-
ছায়ার পথে সতর্কতার আলো
শীতকাল ছিল তখন পুরো দমে। গ্রামের মাঠে কুয়াশার চাদর নেমে এসেছে, গাছের ডালে জমে আছে শিশির, আর ভোরের হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া যেন মানুষকে ঘর থেকে বেশি দূরে যেতে দিত না। কিন্তু এই শান্ত ঋতুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য এক আতঙ্ক—নিপা ভাইরাস। গ্রামের মানুষ হয়তো নামটা জানত, কিন্তু ভয়টাকে ঠিক অনুভব করতে পারত না। কারণ ভয় কখনো কখনো দেখা যায় না, শুধু ছায়ার মতো চারদিকে ঘুরে বেড়ায়।
তিতাসের সেই ছোট গ্রামে রহিম ছিল একেবারে অল্পবয়সী, সদ্য কলেজে পড়া এক কিশোর। খুব চঞ্চল, খুব প্রাণবন্ত। সে প্রতিদিন ভোরে খেজুরের রস পছন্দ করত। তার বন্ধু জামাল খেজুরের গাছ থেকে রস নামাত, সেও প্রায়শই রহিমের জন্য একটু বাড়তি সংগ্রহ করত। এই গ্রামের মানুষরা শীতে রস না খেয়ে থাকতে পারে? তাদের কাছে এটি শুধু পানীয় নয়—ঐতিহ্য, আনন্দ, আর শীতের উৎসব।
কিন্তু এই শীতে কিছু একটা যেন অস্বাভাবিক ছিল। পাশের গ্রামে দুজন মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কথায় আছে তারা কিছুদিন আগেই কাঁচা রস খেয়েছিল। গুজব ছড়িয়ে পড়ল—“নিপা ভাইরাস এসেছে নাকি!” কেউ বিশ্বাস করল, কেউ তুচ্ছ করল। কিন্তু ভয়টা যে ধীরে ধীরে নদীর জলের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল, তা বোঝা যাচ্ছিল গ্রামের বাতাসেই।
এক সন্ধ্যায় রহিম যখন জানতে পারল পাশের গ্রামের সেই দুজন মারা গেছে, তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এলো। আগে এসব গল্প শুনে সে হাসত—”বাদুড়ের কামড়ানো ফল খেলে আবার ভাইরাস হয় নাকি!” কিন্তু এখন সে হাসতে পারল না। মৃত্যুর খবর মানুষের মনকে অদ্ভুতভাবে পরিবর্তন করে দেয়।
সেই রাতে রহিমের বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ওই রসের দিকে আর যাবি না। বাদুড় নাকি আবার রসের হাঁড়ির ওপর বসে। ডাক্তার বলছে, এই ভাইরাসে একবার আক্রান্ত হলে বাঁচানো কঠিন।”
রহিম চুপচাপ মাথা নেড়ে ঘুমাতে গেল, কিন্তু ঘুম এল না। তার মনে পড়ল সাম্প্রতিক দিনগুলোর কথা। সকালে জামাল তাকে কাঁচা রস দিয়েছিল—ঠিক যেদিন প্রথম মৃত্যুর খবর আসে। সে কি বিপদে আছে? তার গা শিউরে উঠল।
পরদিন ভোরে জামাল রস নিয়ে আবার এল। রহিম দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“আজ নিব না ভাই।”
জামাল অবাক হয়ে বলল,
“কেন? আমি তো গাছে নেট লাগিয়ে রস টানি, বাদুড় ঢুকতে পারে না—তুই জানস।”
রহিম বিষণ্ণ কণ্ঠে জবাব দিল,
“ভাইরাসের ভয়। তুই সাবধানে থাকিস জামাল। এই রস বিক্রি করলেও সাবধান।”
জামালের চোখে হতাশা—রস বিক্রি বন্ধ হলে তার সংসার চলবে না। সে শুধু নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেল।
এরপর থেকেই রহিমের মধ্যে এক অদ্ভুত আতঙ্ক কাজ করতে শুরু করল। হালকা জ্বর হলে সে ভয় পেত। মাথা ব্যথা হলে মনে হতো, হয়তো নিপা ভাইরাস! মানুষের মন কখনো কখনো নিজের অজান্তেই ভেঙে পড়ে। সে প্রতিদিন খবর শুনত, ডাক্তারদের সতর্কতা মনোযোগ দিয়ে পড়ত। বাদুড় যে অর্ধেক খাওয়া ফল ফেলে যায়, সেই ফলগুলো এখন গ্রামের কেউই ছুঁতে চায় না।
একদিন গ্রামের স্কুল মাঠে স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন এল সচেতনতা বাড়াতে। তারা বলল,
“নিপা ভাইরাস যদি একবার শরীরে ঢোকে, চিকিৎসা কঠিন। তাই সাবধানতা সবচেয়ে বড় ঢাল। বাদুড় খেয়ে ফেলা ফল খাবেন না, কাঁচা রস খাবেন না, এবং অসুস্থ মানুষকে যত্ন নিলেও হাত-মুখ ধুয়ে নেবেন।”
রহিম সেই সভায় বসে ছিল, আর তার বুকের ভেতরে ভয় আর আশার মিশ্র অনুভূতি। সে ভাবল, মানুষ আসলে সবসময় জানার অজান্তে মৃত্যুর সাথে পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু তখনই বাঁচে যখন সতর্ক হয়।
কিছুদিন পর গ্রামেরই আরেকজন অসুস্থ হয়ে পড়ল—তরুণী মেয়ে হাফিজা। উচ্চ জ্বর, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট। পুরো গ্রাম যেন থমকে গেল। ডাক্তাররা সন্দেহ করল এটি নিপা হতে পারে। তাকে শহরের হাসপাতালে পাঠানো হলো। হাফিজার বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন,
“ও তো শুধু বিকেলে পেয়ারা খেয়েছিল! কারো অর্ধেক খাওয়া ফল নাকি ছিল…”
গোটা গ্রাম এ খবর শুনে ছায়ার নিচে গুটিয়ে গেল। কুয়াশার মতো ভয় যেন ঘর থেকে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু রহিম বুঝল—ভয় পেলেই মানুষ বাঁচে না, ভয়কে চিনে ফেলার পরেই বাঁচে।
সে সিদ্ধান্ত নিল গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করবে। স্কুলের মাঠে একদিন সে বন্ধুদের জড়ো করে বলল,
“আমরা সবাই যদি একটু করে সতর্ক হই, তাহলে ভাইরাসের ছায়া থেকে বের হতে পারব। মানুষের জীবন বাঁচানো সবার দায়িত্ব।”
রহিম, জামাল, লতিফা—তারা কয়েকজন মিলে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে জানাতে লাগল—
“শীতে রস খাবেন না। অর্ধেক খাওয়া ফল ফেলুন। অসুস্থকে যত্ন নিন, কিন্তু সুরক্ষা নিয়ে।”
গ্রামের মানুষ প্রথমে সন্দেহ করল, কিন্তু ধীরে ধীরে শুনতে শুরু করল।
কয়েক সপ্তাহ পরে খবর এল—হাফিজা সুস্থ হয়েছে। নিপা নয়, সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর ছিল। এটি যেন পুরো গ্রামের বুকের ভেতর আলো জ্বালিয়ে দিল। রহিম যে উদ্যোগ নিয়েছিল, সবাই তাকে সম্মান করল। জামালও তার গাছে ভালো নেট লাগাল, রস গরম করে পাটালি বানানোর ব্যবসা শুরু করল—যা নিরাপদও।
রহিম রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল—মানুষ অন্ধকার ছায়ার সাথে লড়াই করে বাঁচে, কিন্তু আলো জন্মায় মানুষের ভেতর থেকেই। ভয়কে জেনে, সতর্ক থেকে, এবং একে অপরের জন্য একটু দায়িত্ববোধ রেখে।
শীতের কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হলো। গ্রামের অচেনা আতঙ্ক মিলিয়ে গেল। কিন্তু মানুষ শিখল—জীবন শুধু রসের মতো মিষ্টি নয়, কখনো কখনো অদৃশ্য ভাইরাসের মতো তিক্তও হতে পারে। আর সেই তিক্ততা জয় করার একমাত্র শক্তি—সচেতনতা।
রহিমের মনে তখন একটি উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠল—
“ছায়া যত গভীরই হোক, মানুষের ভিতর যদি আলো থাকে, তবে অন্ধকার কখনো জয়ী হতে পারে না।”2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


সময়োপযোগী এবং শিক্ষামূলক গল্প