Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • আয়নার সামনে দাঁড়ানো মানুষ
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
    শহরের প্রান্তে ছোট্ট এক মহল্লায় বাস করত রাশেদ। খুব সাধারণ মানুষ—না সে খুব ধনী, না খুব প্রতিভাবান। তবু তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে চাইত সবাই তাকে ভালোবাসুক, সম্মান করুক, নাম শুনলেই মুখে হাসি ফুটুক। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অফিসে তার কথা কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনত না, পাড়া-মহল্লায় তাকে নিয়ে গুঞ্জন থামত না, এমনকি অনেক সময় সে নিজেকেই ভালো লাগত না। রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করত—“আমি কি সত্যিই এমন একজন, যাকে ভালোবাসা যায়?”
    এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই একদিন তার জীবনে নেমে এলো এক নীরব পরিবর্তনের সূচনা। ঘটনাটা খুব সাধারণ। এক বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে সে দেখল, রাস্তার ধারে বসে থাকা এক বৃদ্ধ হঠাৎ পড়ে গেলেন। চারপাশে লোকজন ছিল, কিন্তু কেউ থামল না। রাশেদ নিজেও প্রথমে থামতে চায়নি। মনে হলো—দেরি হবে, কে জানে ঝামেলায় পড়তে হয়। কিন্তু পা দুটো এগোলো না। কোথাও যেন ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলল, “একবার দাঁড়াও।” সে দাঁড়াল। বৃদ্ধকে তুলে বসাল, পানি দিল, একটু সময় দিল। বৃদ্ধ কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে শুধু বললেন, “ভালো থাকিস বাবা।”
    এই কথাটা রাশেদের বুকের ভেতর কোথাও গেঁথে গেল। সে বুঝতে পারল, খুব ছোট একটা দয়াও মানুষের মনে কত বড় ছাপ ফেলতে পারে। সেই দিন থেকেই সে নিজেকে একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল—কাউকে দেখানোর জন্য নয়, নিজের অস্থির মনটাকে শান্ত করার জন্য।
    পরদিন অফিসে সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে শুধু কথা বলবে না, শুনবে। সহকর্মী সালমা যখন নিজের কাজের চাপ নিয়ে অভিযোগ করছিল, রাশেদ আগে হলে হয়তো মাঝপথে থামিয়ে দিত। কিন্তু সেদিন সে চুপচাপ শুনল। কোনো উপদেশ দিল না, কোনো বড় কথা বলল না। শুধু বলল, “তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি।” সালমা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টিতে ছিল স্বস্তি। রাশেদ বুঝল—মনোযোগ দিয়ে শোনা নিজেই এক ধরনের সম্মান।
    দিনের পর দিন, ছোট ছোট আচরণে পরিবর্তন আসতে লাগল। সে আর কাউকে নিয়ে গোপনে হাসাহাসি করত না। আগে যেসব আলোচনায় পরনিন্দা ছিল মজা পাওয়ার উপাদান, সেগুলো থেকে সে নিজেকে সরিয়ে নিল। কেউ যখন অন্যের বদনাম করত, সে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিত বা চুপ করে থাকত। শুরুতে অনেকে তাকে বিরক্তিকর মনে করেছিল, কেউ কেউ বলেছিল, “রাশেদ বড় সাধু হয়ে গেছে!” সে হাসত। এই হাসিতে আর আগের মতো তিক্ততা ছিল না।
    হাসি—এই জিনিসটা সে নতুন করে আবিষ্কার করল। আগে তার হাসি ছিল কৃত্রিম, প্রয়োজনে দেওয়া। এখন সে হাসতে শিখল আন্তরিকভাবে। গেটের দারোয়ানকে দেখে হাসত, দোকানির সাথে দু’চার কথা বলত, বাসে উঠলে পাশে বসা অচেনা মানুষটাকেও একটুখানি সৌজন্য দেখাত। আশ্চর্যভাবে সে লক্ষ করল, মানুষও তার দিকে বদলে যাচ্ছে। আগের সেই উপেক্ষার চোখে এখন ছিল স্বাভাবিকতা, কখনো কখনো উষ্ণতা।
    তবে পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল নিজের ভুল স্বীকার করা। একদিন অফিসে একটি রিপোর্টে ভুল করে সে বসের সামনে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল। আগে হলে সে হয়তো দোষ চাপাত অন্যের ওপর। কিন্তু সেদিন সে মাথা নিচু করে বলল, “ভুলটা আমার। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।” ঘরে নীরবতা নেমে এসেছিল। বস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুধু বলেছিলেন, “এই দায়িত্ববোধটাই আমি চাই।” সেই মুহূর্তে রাশেদের মনে হলো—সততা কখনো কখনো দেরিতে হলেও নিজের মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়।
    সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে গভীর হতে লাগল। সে শিখল ক্ষমা করতে—এমনকি যাদের আচরণ তাকে কষ্ট দিয়েছিল, তাদেরও। এক পুরোনো বন্ধু, নাসিম, কোনো এক ভুল বোঝাবুঝিতে বহুদিন কথা বলেনি। রাশেদই প্রথম ফোন করল। বলল, “হয়তো আমিও ঠিক ছিলাম না।” কথাগুলো সহজ ছিল, কিন্তু সাহসী। সেই ফোনালাপের শেষে নাসিমের কণ্ঠে যে নরমতা ছিল, তা রাশেদ বহুদিন শোনেনি।
    ভালোবাসার ভাষাও সে বুঝতে শিখল। কেউ প্রশংসায় খুশি হয়, কেউ সময়ে, কেউ ছোট্ট সাহায্যে। সে আর নিজের মতো করে ভালোবাসা চাপিয়ে দিত না। মায়ের সাথে বেশি সময় কাটাত, বাবার ছোট ছোট কথার গুরুত্ব দিত, বন্ধুদের সাফল্যে ঈর্ষা নয়, আন্তরিক প্রশংসা করত। এই আন্তরিকতা কোনো হিসাব করে আসেনি—এসেছিল উপলব্ধি থেকে।
    তবু একদিন সন্ধ্যায় সে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। চেহারা খুব বদলায়নি। একই মুখ, একই চোখ। কিন্তু ভেতরের মানুষটা যেন অন্য। সে বুঝতে পারল, তবু সবাই তাকে ভালোবাসবে না। কেউ তার পরিবর্তনকে দুর্বলতা ভাববে, কেউ উপেক্ষা করবেই। কিন্তু এই সত্যটা আর তাকে কষ্ট দিত না। কারণ সে জানত, সে নিজের কাছে সৎ।
    একদিন পাড়ার এক তরুণ এসে বলল, “ভাই, আপনি কথা বললে ভালো লাগে।” কথাটা শুনে রাশেদ হাসল। এই হাসিতে ছিল না অহংকার, ছিল কৃতজ্ঞতা। সে বুঝল—প্রিয় হওয়া কোনো কৌশল নয়, কোনো মুখোশও নয়। প্রিয় হওয়া আসলে নিজের ভেতরের মানুষটার সাথে শান্তিতে থাকা।
    রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছিল। রাশেদ জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভাবল—মানুষের মন জয় করতে গিয়ে সে আসলে নিজের মনটাই খুঁজে পেয়েছে। আর সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

    2
    1 Comment
    • একটি সুন্দর, অনুপ্রেরণামূলক এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক গল্প

Skip to toolbar