Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • অন্তরীক্ষে স্থির মুহূর্ত
    আরিয়ান তার চিরচেনা শহরের আলো-মায়া পিছনে ফেলে উঠে পড়ল মহাসূন্যের দিকে। সে জানে, তার চোখের সামনে টিকটিক করে চলা ঘড়ি আসলে মিথ্যা বলছে। পৃথিবীর সময়ের ধারাবাহিকতা কেবল একটি বিভ্রম; বাস্তবের গভীরে কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যত নেই। তার পা যখন মহাবিশ্বের শূন্যে ভেসে উঠল, তখন আরিয়ানের কাছে সবকিছু—তার জন্ম, তার শিশুস্মৃতি, তার বার্ধক্য—একসাথে স্থির হয়ে গেল।
    কোয়ান্টাম স্তরের খণ্ডগুলোর মধ্যে ভেসে থাকতে তার মনে হলো, মহাবিশ্বের প্রতিটি মুহূর্ত এক বিশাল, নীরব পাউরুটির স্লাইসের মতো। বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সব মুহূর্ত একই সাথে বিদ্যমান। তার চারপাশের নক্ষত্র, ধূমকেতু, এবং কালো গহ্বরগুলোও যেন সময়ের সঙ্গী নয়, বরং এক অনন্ত স্থিরতার মধ্যে ফ্রেমবদ্ধ।
    আরিয়ান লক্ষ্য করল, তার চারপাশের অন্ধকারে মৃদু আলো ফোটে, ঠিক যেমন একটি ঘড়ির কাঁটা মূর্তির মতো ঘূর্ণন করে। কিন্তু এই ঘূর্ণন কেবল ভান; বাস্তবে কিছুই এগোচ্ছে না। তার মস্তিষ্ক এটাকে ‘প্রবাহ’ হিসেবে ভুল করছে, কারণ আমাদের মন শুধুই এনট্রপি বৃদ্ধির দিক থেকে ধারাবাহিকতা খুঁজে পায়। সে অনুভব করল, সময় তার চেতনার তৈরি একটি মানসিক মানচিত্র, যা তাকে জীবনের নিয়ন্ত্রণের মতো অনুভব করায়।
    কয়েক মুহূর্ত পর আরিয়ান একটি স্থির নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করল। এখানে সবকিছু নিখুঁতভাবে স্থির। প্রতিটি নক্ষত্র, প্রতিটি গ্রহ, প্রতিটি ক্ষুদ্র কণার অবস্থান যেমন আছে, ঠিক তেমনই আছে। সে বুঝল, তার জীবনের প্রতিটি সুখ-দুঃখও এখানে একইভাবে ‘মৌলিক স্থিরতা’-র অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু, হাসি থেকে কান্না, সমস্ত মুহূর্ত মহাজাগতিক ক্যানভাসে খোদাই হয়ে আছে—একটি বিশাল ব্লক ইউনিভার্সে, যেখানে সময় নেই, কেবল অস্তিত্বের মহিমা।
    তারপর, আরিয়ান দেখল কেমন করে তার নিজের স্মৃতি এখানে আলো হয়ে ফোটে। সে নিজের শৈশবকে দেখল, যেখানে ছোট্ট হাতের নৌকা কুয়াশার জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। একই সাথে তার বার্ধক্যও দৃশ্যমান—একটি শান্ত, অভিজ্ঞ আরিয়ান, যার চোখে সময়ের ছায়া নেই। সব মুহূর্ত একসাথে উপস্থিত, একক স্থির ক্যানভাসে।
    আরিয়ান বুঝল, মানুষের ‘বর্তমান’ শুধুই একটি মানসিক সংকলন। তার মস্তিষ্ক অতীত সংরক্ষণ করতে পারে, ভবিষ্যৎ নয়। তাই সে অনুভব করে একমুখী প্রবাহ। কিন্তু মহাবিশ্বের এই নীরব ডায়েরিতে সময়ের কোনো সীমানা নেই। প্রতিটি মুহূর্ত শাশ্বত, অনন্ত। আরিয়ান ধীরে ধীরে হাসল, কারণ সে জানল—তার জীবন কখনো হারায়নি, কখনো শেষ হয়নি। সবই এক স্থির, মহিমান্বিত সমাহারে বিদ্যমান।
    যখন আরিয়ান আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে এল, ঘড়ি যেন আগের মতো টিকটিক করছে, কিন্তু তার চোখে আর সেই ঘড়ি নেই। তার মস্তিষ্ক জানে, ঘড়ি শুধুই একটি প্রতীক; সময় বাস্তবে কখনোই বয়ে যায়নি। আরিয়ান শান্ত, কারণ সে বুঝেছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই চিরস্থায়ী, এবং সে সবসময়ই কোথাও না কোথাও উপস্থিত। এখন তার জন্য সময় কোনো শাসক নয়, বরং এক মহাজাগতিক মানচিত্র—যেখানে সব মুহূর্ত একসাথে, এক চিরস্থায়ী নীরবতার আড়ালে।
    ________________________________________

    2
    2 Comments
Skip to toolbar