Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • আমি রুনা।

    আমার পরিচিতজনেরা কি কখনো আমাকে দাঁত বের করে হাসতে দেখেছেন? নাহ্ দেখেননি। তাই বলে কি আমি রামগরুড় এর ছানা? আরে নাহ্, আমি হাসিখুশি একজন মেয়ে। কিন্তু ছোট বেলা থেকে কিভাবে যেন মাথায় ঢুকে গেছে দাঁত বের করে হাসলে আমাকে ভালো লাগে না। কারণ আমার দুইপাশে দুটো গজদন্ত আছে। শুধু কি দাঁত নিয়ে আমার সমস্যা ছিলো? নাহ্, চেহারা, গায়ের রং সব কিছু নিয়েই আমার প্রচুর সমস্যা। নিজের কোন কিছু নিয়েই আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। তাই সবকিছুতেই অন্তরালে থাকতাম।
    বান্ধবীদের সাথেও প্রাণখুলে গল্প করা, ঘুরে বেড়ানো, কোনটা ই করতাম না।
    বাড়িতে তিনজন বড়ভাই এবং একবড়বোনের কঠোর নজরদারিতে আমার দিন কাটতো। শৈশবে ছেলেমেয়েরা কত দুষ্টমি করে! গাছে উঠে, পুকুরে ঝাপায় আমি এগুলো করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। স্কুলে High Jump, Long Jump এ অংশগ্রহণ করার কথা চিন্তার অতীত ছিলো আমার জন্য। কারণ এগুতে অংশগ্রহণ করলে আমার Humerus, Radius, Ulna, Femur, Fibula, Tibia etc, ( ধুৎতরি ছাতা! এত নাম কি আর এই বৃদ্ধ বয়সে মনে আছে?) কত টুকরো হবে, তার জন্য আমাকে সারাজীবন কি ভোগান্তি পোহাতে হবে এগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো। দৌঁড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করার অনুমতি কোন রকমে দিয়েছিলেন, তবে তাতেও শর্ত ছিলো – কেউ যেন আমাকে খেলায় ধাক্কা দিয়ে না ফেলে তাই সবার সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এটা হলো কিছু, আপনারাই বলেন?
    আমিও পরিবারের সব আদেশ বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে চলতাম( Adapted Child)।
    সবাই আমাকে লক্ষীমেয়ে, শান্ত মেয়ে, পড়ুয়া মেয়ে বলতো, এগুলোতেই আমি সন্তুষ্ট থাকতাম। আমার নিজের সম্পর্কে খুব খারাপ ধারণা ছিলো (Low self esteem)। এভাবে চলতে চলতে কখন যেন আমি Cinderella Complex এ আক্রান্ত হই। নাহ্ নাহ্ প্রেম করবো এধরণের কোন চিন্তাই আসার সুযোগ ছিলো না, আর ঐ যে আগেই বলেছি নিজের চেহারা নিয়ে সন্তষ্টু ছিলাম না। “Prince charming ” আসবে আর আমি তার উপর নির্ভর করে থাকবো।
    বিয়ের পরে আমি আমার Prince charming এর উপর সব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত থাকতে চাইতাম। কিন্তু আমার Prince charming সম্পর্ণ উল্টো ছিলো।
    সে আমাকে দেখে হতবাক হয়ে যেত! একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী রাজশাহী থেকে ঢাকা একা আসতে পারেনা? তাও আবার রাজশাহীতে কেউ বাসে তুলে দিবে এবং ঢাকায় ও নামিয়ে নিবে!
    আমার নৌবাহিনীতে এডুকেশন কোরে পরীক্ষা ছিলো। আমার বড়ছেলে রেহানের তখন মাত্র তিনমাস বয়স।যারা নৌবাহিনীতে পরীক্ষা দিয়েছেন তারা নিশ্চয়ই জানেন প্রসেসটা। অনেক ধরনের পরীক্ষা দিতে হয়। আমি একে একে সব পরীক্ষায় সিলেক্ট হতে থাকি। আমি ভিতরে পরীক্ষা দেই আর রেহানকে নিয়ে আমার সাহায্যকারী বাহিরে অপেক্ষা করে। যেহেতু তার বয়স তিনমাস তাই নির্দিষ্ট সময় পর পর আমাকে ওনারা ছেড়ে দেন বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য। বাহিরে এসে আমি কান্নাকাটি করি, কারণ যে মেয়ে আমি জোরেহাঁটতে পারিনা, তাকে বিভিন্ন কসরত করতে হচ্ছে। প্রত্যেক পরীক্ষার পরেই আবার ভাইভা দিতে হয়। ভাইভার সময় ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চান ওনারা, আমি আমার বাচ্চার কথা বলি। পরিবারে বাচ্চাকে রাখারমত কে, কে আছেন জানতে চান। বলি কেউ নেই আমার ঢাকাতে।
    প্রত্যেক দিন বাড়িতে আসার পরে আমার Prince charming, আমাকে বোঝান – এটা কোন বিষয় না, বাচ্চারাও পারবে দড়ি ধরে উঠতে, সাঁতার কাটতে।
    প্রাথমিক ভাবে সিলেক্ট হলাম। এবার ঢাকাতে ১৫ দিন ওদের নির্ধারিত ক্যাম্পাসে ট্রেনিং চলবে। এই ১৫ দিনের মধ্যে আমি বাড়িতে যেতে পারবোনা, কিন্তু সপ্তাহে একদিন আমার সাথে দেখা করতে আসতে পারবে। তারপর চট্টগ্রাম এ ৬ মাসের ট্রেনিং, সেখানে দেখা করতেও যেতে পারবেনা। ঢাকায় ট্রেনিং এ টেকার জন্য তুহিন আমাকে ফার্মগেটে এক কোচিং সেন্টারে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলো। বাসায় এসে আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম, ছেলেকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবোনা। আমার prince charming বললো- কিচ্ছু হবে না, রেহানকে রাজশাহীতে ওর মামী, নানীর কাছে রেখে আসবে। এটা শুনে আমি আরো কান্নাকাটি শুরু করলাম। পরের দিন আবারও নৌবাহিনী অফিসে বিভিন্ন কাগজ পত্র নিয়ে ডেকেছিলো। আবারও পরীক্ষা এবং ভাইভা। ভাইভার সময় ভাইভা বোর্ডের একজন আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলছিলেন। চাকরিতে কি কি করতে হবে। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন – আপনার জায়গায় যদি আমার বোন থাকতো তবে তাকে আমি এখন এই চাকরিতে ঢুকতে নিষেধ করতাম। আপনার বাচ্চা ছোট, এখন আপনার এই চাকরিতে ঢোকা উচিৎ হবেনা।
    আপনি পিএইচডি করেছেন, লম্বা, সব দিক দিয়েই পারফেক্ট, ভবিষ্যতে আপনি আরো ভালো কিছুতে ঢুকতে পারবেন, চাকরির বয়সও আছে।
    জানি না তিনি কেন তখন আমাকে এভাবে বলেছিলেন? তাঁর বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বারও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন – ছেলে, ছেলের বাবাসহ আমাদের বাড়িতে আসবেন।
    সেই সময় ওনার মধ্যে আমি আমার বড় ভাইয়ের প্রতিকৃতি খুঁজে পেয়েছিলাম।
    বের হয়ে এসে তুহিনকে কেঁদে কেঁদে ওনার কথাগুলো বলছিলাম। এবং বলেছিলাম আমি এই চাকরি করবো না। বছরে ৬ মাস থাকতে হবে সমুদ্রে।
    হ্যাঁ, আমি আর যাইনি, সাঁতারও শিখিনি।

    আমি ডঃরাহেনা
    আমাকে তুহিন ছেড়ে চলে গেছে এক এলোমেলো সময়ে।
    কোথা থেকে শুরু করবো,আর কিভাবে শুরু করবো, এসব ভাবার সময় পর্যন্ত পাইনি। সন্তানদের কাছে আমি এখন মা এবং বাবা। নিজের কাজ, তুহিনের অসমাপ্ত কাজ, সংসারের খুটিনাটি সব কিছু সামলাতে হচ্ছে আমাকে।
    হঠাৎ এতকাজের দায়িত্ব এসে পড়ায় মাঝেমধ্যে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ছি। তবে আল্লাহর অসীম রহমতে আবারও সামলে নিতে পারছি।
    একসময় আমি কিছু ই পারতাম না, আলহামদুলিল্লাহ এখন আমি সামলাতে পারি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও পাড়বো।
    তাই আজ আমি নিজেকে কিছু positive affirmation দিতে চাই, তা হলো–

    I am capable.
    I accept myself as I am.

    শুভ রাত্রি।
    রি -পোস্ট

    2
    2 Comments
    • শৈশবের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে শুরু করে, জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে এককভাবে সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার এই গল্পটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আপনার জন্য শুভকামনা।

Friends

Profile Photo
Hafizur Rahman shakil
@shakilahamed72gmail-com
Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Skip to toolbar