-
তিন মাসের খাতা
শীতের শেষ বিকেলের আলো জানালার গ্রিলে আটকে ছিল, যেন বাইরে যেতে চায় কিন্তু পারছে না। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা খাতাগুলো সেই আলোর মধ্যে আধা-আধি ডুবে ছিল—কিছুতে কবিতার খসড়া, কিছুতে অসম্পূর্ণ গল্প, কিছুতে শুধু তারিখ আর কয়েকটা ভাঙা বাক্য। রায়হান চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বসে ভাবছিল, সে আসলে কী হতে চায়। বন্ধুদের কেউ চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, আর সে—সে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা লিখে, আবার ছিঁড়ে ফেলে। মা মাঝে মাঝে বলেন, “লেখালেখি ভালো শখ, কিন্তু জীবনের ভরসা কি শুধু শখে হয়?” প্রশ্নটার জবাব তার কাছে নেই, শুধু ভেতরে একটা অদ্ভুত টান আছে—শব্দের দিকে, গল্পের দিকে, মানুষের ভেতরের গোপন আলো-অন্ধকারের দিকে।
সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। মোবাইলের নেটওয়ার্কও দুর্বল। বিরক্ত হয়ে সে টিভির সুইচে হাত বাড়াল, তারপর থেমে গেল। মনে পড়ল এক প্রবীণ লেখকের সাক্ষাৎকারে শোনা কথা—সময় নষ্ট করলে শব্দ আসে না। সে আলমারি থেকে একটা মোটা উপন্যাস বের করল, সঙ্গে নিল নিজের ডায়েরি। মোমবাতির আলোয় পড়তে পড়তে বুঝল, অন্যের লেখা পড়লে নিজের ভেতরে কীভাবে বাক্য জন্ম নেয়। চরিত্রের সিদ্ধান্ত, পরিবেশের গন্ধ, সংলাপের ছন্দ—সব কিছু সে নোট করতে লাগল। টিভির অভ্যাসটা সেদিন থেকেই ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।
কয়েক সপ্তাহ পর সে প্রথম গল্পটা একটি লিটল ম্যাগাজিনে পাঠাল। উত্তরের খামে শুধু দুটো লাইন—“দুঃখিত, এই সংখ্যায় ছাপা সম্ভব হলো না।” বুকের ভেতরটা হালকা করে হু হু করে উঠেছিল। সে খামটা ভাঁজ করে ড্রয়ারে রাখল, তারপর নিজের লেখাটা আবার পড়ল। এবার আর আবেগে নয়, কাঁচির মতো চোখ নিয়ে। কোথায় অপ্রয়োজনীয় কথা, কোথায় দুর্বল দৃশ্য, কোথায় কেবল শব্দের বাহার—সব চিহ্নিত করল। মনে হলো, ব্যর্থতা আসলে একটা নীরব শিক্ষক।
লেখার সময় সে ধীরে ধীরে নিজের সঙ্গে একটা চুক্তি করল—অন্যকে খুশি করতে গিয়ে মিথ্যা বলবে না। যেটা সে সত্যি ভাবছে, যেটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, সেটাই লিখবে। গ্রামের স্কুলে পড়ানো এক স্যারের নীরব সংগ্রাম, শহরের বস্তিতে থাকা এক কিশোরীর স্বপ্ন, নিজের বাবার অবসর-পরবর্তী শূন্যতা—সবই কাগজে আসতে লাগল। সে বুঝল, আগে নিজের জন্য লিখতে পারলে তবেই অন্যের কাছে পৌঁছানো যায়।
রায়হান লক্ষ্য করল, কঠিন প্রশ্নগুলোই তাকে বেশি টানে। কেন কিছু মানুষ নিয়ম ভাঙে, কেন কেউ সারা জীবন অপেক্ষায় কাটিয়ে দেয়, কেন ভালোবাসা কখনো সাহস দেয় আবার কখনো ভেঙে ফেলে—এই সব জটিলতা সে গল্পের আড়ালে তুলে ধরতে চাইল। লিখতে বসার সময় মোবাইল বন্ধ করে রাখত, দরজায় একটা কাগজ সাঁটিয়ে দিত—“লিখছি, বিরক্ত করো না।” ঘরের ভেতর তখন শুধু কলমের শব্দ আর দূরের আজানের ধ্বনি।
শুরুতে তার লেখায় শব্দের ভার ছিল বেশি। অযথা ভারী বিশেষণ, লম্বা অনুচ্ছেদ, জটিল বাক্য—সব মিলিয়ে পাঠককে ক্লান্ত করার মতো। একদিন সাহিত্য ক্লাবের বৈঠকে এক সিনিয়র লেখক বললেন, “গল্পে শব্দের প্রদর্শনী নয়, প্রয়োজন স্পষ্টতা।” সেই রাতেই রায়হান কয়েকটা লেখা কাটছাঁট করল। অনেক বাক্য ছোট করল, কিছু ক্রিয়াবিশেষণ বাদ দিল। আশ্চর্য, গল্পগুলো যেন হালকা হয়ে গেল, শ্বাস নিতে পারল।
কাহিনি বানানোর সময় সে ব্যাকরণের ভয়ে থমকে থাকত না। আগে দৃশ্যটা, চরিত্রের আবেগটা ধরত, পরে ঠিক করত ভাষা। বর্ণনায় সে চেষ্টা করত যেন পাঠক দেখতে পায়—বৃষ্টিতে ভেজা রিকশার সিট, হাসপাতালের করিডোরে জীবাণুনাশকের গন্ধ, নদীর ধারে বসে থাকা বৃদ্ধের কাঁপা হাত। কিন্তু তথ্যের বোঝা চাপিয়ে দিত না; চরিত্র আর ঘটনার মধ্য দিয়েই সব বোঝাতে চাইত।
বাস্তব মানুষই ছিল তার গল্পের মূল উপাদান। পাশের বাসার দারোয়ান, কলেজের লাইব্রেরিয়ান, ট্রেনে দেখা এক অচেনা মুখ—সবাই কল্পনার রঙে বদলে গিয়ে নতুন চরিত্র হয়ে উঠত। সে পুরোনো ছকে আটকে থাকতে চাইত না; পরিচিত বিষয়েও নতুন কোণ খুঁজত। কখনো ঝুঁকি নিয়ে অদ্ভুত আঙ্গিকের গল্প লিখত, যা পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে ভেবে ভয় পেত, তবু থামত না।
কয়েকজন বন্ধু ঠাট্টা করে বলত, গভীর রাতে লিখতে বসলে নাকি মাথা খুলতে কিছু দরকার হয়। সে হেসে উড়িয়ে দিত। শরীর আর মন সুস্থ রাখার চেষ্টা করত—ভোরে হাঁটতে যেত, মাঝেমধ্যে মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প করত, ছোট ভাইয়ের খাতা দেখে দিত। শান্ত সংসার, নিয়মিত ঘুম—এই সবই যে লেখাকে সহজ করে, সেটা সে টের পাচ্ছিল।
অন্য লেখকদের বই সে গিলে খেত, কিন্তু নকল করতে চাইত না। নিজের ভেতরের স্বর খুঁজছিল। কে তার পাঠক—গ্রামের তরুণ, শহরের কর্মজীবী, নাকি স্বপ্নবাজ কিশোর—এই ভাবনা মাথায় রেখে সে শব্দ বেছে নিত। লেখালেখিকে সে শখের বাইরে এনে প্রতিদিনের কাজ বানাল। পাঁচ পৃষ্ঠা হোক বা এক পৃষ্ঠা, কিছু না কিছু লিখতই। খাতার পাতায় তারিখ লিখে রাখত—এই ছিল নিজের সঙ্গে প্রতিদিনের চুক্তি।
তিন মাসের একটা লক্ষ্য সে ঠিক করল—একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের খসড়া। প্রতিদিন দশ পৃষ্ঠা লিখলে কেমন দাঁড়ায়, হিসাব কষে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখল। প্রথম সপ্তাহে হিমশিম খেল, দ্বিতীয় সপ্তাহে গতি এল, মাঝখানে কয়েক দিন কিছুই এগোল না। তবু সে থামেনি। একদিন জ্বর নিয়ে লিখল, আরেকদিন গভীর রাতে চোখ জ্বলতে জ্বলতে। তিন মাস শেষে যখন শেষ পৃষ্ঠায় কলম থামাল, তখন মনে হলো সে পাহাড় টপকেছে।
খসড়াটা শেষ মানেই যে শেষ নয়, সেটা সে জানত। আবার পড়া, কাটাছাঁট, নির্মমভাবে বাদ দেওয়া—এই প্রক্রিয়া শুরু হলো। কিছু প্রিয় দৃশ্য ফেলতে গিয়ে বুক কেঁপে উঠেছিল, তবু সে বুঝল, গল্পটাই আসল, তার অহং নয়।
এক বিকেলে সে জানালার পাশে বসে পুরোনো খাতাগুলো দেখছিল—ছেঁড়া পৃষ্ঠা, ব্যর্থতার চিঠি, প্রথম দিককার ভারী বাক্য। হাসি পেল। বাইরে কাক ডাকছিল, আকাশে মেঘ জমছে। রায়হান নতুন খাতা খুলল, প্রথম পাতায় লিখল—“আজ আবার শুরু।” সে জানত, বড় লেখক হওয়া হয়তো দূরের কথা, কিন্তু সে এখন একজন লেখক—কারণ সে প্রতিদিন লিখছে, পড়ছে, ভুল করছে, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। তিন মাসের খাতাটা বন্ধ করে সে কলম ঘুরাল আঙুলের মধ্যে, আর মনে মনে বলল, নিষ্ঠা থাকলে শব্দ একদিন ঠিকই পথ খুঁজে নেয়।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


শব্দ যখন মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়, তখন সেই মানুষটি আর কখনো নিঃস্ব হয় না।