-
জুতোর সেলাইয়ে বাঁধা মানুষের মর্যাদা
গ্রামটার নাম ছিল শ্যামলপুর। নামের মতোই সবুজে ঘেরা, ধানক্ষেতের ঢেউ খেলানো বুক, মাটির রাস্তা, আর দুপুরের রোদে ঝিমিয়ে পড়া বটগাছ—সব মিলিয়ে এক শান্ত গ্রাম। এই গ্রামের মানুষগুলো একে অন্যকে চেনে নাম ধরে, পেশা ধরে, কখনো কখনো ডাকনাম ধরে। এখানেই থাকত রাতুল। পড়াশোনায় ভালো, চোখে কৌতূহলের দীপ্তি, আর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে সে বড় হচ্ছিল। তার বাবার নাম সবাই খুব একটা জানত না; গ্রামবাসী তাঁকে ডাকত “মুচি” বলে। কিন্তু রাতুল কখনো বাবাকে ওই নামে ডাকেনি, কখনো শুনতেও পছন্দ করত না। সে বলত—তার বাবা একজন চর্মকার, চামড়ার কাজের কারিগর, মানুষের পায়ের ভরসা।
রাতুলের বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠতেন। ফজরের আজান শেষ হতে না হতেই তিনি তার ছোট্ট ঝুলি কাঁধে নিতেন। সেই ঝুলিতে থাকত সুতো, ছুরি, হাতুড়ি, লোহা, আর অসংখ্য গল্প—যেগুলো জুতোর ফাঁকে ফাঁকে জমে আছে বছরের পর বছর। বয়স হয়েছে অনেক, হাঁটুর ব্যথা আছে, চোখে আগের মতো জোর নেই। তবু মুখে লেগে থাকে এক প্রশান্ত হাসি। সেই হাসির মধ্যে কোনো ক্লান্তি নেই, নেই অভিমান। যেন তিনি জানেন—এই কাজটাই তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব।
গ্রামে গ্রামে হেঁটে হেঁটে তিনি জুতা সেলাই করতেন। কখনো স্কুলের সামনে বসতেন, কখনো হাটের ধারে, কখনো কোনো গাছের ছায়ায়। মানুষ তাকে ডাকত, “এই মুচি, একটু আসবেন?” তিনি কখনো বিরক্ত হতেন না। ডাকের ভেতরের অসম্মান তিনি গায়ে মাখতেন না। বরং বলতেন, “জুতা দেখান, ঠিক করে দিই।” তার আঙুলগুলো যেন জাদুকরের মতো—ছেঁড়া চামড়া, আলগা তলা, ছিঁড়ে যাওয়া ফিতা—সবই তার হাতে নতুন প্রাণ পেত।
রাতুল ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বসে বসে এসব দেখেছে। সে দেখেছে, কোনো কৃষক মাঠে যাওয়ার আগে বাবার কাছে আসে, কোনো রিকশাচালক দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো স্কুলছাত্র লজ্জা নিয়ে এগিয়ে আসে। সবাই যেন এক অদ্ভুত নির্ভরতা নিয়ে বাবার সামনে বসে। তখন রাতুল বুঝতে পারত—তার বাবার কাজ শুধু জুতা সেলাই নয়, মানুষের চলার পথ ঠিক করে দেওয়া।
তবু সমাজ সবসময় এমন উপলব্ধি নিয়ে চলে না। স্কুলে একদিন কয়েকজন সহপাঠী হাসতে হাসতে বলেছিল, “তোর বাবা তো মুচি!” সেই কথাটা কানে গিয়ে লেগেছিল রাতুলের বুকে। সে চুপ করে ছিল, কিন্তু সেই চুপের ভেতরে জমে উঠেছিল আগুন। সেদিন বাড়ি ফিরে সে বাবার দিকে তাকিয়েছিল নতুন চোখে। বাবাকে দেখে মনে হয়েছিল—এই মানুষটা কতটা দৃঢ় হলে, কতটা বড় হলে এমন অবজ্ঞাকে এত সহজে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে!
একদিন গ্রামের প্রধান রাস্তার মাঝখানে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। দূরের বাজার থেকে আসা এক ভদ্রলোকের দামি জুতার তলা হঠাৎ ছিঁড়ে গেল। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি দিশেহারা। চারপাশে লোক জড়ো হলো। কেউ বলল, “আরে, এখন কী করবেন?” কেউ বলল, “এখানে তো কোনো দোকান নেই।” কেউ আবার ঠাট্টা করে হাসল। ঠিক তখনই কেউ একজন বলল, “চর্মকার কাকা থাকলে ভালো হতো!”
এই কথাটা যেন বাতাসের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, দূর থেকে হেঁটে আসছেন রাতুলের বাবা। ঝুলি কাঁধে, মুখে সেই চিরচেনা হাসি। তিনি কাছে এসে শান্ত গলায় বললেন, “জুতাটা দেখান।” ভদ্রলোক প্রথমে একটু দ্বিধা করলেও পরে বসে পড়লেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জুতাটা ঠিক হয়ে গেল। ভদ্রলোক হাঁটলেন, পা মাটিতে পড়ল ঠিকঠাক। তাঁর মুখে তখন বিস্ময় আর স্বস্তির মিশ্রণ।
তিনি বললেন, “আপনি না থাকলে আজ আমার কত অসুবিধা হতো!” সেই মুহূর্তে চারপাশের মানুষের চোখে এক নতুন উপলব্ধির আলো জ্বলে উঠল। যারা এতদিন অবহেলা করত, তারাই বুঝল—এই মানুষটির কাজ কতটা জরুরি।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

সামাজিক বৈষম্য, পেশাগত মর্যাদা এবং একজন সাধারণ মানুষের নীরব আত্মমর্যাদার অসাধারণ গল্প