-
স্ক্রলের ওপারে যে নীরবতা
শীতের বিকেল নামছিল ধীরে ধীরে। তিতাস নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রাশেদ মনে করছিল, নদীটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ। ছোটবেলায় এই নদীর পাড়েই বসে সে বিকেল কাটাত, বন্ধুদের সঙ্গে গুলতি ছোড়া, কাগজের নৌকা ভাসানো, কিংবা দূরের মাঠে ফুটবল খেলতে যাও য়ার গল্প করত। এখন নদী আছে, আকাশ আছে, অথচ কিশোরদের চোখে সেই আগ্রহ নেই। তারা নদীর দিকে তাকায় না, তাকিয়ে থাকে ফোনের পর্দায়। রাশেদ একজন স্কুলশিক্ষক। বয়স পেরিয়ে চল্লিশ। ক্লাসে ঢুকলেই সে বুঝতে পারে—শিক্ষার্থীদের চোখে ক্লান্তি, অস্থিরতা, এক ধরনের অদৃশ্য তাড়াহুড়া।
গত কয়েক দিন ধরে রাশেদের মাথায় ঘুরছে একটা খবর। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। প্রথমে সে ভেবেছিল, এটা কোনো দূরের দেশের গল্প, বাংলাদেশের সঙ্গে যার তেমন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কয়েক দিন পর সে দেখল, নিজের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের আচরণে যেন সেই দূরের সিদ্ধান্তের ছায়া এসে পড়েছে। কেউ কেউ হাসছে, কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করছে, কেউ আবার ভয়ে চুপ করে আছে। যেন তারা বুঝে গেছে—আজ অস্ট্রেলিয়া, কাল হয়তো অন্য কোথাও, হয়তো একদিন এখানেও।
রাশেদের ক্লাসের ছাত্র মাহিন। বয়স পনেরো। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো, কিন্তু গত এক বছরে তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। ক্লাসে বসে সে বারবার ফোন চেক করে। একদিন রাশেদ ডেকে নিল। জিজ্ঞেস করল, “কী রে মাহিন, রাতে ঘুমাস তো?” মাহিন প্রথমে হাসল, তারপর ধীরে বলল, “স্যার, ঘুম আসে না। নোটিফিকেশন আসে।” এই ছোট্ট কথাটার ভেতরে রাশেদ যেন একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেল। নোটিফিকেশন—একটা শব্দ, যা ঘুম, স্বপ্ন, এমনকি শৈশবও কেড়ে নেয়।
মাহিনের মা রেহানা বেগম একদিন স্কুলে এলেন। চোখ লাল, কণ্ঠ কাঁপা। তিনি বললেন, “স্যার, আমার ছেলে আগের মতো নেই। সারাক্ষণ চুপচাপ। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করে না। ফোন কেড়ে নিলে রেগে যায়।” রাশেদ জানতেন, এই গল্প নতুন নয়। গত কয়েক বছরে এমন কত মায়েরা এসেছেন। কেউ বলেছে অনলাইন গেম, কেউ বলেছে ফেসবুক গ্রুপ, কেউ বলেছে অচেনা মানুষের সঙ্গে রাতভর চ্যাট। কিন্তু সমস্যার মূল যেন একটাই—একটা অদৃশ্য জাল, যার ভেতর কিশোরেরা আটকে যাচ্ছে।
এই সময়েই ঢাকার এক পত্রিকায় বড় করে ছাপা হলো অস্ট্রেলিয়ার সেই আইনের খবর। শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিংক ঘুরতে লাগল। কেউ লিখল, “বাংলাদেশে হলে ভালো হতো।” কেউ আবার বলল, “এতে কি হবে? বাচ্চারা ঠিকই পথ বের করবে।” রাশেদ চুপচাপ পড়ল। তার মনে হলো, এই আইন আসলে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, এটা একটা প্রশ্ন—আমরা আমাদের শিশুদের কোন শৈশব দিতে চাই?
একদিন স্কুলে বিতর্কের আয়োজন করা হলো। বিষয়—“কিশোরদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন কি না।” মাহিন বক্তা হলো। মঞ্চে উঠে সে বলল, “আমরা যদি সোশ্যাল মিডিয়া না ব্যবহার করি, তাহলে আমাদের কণ্ঠ কে শুনবে? আমরা তো এখানেই কথা বলি, এখানেই শিখি, এখানেই প্রতিবাদ করি।” তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, কিন্তু চোখে ছিল এক ধরনের অস্থিরতা। এরপর আরেক ছাত্রী, নীলা, বলল, “সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের বন্ধুর মতো, কিন্তু এই বন্ধু কখন যে আমাদের ক্ষতি করে, আমরা বুঝতে পারি না।” হলঘরে নীরবতা নেমে এল।
রাশেদ তখন ভাবছিল, অস্ট্রেলিয়ার কিশোররা যেমন বলছে—এই আইন কাজ করবে না—আমাদের কিশোররাও হয়তো তাই বলবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মন বদলানো যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি অন্তত চেষ্টা করব না?
এক সন্ধ্যায় মাহিন রাশেদের বাড়িতে এলো। হাতে ফোন নেই। চোখে এক ধরনের শূন্যতা। সে বলল, “স্যার, যদি একদিন হঠাৎ সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়, আমরা কী করব?” রাশেদ একটু হেসে বলল, “তখন হয়তো তোমরা নিজেদের সঙ্গে কথা বলবে।” মাহিন চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, “নিজেদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় লাগে, স্যার।” এই কথাটা রাশেদের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। কত বড় ভয় লুকিয়ে আছে এই প্রজন্মের ভেতর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আলাদা। এখানে দারিদ্র্য আছে, চাপ আছে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আছে। সোশ্যাল মিডিয়া অনেকের কাছে শুধু বিনোদন নয়, পালিয়ে থাকার জায়গা। কিন্তু পালাতে পালাতে তারা কোথায় যাচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। রাশেদ দেখেছে, অনলাইন বুলিংয়ে ভেঙে পড়া ছাত্র, ফলোয়ার কমে যাওয়ায় আত্মমর্যাদায় আঘাত পাওয়া কিশোরী, কিংবা ভাইরাল হওয়ার নেশায় বিপদে পড়া শিশু।
একদিন তিতাসের পাড়ে রাশেদ একটা দৃশ্য দেখল। কয়েকজন কিশোর বসে আছে। কারও হাতে ফোন নেই। তারা গল্প করছে, হাসছে, নদীতে ঢিল ছুড়ছে। রাশেদের মনে হলো, এটাই হয়তো সেই বিকল্প জগত—যেখানে অ্যালগরিদম নেই, নোটিফিকেশন নেই, কিন্তু আছে মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস।
অস্ট্রেলিয়ার আইন বাংলাদেশের আইন নয়। কিন্তু সেই দূরের সিদ্ধান্ত যেন এখানে একটা আয়না তুলে ধরেছে। আমরা সেই আয়নায় নিজেদের শিশুদের মুখ দেখছি। প্রশ্ন করছি—আমরা কি তাদের রক্ষা করতে পারছি? নাকি আমরা নিজেরাই সেই স্ক্রলের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি?
রাশেদ জানে, একদিন হয়তো বাংলাদেশেও এই আলোচনা আরও জোরালো হবে। হয়তো আদালতে যাবে, হয়তো রাজপথে যাবে, হয়তো সংসদে উঠবে। কিন্তু আইন আসুক বা না আসুক, সবচেয়ে জরুরি কাজটা অন্য জায়গায়—পরিবারে, স্কুলে, সমাজে। কিশোরদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের শোনা, তাদের ভয়গুলো বোঝা।
রাত গভীর হলে রাশেদ জানালার পাশে বসে থাকে। দূরে কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসে টিকটকের গান, কোথাও আবার ফেসবুক লাইভের আওয়াজ। এই শব্দের ভিড়ের মাঝেও সে একটা নীরবতার খোঁজ করে। সেই নীরবতা, যেখানে কিশোরেরা আবার নিজেদের চিনতে শিখবে, যেখানে ফোনের পর্দার ওপারেও একটা পৃথিবী আছে—নদী, মাঠ, আকাশ আর মানুষের উষ্ণ উপস্থিতি।
স্ক্রল থামলে হয়তো প্রথমে শূন্য লাগবে। কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতরেই জন্ম নিতে পারে নতুন গল্প, নতুন স্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়ার আইন হোক বা বাংলাদেশের আলোচনা—সবশেষে প্রশ্নটা একটাই, আমরা কি আমাদের শিশুদের সেই শূন্যতার সাহস শেখাতে পারব? স্ক্রলের ওপারে যে নীরবতা, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার সাহসটাই হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং কিশোর মনস্তত্ত্বের সংকট বিষয়ে একটি গভীর ও সময়োপযোগী সামাজিক বিশ্লেষণ।