-
গোপন দাতার চিঠি
মোহাম্মদ শাহজামান শুভতিতাস উপজেলার শাহাবৃদ্ধি গ্রামে রমজানের শেষ দশক মানেই এক ধরনের অদৃশ্য ব্যস্ততা। মসজিদে ইতেকাফ, বাজারে কেনাকাটা, ঘরে ঘরে যাকাত হিসাবের খাতা খুলে বসা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই গ্রামে ঈদের আগে আরেকটি ঘটনা ঘটে—যা নিয়ে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলে না, তবু সবাই জানে। দরিদ্র কয়েকটি পরিবারের দরজার ফাঁকে, কখনও জানালার পাশে, কখনও বালিশের নিচে একটি সাদা খাম পাওয়া যায়। খামের ভেতরে কিছু টাকা, আর একটি ছোট কাগজে মাত্র তিনটি শব্দ—
“সমান হয়ে বাঁচি।”
প্রথম বছর ঘটনাটি ঘটেছিল হালিমা বেগমের বাড়িতে। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে তার জীবন ছিল টানাপোড়েনের। রমজানের শেষে যখন চাল-ডাল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, তখন এক ভোরে দরজার কাছে পড়ে থাকা খামটি তিনি দেখতে পান। ভেবেছিলেন ভুল করে কেউ রেখে গেছে। খুলে দেখলেন, প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা। আর সেই চারটি শব্দ। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আল্লাহ, কে এই মানুষ?”
পরের বছর একইভাবে খাম পাওয়া গেল মজিবর আলীর বাড়িতে—একজন ভ্যানচালক, যিনি অসুস্থ হয়ে কাজ হারিয়েছিলেন। তারপর আরেক বছর রিকশাচালক নুরুল, তারপর স্কুলপড়ুয়া এতিম রাফির পরিবার। কারও বাড়িতে কখনও কাউকে আসতে দেখা যায়নি। কেউ জানে না, এই দাতা কে।
গ্রামে নানা গুঞ্জন ছড়ায়। কেউ বলে, হয়তো বিদেশফেরত কোনো প্রবাসী। কেউ বলে, বাজারের কোনো বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারে না। কারণ দাতার পরিচয় গোপন রাখাই যেন ছিল তাঁর শর্ত।
ঈদের আগের এক সন্ধ্যায়, মসজিদের ইমাম খুতবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর হাতেও একটি খাম পৌঁছায়। ভেতরে লেখা—“এই অর্থ দিয়ে ফিতরা ও যাকাত বণ্টনে কাউকে ছোট করবেন না। নাম প্রকাশ করবেন না। শুধু বলবেন—সমান হয়ে বাঁচি।”
ইমাম সাহেব পরদিন খুতবায় বললেন, “দান তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে। যে দান মানুষের মাথা নত করে, তা দান নয়; আর যে দান মানুষের চোখে জল এনে বলে—‘তুমি আমার সমান’—সেই দানই প্রকৃত যাকাত।”
এই চারটি শব্দ ধীরে ধীরে গ্রামের ভেতরে অন্যরকম আলো জ্বালাতে শুরু করল। আগে যাকাত বণ্টনের সময় তালিকা ঝোলানো হতো, কে কত পেল তা প্রকাশ পেত। অনেকে লজ্জায় নিতে চাইত না। কিন্তু এখন পদ্ধতি বদলালো। গোপনে, সম্মান রক্ষা করে, প্রয়োজন বুঝে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া শুরু হলো।
হালিমা বেগম একদিন বলেছিলেন, “যে-ই হোক, সে আমাকে ভিক্ষুক বানায়নি। সে আমাকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিয়েছে।”
গ্রামের এক প্রান্তে বসে থাকা বৃদ্ধ শিক্ষক আবদুস সাত্তার মন্তব্য করেছিলেন, “সমাজে বৈষম্য থাকবেই। কিন্তু সাম্য প্রতিষ্ঠা হয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই চারটি শব্দ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে।”
এক বছর ঈদের সকালে অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটল। নামাজ শেষে দেখা গেল, কয়েকজন তরুণ নিজেরাই কয়েকটি খাম প্রস্তুত করে রেখেছে। তারাও লিখেছে—“সমান হয়ে বাঁচি।” তারা বলল, “আমরা জানি না প্রথম মানুষটি কে। কিন্তু তাঁর পথ অনুসরণ করতে পারি।”
এভাবে একটি অদৃশ্য স্রোত তৈরি হলো। দান আর প্রদর্শনের বিষয় রইল না; হয়ে উঠল দায়িত্ব ও অংশীদারত্বের বিষয়। কেউ কারও প্রতি করুণা দেখাল না; বরং মনে করল—এটি আমার ভাইয়ের হক।
একদিন সন্ধ্যায় বাজারের কোণে চা খেতে খেতে কয়েকজন আলোচনা করছিল—“দাতা যদি প্রকাশ হতো, তাকে সম্মাননা দেওয়া যেত।” পাশের বেঞ্চে বসা এক বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তিনি সম্মান চান না বলেই তো তাঁর দান পূর্ণ।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খামের সংখ্যা বাড়ল, কিন্তু দাতার পরিচয় অজানাই রইল। হয়তো তিনি একক নন; হয়তো তিনি একটি চেতনা। সেই চেতনা বলছে—দান মানে দয়ার দৃষ্টি নয়; বরং অধিকার স্বীকার করা।
ঈদের দিন বিকেলে, শিশুরা যখন নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ায়, তখন অনেক ঘরেই নীরবে উচ্চারিত হয় একটি বাক্য—“সমান হয়ে বাঁচি।” এটি আর শুধু কাগজের লেখা নয়; এটি হয়ে উঠেছে শাহাবৃদ্ধি গ্রামের নৈতিক শপথ।
কেউ জানে না, প্রথম খামটি কে রেখেছিল। হয়তো কোনো সচ্ছল ব্যবসায়ী, হয়তো কোনো প্রবাসী, হয়তো এমন কেউ, যার নিজের শৈশব কেটেছে অভাবের ভেতর। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তাঁর বার্তা।
কারণ, সমাজে সাম্য আইন দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা জন্ম নেয় বিবেক থেকে। আর সেই বিবেকের কণ্ঠস্বর কখনও কখনও শব্দেই যথেষ্ট—“সমান হয়ে বাঁচি।”1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe



তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 18 March 2026 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!