-
ডিজিটাল হাতকড়া
রাত আড়াইটা। শহর ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু রায়হানের চোখে ঘুম নেই। অন্ধকার ঘরে একমাত্র আলোর উৎস তার মোবাইলের স্ক্রিন। নীলচে আলো তার মুখে এমনভাবে পড়েছে, যেন সে কোনো অদৃশ্য জিজ্ঞাসাবাদের সামনে বসে আছে। ফেসবুকের নিউজফিডে আঙুল চালাতে চালাতে সে বুঝতেই পারে না, কতক্ষণ কেটে গেল। একটু আগে সে নিজেকে বলেছিল, “মাত্র পাঁচ মিনিট।” পাঁচ মিনিটের সেই অঙ্গীকার এক ঘণ্টা পেরিয়ে এখন দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি।
রায়হান স্বপ্ন দেখে বড় কিছু হওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র, লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার হওয়া। দেয়ালে টাঙানো একটি কাগজে বড় করে লেখা—“ডিপ ওয়ার্ক, ডিপ রেজাল্ট।” কথাটি সে এক সেমিনারে শুনেছিল। গভীর মনোযোগ ছাড়া বড় সাফল্য আসে না। কিন্তু সেই কাগজের নিচেই তার পড়ার টেবিলে পড়ে থাকে ফোনটি—নীরব অথচ প্রভাবশালী এক প্রহরী, যে তাকে বন্দি করে রাখে অদৃশ্য কারাগারে।
সকালে অ্যালার্ম বেজে ওঠে সাতটায়। অ্যালার্ম বন্ধ করতে গিয়েই সে দেখে তিনটি নোটিফিকেশন। এক বন্ধুর নতুন ছবি, আরেকজনের চাকরি পাওয়ার খবর, একটি রিলস ভিডিও। অ্যালার্ম বন্ধের কাজ সেরে উঠতে না উঠতেই সে ঢুকে পড়ে সেই জগতে। আধা ঘণ্টা পর যখন সে বিছানা ছাড়ে, তখন মাথা ভারী, চোখ লালচে। মা রান্নাঘর থেকে ডাকেন, “রায়হান, আজ তো লাইব্রেরিতে যাওয়ার কথা ছিল?” সে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, যাচ্ছি।” কিন্তু তার কণ্ঠে দৃঢ়তা নেই।
লাইব্রেরিতে বসে সে বই খুলে। প্রশাসন, সংবিধান, ইতিহাস—সব কিছুই তার সামনে সাজানো। প্রথম দশ মিনিট মনোযোগ থাকে। তারপর হঠাৎ ফোনটি কাঁপে। সে ভাবে, “দেখি কে মেসেজ দিল।” মাত্র এক ঝলক দেখার কথা। কিন্তু সেই এক ঝলক তাকে টেনে নেয় অন্যের জীবনের রঙিন দৃশ্যে। কেউ মালয়েশিয়ায় ঘুরতে গেছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে, কেউ বিদেশে স্কলারশিপ পেয়েছে। রায়হান নিজের অজান্তেই তুলনা করতে শুরু করে। তার মনে হয়, সে যেন পিছিয়ে পড়েছে। তার বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি জমে ওঠে। বইয়ের অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। সে ভাবে, “আজ ঠিকমতো পড়া হলো না। কাল থেকে শুরু করব।” কাল যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। প্রতিদিনের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য কাল একটি নিরাপদ শব্দ।
তার বন্ধু সামিউল একদিন বলল, “তুই সারাক্ষণ ফোনে থাকিস কেন? তোর তো বড় লক্ষ্য!” রায়হান হেসে উড়িয়ে দিল, “না রে, আমি কন্ট্রোল করতে পারি।” কিন্তু সে জানে, কন্ট্রোল শব্দটি তার জন্য কাগুজে। ফোনের প্রতিটি লাইক, প্রতিটি নোটিফিকেশন তার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ তৈরি করে। ছোট ছোট তৃপ্তি। পড়াশোনার কঠিন অধ্যায় শেষ করার আনন্দ অনেক দূরের, ধৈর্যের। কিন্তু ফোনের আনন্দ তাৎক্ষণিক। সে ধীরে ধীরে কঠিন কাজ থেকে পালাতে শেখে।
একদিন রাতে তার বাবা বললেন, “বাবা, তোর চোখের নিচে কালি পড়েছে। এত রাত জাগিস কেন?” রায়হান উত্তর দেয় না। সে জানে, রাত জাগার কারণ বই নয়। ঘুম ভাঙার পর তার মাথা ভারী থাকে। সকালে পড়তে বসলে মন কাজ করে না। ছোট একটি সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা লাগে। সে নিজেকে অলস ভাবতে শুরু করে। অথচ অলসতা নয়, ক্লান্তি তাকে গ্রাস করেছে।
এক বিকেলে লাইব্রেরিতে বসে সে হঠাৎ খেয়াল করল, পাশে বসা এক বৃদ্ধ মানুষ মোটা একটি বইয়ে ডুবে আছেন। তার সামনে কোনো ফোন নেই। ঘণ্টাখানেক কেটে গেল, লোকটি একবারও মাথা তুললেন না। রায়হান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে নিজের ফোনের স্ক্রিনে টাইম ট্র্যাকার অ্যাপ খুলে দেখল, সেদিন সে চার ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়েছে। চার ঘণ্টা! একদিনে। সে হিসাব করল, বছরে কত হয়? সংখ্যা দেখে তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। এত সময় দিয়ে সে কত বই পড়তে পারত, কত মক টেস্ট দিতে পারত!
সেই দিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সে যেন নিজেই নিজের কাছে বন্দি। হাতকড়া নেই, দেয়াল নেই, তবুও মুক্ত নয়। তার পকেটেই বন্দিশালার চাবি, আবার বন্দিশালাও।
সে সিদ্ধান্ত নিল, অন্তত এক সপ্তাহ চেষ্টা করবে। প্রথম দিন সে ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করল। অস্বস্তি হলো। বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখেছে। হাত নিজে থেকেই ফোনের দিকে বাড়ে। সে হাত থামায়। বইয়ের দিকে চোখ ফেরায়। প্রথম দিন খুব কষ্ট হলো। মাথা ভারী, মন অস্থির। কিন্তু দ্বিতীয় দিনে কিছুটা সহজ লাগল। তৃতীয় দিনে সে লক্ষ্য করল, একটানা চল্লিশ মিনিট পড়তে পারছে। আগে দশ মিনিটও পারত না।
এক সপ্তাহ পর সে অনুভব করল, তার ভেতরে এক ধরনের নীরব শক্তি তৈরি হচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙে সতেজভাবে। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ফোন দূরে রেখে ঘুমাতে যায়। সোশ্যাল মিডিয়া পুরো ছাড়েনি, কিন্তু সময় বেঁধে দিয়েছে। তুলনার বদলে নিজের অগ্রগতি নোট করতে শুরু করেছে। ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে।
মাসখানেক পরে মক টেস্টে তার ফল আগের চেয়ে অনেক ভালো হলো। সামিউল অবাক হয়ে বলল, “কি করলি?” রায়হান মৃদু হেসে বলল, “হাতকড়া খুলেছি।” সামিউল বুঝতে পারল না। কিন্তু রায়হান জানে, সে কিসের কথা বলছে।
একদিন রাতে সে আবার ফোন হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে অসংখ্য রঙিন ছবি, নোটিফিকেশন। কিন্তু এবার তার ভেতরে আগের মতো টান নেই। সে ফোনটি নামিয়ে রাখে। জানালার বাইরে তাকায়। আকাশে চাঁদ উঠেছে। সে মনে মনে ভাবে, সাফল্য কোনো তাৎক্ষণিক লাইক নয়, এটি দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। এটি এমন এক নীরব যাত্রা, যেখানে গভীর মনোযোগই সঙ্গী।
রায়হান এখনো পথের শুরুতে। সামনে দীর্ঘ পথ। কিন্তু সে অন্তত জানে, কারাগারের দরজা কোথায় ছিল এবং কীভাবে তা খুলতে হয়। ডিজিটাল হাতকড়া এখনো তার পকেটে আছে, কিন্তু সেটি আর তাকে বেঁধে রাখে না। কারণ সে বুঝেছে, আসল বন্দিশালা বাইরে নয়, নিজের অভ্যাসের ভেতর। আর অভ্যাস বদলাতে পারলেই মুক্তি সম্ভব।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

কোটি কোটি তরুণের সেই অদৃশ্য লড়াইকে মূর্ত করেছেন, যা প্রতিমুহূর্তে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে হেরে যাচ্ছে।