-
ছায়ার ভেতর জ্বলে ওঠা আগুন
রাশেদ কখনো ভাবেনি, তার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা হবে অফিসের ভেতরের অদৃশ্য দেয়ালগুলো পেরিয়ে আসা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট করা, প্রশিক্ষণে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া, কিংবা কাজে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন—এসব যেন অফিসের ভেতরকার রাজনীতির সামনে কখনোই যথেষ্ট নয়। অথচ সে ছিল শান্তস্বভাবের, কাউকে বিরক্ত করতে চায় না, নিজের কাজটা ভালোভাবে করে ফেললেই তার সন্তুষ্টি। কিন্তু সম্প্রতি তার চারপাশে যেন অদৃশ্য এক ঝড় তৈরি হয়েছে, এবং সেই ঝড়ের নিয়ন্ত্রক ছিল তার টিমের সিনিয়র কর্মকর্তা—সমীর।
সমীর বাহ্যিকভাবে ভদ্র, হাসিখুশি ও সহজেই সবার মন জিতে নেওয়ার মতো মানুষ। কিন্তু রাশেদ দেখেছে, সুযোগ পেলেই তিনি অন্যের কাজ নিজের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি গোপনে ইমেইলের ভুল ব্যাখ্যা দেন, কথার ফুলঝুরি দিয়ে ব্যবস্থাপকের সামনে নির্দিষ্ট লোকদের খাটো করেন, এবং সবচেয়ে কৌশলীভাবে নিজের অবস্থান শক্ত রাখেন। রাশেদ প্রথম দিকে এসব বিষয় গুরুত্ব দেয়নি। সে ভেবেছিল, হয়তো ভুল বোঝাবুঝি, কিংবা তার নিজেরই অতিরিক্ত ভাবনা। কিন্তু ঘটনা আস্তে আস্তে যখন নিজের মাথার উপর ভর করতে শুরু করল, তখন সে বুঝল—এটা স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি নয়, এটা পরিকল্পিত।
একদিন সকালে মিটিং রুমে ঢুকতেই রাশেদ অবাক হয়ে দেখল, তার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশনে সমীর নিজের নাম টাইটেলে যোগ করে দিয়েছে। কেউ কিছু বলার আগেই সমীর বলতে শুরু করল কীভাবে তিনি রাতদিন পরিশ্রম করে পুরো প্রজেক্ট দাঁড় করিয়েছেন। রাশেদ তাকিয়ে রইল নীরবে, তার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু সেই আগুন সে চেপে রাখল। আবেগে ভেসে গিয়ে সে কিছু বলতে চাইছিল না। মিটিংয়ের পর তার খুব ইচ্ছা করছিল সমীরের সামনে গিয়ে চিৎকার করে বলতে—“এটা আমার কাজ!” কিন্তু সে বুঝল, চিৎকার করলে প্রমাণ চাইবে সবাই, আর প্রমাণ ছাড়া আবেগের মূল্য নেই।
সেদিন রাতে সে বাসায় ফিরে শান্তভাবে কম্পিউটার খুলল। প্রতিটি ইমেইল, চ্যাট, ডকুমেন্ট সে সাজিয়ে রাখল আলাদা ফোল্ডারের ভেতর। সে উপলব্ধি করল, সামনে যে যাই বলুক, তার তর্কের ভিত্তি হবে প্রমাণ। তারপর সে নিজের জার্নালে লিখল সেই দিনের ঘটনাগুলো—কবে, কখন, কীভাবে ঘটেছে। সে যেন নিজের মাথাকে ঠাণ্ডা রাখার জন্যই এভাবে সাজিয়ে নিচ্ছিল সব।
অফিসে পরের দিনও সমীরের আচরণ তাকে ভাবিয়ে তুলল। তবে এবার রাশেদের ভেতরের মানুষটা বদলে গেছে। আবেগ নিয়ন্ত্রণের এক দুর্লভ শক্তি সে যেন নিজের ভেতর খুঁজে পেয়েছে। যখনই কেউ সমীরের কথা তুলছে বা গসিপ করছে, রাশেদ সেখানে আর অংশ নিচ্ছে না। সে শুধু নীরবে হাসছে, শোনে, কিন্তু মত দিচ্ছে না। কারণ সে বুঝেছে, গসিপ মানেই ফাঁদ; যেকোনো ভুল সময়ে যেকোনো কথা তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব। সে নিজের মধ্যে সীমারেখা টেনে নিয়েছে, আর সেই সীমারেখা যে কতটা তাকে রক্ষা করছে, তা সে প্রতিদিন টের পাচ্ছে।
ধীরে ধীরে টিমে অনেকেই বিষয়টি লক্ষ্য করতে শুরু করল যে, রাশেদ কাউকে বিচার করে না, কারো সঙ্গে দলবাজি করে না, এবং তার কাজ সবসময় সময়মতো জমা দেয়। অথচ সমীরের তৈরি করা নানা গল্পে রাশেদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, কারণ সবাই দেখছে—কাজে সে একাগ্র, নীরব, এবং সহজ-সরল মানুষ। কিন্তু সমীর বোধহয় সেই নীরবতাকেই দুর্বলতা ভেবেছিল।
একদিন, একটি বড় ধরনের ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হলো। ব্যবস্থাপক রাশেদকে ডেকে পাঠালেন। সমীর নাকি অভিযোগ করেছে—রাশেদ নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তথ্য গোপন করেছে, যার কারণে একটি প্রয়োজনীয় রিপোর্ট দেরি হয়েছে। ম্যানেজার গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “রাশেদ, তুমি কি সত্যিই রিপোর্ট সময়মতো করোনি?”
রাশেদ এবার শান্তভাবে নিজের ল্যাপটপ খুলে প্রমাণ দেখাতে লাগল। সে ইমেইলের তারিখ দেখাল, যেখানে দেখা যাচ্ছে—সে তিন দিন আগেই সমীরকে সব তথ্য পাঠিয়েছে। সে মিটিং মিনিটস দেখাল, যেখানে উল্লেখ আছে যে রিপোর্ট প্রস্তুত করার দায়িত্ব সমীরেরই ছিল। আর সে উপস্থিত রইল বিনয় নিয়ে, কোনো আক্রমণাত্মক শব্দ ছাড়াই।
ম্যানেজার একটু তাকিয়ে রইলেন। এই প্রথমবার তিনি অনুভব করলেন, সমীরের কথার সঙ্গে ঘটনার মিল নেই। অভিযোগ উল্টে গেল, সমীর নিজেই বিপাকে পড়ে গেল। তারপর থেকে রাশেদের প্রতি তার আচরণ দৃশ্যত বদলে গেল। কিন্তু রাশেদ আর কোনোরকম ব্যক্তিগত বিজয়ের স্বাদ অনুভব করল না। সে শুধু বুঝল—নীরবতা মানেই দুর্বলতা নয়, বরং সঠিক সময়ে সঠিক কথা বলাই শক্তি।
এরপর রাশেদ অফিসের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে নিরপেক্ষ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করল। কারো সঙ্গে অকারণে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হলো না। দুপুরের বিরতিতে কখনো একদল থেকে তাকে ডাকলে, সে বিনীতভাবে গিয়ে বসত, কিন্তু মতামত দেওয়া বা কারো বিষয়ে বিচার করা থেকে বিরত থাকত। সে নিজেকে মুক্ত রাখত অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে।
মাসখানেক পর আবারও একটি ছোট সংঘর্ষ তৈরি হলো। সমীর নিজেকে বাঁচাতে চাইল, আর রাশেদকে আবারও দোষারোপের চেষ্টা করল। কিন্তু এবার রাশেদ তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলল। সে শান্ত স্বরে বলল, “ভাই, আপনি আমাকে নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করছেন। আপনি যদি চান আমরা দু’জনে বসে বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারি। তবে আমি চাই না আমাদের মধ্যে অনর্থক বিরোধ সৃষ্টি হোক।” কথা শুনে সমীর কিছুটা নরম হলো, হয়তো বুঝল, রাশেদের প্রতিরোধ নরম কিন্তু শক্তিশালী।
কিন্তু তবুও সমস্যা পুরোপুরি দূর হলো না। তাই রাশেদ ঠিক করল—সময় এসেছে HR-এ বিষয়টি জানানো। আবারও সে প্রমাণসহ প্রতিটি ঘটনা সাজিয়ে জমা দিল। HR নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করল, এবং সমীরের আচরণ নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করল। কিছুদিন পর সমীরকে অন্য টিমে স্থানান্তরও করা হলো।
যখন পরিস্থিতি একটু শান্ত হলো, রাশেদ নিজের জীবনে বড় একটি উপলব্ধি খুঁজে পেল। সে বুঝল, অফিস পলিটিক্স থেকে কেউ পুরোপুরি মুক্ত নয়। মানুষ যেখানে থাকবে, সেখানে মতবিরোধ থাকবে, ক্ষমতার খেলা থাকবে। তবে এই বিশৃঙ্খলার ভেতরে যে মানুষ নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, প্রমাণ হাতে রাখে, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকে এবং নিজের প্রফেশনাল সীমারেখা মজবুত রাখে—তার সামনে কারো পলিটিক্স টিকতে পারে না।
দিন শেষে অফিস থেকে বের হতে হতে সে ভাবল, আজও হয়তো কারো আচরণ তাকে কষ্ট দেবে, কারো কথা তাকে আঘাত করবে, কিন্তু সে জানে—তার ভেতরে আলো আছে, আর সেই আলো তাকে ছায়ার ভেতর আড়াল করে রাখবে না। আলো নিজে পথ দেখায়, আর সেই পথেই চলতে হয় বুদ্ধিমানের মতো।
ঠিক সেদিনই সে নিজের জার্নালে লিখল—“মানুষের কথায় নয়, নিজের কাজেই শক্তি। সম্পর্কের গভীরতায় নয়, সীমারেখার স্পষ্টতায় নিরাপত্তা। আবেগের ঝড়ে নয়, প্রমাণের শক্তিতে বেঁচে থাকা। আমি আজ জানলাম, ছায়ার ভেতরও আলো থাকে, যদি তুমি শান্তভাবে তাকিয়ে থাকতে জানো।”
রাশেদ উঠে দাঁড়াল আবার নতুন দিনের জন্য, নতুন লড়াইয়ের জন্য। কিন্তু এ লড়াই তাকে আর ভয় দেখাতে পারল না, কারণ সে জানে—বুদ্ধিমানের মতো পথচলা শুরু হয়ে গেছে তার জীবনে।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

সময়োপযোগী এবং অনুপ্রেরণামূলক আখ্যান।