে,” তিনি বলেন।

    সেদিন রাতে সাদিক সব স্ক্রিন বন্ধ করে দেয়। ফোন সাইলেন্টে, ল্যাপটপ বন্ধ। কিন্তু ঘুম আসে না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীত—ছোটবেলার সেই দিনগুলো, যখন রাত মানে ছিল মায়ের গল্প, মশারির ভেতরে নিশ্চিন্ত ঘুম, ভোরে পাখির ডাক। এখন সেই রাতগুলো নেই, আছে কৃত্রিম আলো, নীল স্ক্রিন, নিঃশব্দ এক শূন্যতা।

    বাইরে জানালার ওপারে শহর তখনও জেগে। রাস্তার আলোয় ভেসে যাচ্ছে মোটরসাইকেলের শব্দ, কোথাও কুকুর ডাকছে। সাদিক অনুভব করে—এই শহর শুধু জেগে নেই, আসলে পুড়ছে। প্রতিটি জানালার পেছনে কেউ না কেউ ঘুমহীন রাতের বন্দী।

    পরের দিন সকালটা ভিন্ন ছিল। সূর্যের আলো জানালায় পড়ে ঘরটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। সাদিক ধীরে ধীরে চোখ মেলে। অনেকদিন পর তার ভেতরে শান্তি। সে অনুভব করে, “আমি ঘুমিয়েছি।” ছোট একটা জিনিস, কিন্তু কত মূল্যবান!

    এরপর থেকে সে নিজের জীবন বদলাতে শুরু করে। রাত ১১টার মধ্যে সব কাজ গুটিয়ে ফেলে। ঘুমের আগে বই পড়ে, হালকা গরম দুধ খায়। ধীরে ধীরে শরীর সাড়া দিতে শুরু করে। চোখের নিচের কালচে ছায়া মুছে যায়, সকালে ক্লান্তি কমে, মন শান্ত হয়। সে আবার সকালে ব্যায়াম শুরু করে, মা’কে ফোনে হাসিমুখে বলে, “মা, আজ ভালো ঘুমিয়েছি।”

    তার সহকর্মীরা অবাক হয়, “তুই এখন বদলে গেছিস রে!”
    সাদিক শুধু হেসে বলে, “আমি আবার আলো খুঁজে পেয়েছি।”

    একদিন অফিসে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সবাই রাত জেগে কাজের কথা বলছিল। সাদিক শান্ত গলায় বলল, “কাজ থাকবে, কিন্তু শরীরটা যদি না থাকে, তাহলে কাজ কাকে দিয়ে করাবেন?” সেই কথায় সবাই কিছুটা চুপ হয়ে যায়।

    ধীরে ধীরে সে বুঝতে শেখে—ঘুম মানে কেবল বিশ্রাম নয়, এটা একধরনের আস্থা, নিজেকে প্রকৃতির হাতে সমর্পণ। প্রতিদিন আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক এখনো সেই প্রাচীন ছন্দে বাঁধা—যেখানে রাত মানে অন্ধকার নয়, বিশ্রাম; আর সকাল মানে শুধু সূর্যোদয় নয়, পুনর্জন্ম।

    এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরছিল সাদিক। রাস্তার পাশে দেখল এক বয়স্ক লোক ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে। গাড়ির আলোয় মুখটা শান্ত, নিস্পাপ। হঠাৎ মনে হলো—এই লোকটার ঘুম হয়তো তার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান।

    সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। বাইরে শহর তখনও জেগে, কিন্তু তার মনে হয়—“আমাকে আর সেই জাগ্রত শহরের অংশ হতে হবে না।”

    আলো নিভে গেলে, সে নিজেকে এক নরম অন্ধকারে ভাসতে দেয়। ক্লান্ত শরীর, শান্ত মস্তিষ্ক, স্থির নিঃশ্বাস। হয়তো ঘুম এভাবেই আসে—চুপচাপ, কিন্তু জীবনকে নতুন করে জ্বালিয়ে দিয়ে।

    আর ভোরবেলা, যখন জানালায় সূর্যরশ্মি এসে মুখে পড়ে, সাদিক চোখ মেলে হেসে ফেলে। তার মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলো আসলে সেই মুহূর্তেই জন্ম নেয়—যখন তুমি গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠো, আর শরীর তোমাকে বলে,
    “তুমি এখনো জীবিত আছো।”

    4
    4 Comments
    • বর্তমান শহুরে জীবনের এক তীব্র এবং বাস্তব চিত্র।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 05 November 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar