Profile Photo

নিলয় বর্মণOffline

  • Profile picture of নিলয় বর্মণ

    নিলয় বর্মণ

    2 months, 1 week ago

    “বিসর্জন”

    আজকের দিনটি অন্যান্য দিনের চাইতে একটু আলাদা। চারদিকে যেন কোলাহল উৎসবের আমেজ। এই দিনে খোকা বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে অষ্টম শ্রেণী হতে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। খোকা যে একটু বেশি আনন্দিত আজকের এই দিনে। আজকের দিনে খোকার বাবা খোকাকে বুকে টেনে নিল! আনন্দে তার চোখ জোড়া দিয়ে অশ্রুধারা ফুটে এল।

    বাড়ির লোকজন যতটা না বেশি অবাক হয়েছিল তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল খোকা নিজে। কারণ আর কেউ জানুক আর নাই জানুক অন্তত খোকা জানত তার বাবা কতটা গম্ভীর মানুষ ছিলেন! কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা হলে খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিত খোকার বাবা। যদিও মাঝে মাঝে হয়তোবা পছন্দের জিনিসটা চাওয়া মাত্রই পাওয়া যেত। তাই খোকার বাবার এই আকস্মিক অতি আনন্দ অনেক বেশি অবাক করে তুলল খোকাকে!

    ​মিষ্টি কিনতে হবে না! খোকার বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে ইন্দ্র ঘোষের দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আনলেন। খোকার যে কী আনন্দ! খোকার হাতে মিষ্টির ঠোঙ্গা দিতেই আমাদের সবাইকে মিষ্টি মুখ করালো হাসি মুখে। সত্য কথা বলতে খোকার সেই বিষাদহীন হাসি, তার আনন্দিত মুখের হাসিটি এখনো আমার মনে পড়ে। সেই হাসিতে ছিল না কোনো রাগ, কোনো হিংসা, কোনো বিদ্বেষ; ছিল শুধুই আকুলতা, আপন করে নেওয়ার আকুলতা।

    ​খোকা যখন পড়াশোনার জন্য বাইরে বোর্ডিং স্কুলে থাকবে তখন খোকার মা বুক পাথর বেঁধে চোখের জল ফেলা বন্ধ করেছিল। খোকার বাবা ও মা দুইজনেই খোকার ভবিষ্যৎ চিন্তা করলেও দুজনের চরিত্র ছিল একজনের আরেকজনের বিপরীত। তাই খোকার বাবার মনে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো না। একেবারে যেন বিপরীত চরিত্র নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল খোকার মা ও বাবা।

    খোকার কথা আর কী বলব! একেবারে যেন লাজুক ছেলে। লজ্জায় যেন মুখ লাল হয়ে থাকত। তাই অসম্ভব বিনয়ী ছিল। খোকার বাবা যখন বাড়ির বাইরে থাকত খোকা তখন কী যে আলাপ জুড়াতো তার কোনো ইয়ত্তা নেই! বাবা বাড়িতে থাকলে খোকা তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে কথা বলার-ই সাহস পেত না।

    ​একদিন হলো কী! খোকার বাবা খবর পেল খোকা প্রচণ্ড অসুস্থ। সাথে সাথে খবর পেয়ে সে ছুটে গেল বোর্ডিং থেকে খোকাকে বাড়িতে আনতে। খোকা তখন সবেমাত্র মাস দুয়েক হয়েছে বাড়ি ছেড়েছে। সে এক অলক্ষুণে ব্যাপার! হঠাৎ করে দেখি খোকার বাবা খোকাকে বাড়িতে নিয়ে উপস্থিত।

    খোকা আসবে সে কথা জানলে কত প্রস্তুতি নিয়ে থাকতাম! যাক সেই কথা। খোকা আসলো ঠিকই কিন্তু সেই প্রাণচঞ্চলতা খোকার মাঝে খুঁজে পেলাম না। তার মায়ের মনে ব্যথার বিন বেজে উঠলো। তাই খোকার মা তার স্বামীকে খোকার খোঁজ জিজ্ঞেস করল। কেউ কোনো উত্তর দিল না। খোকার মলিন মুখখানি দেখে খোকার অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে বাকি রইল না খোকার মায়ের!

    ​বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা সেই দৃশ্যটি যেন আজও আমার চোখে ভাসে। মা-ছেলের ভালোবাসার সেই মুহূর্তটি আজও আমার মনকে নাড়া দেয়। ভুলতে পারিনা কিছুতেই! খোকার এই অবস্থা দেখে আমি নিজেও ঠিক থাকতে পারলাম না। সাথে সাথে দৌড়ে গেলাম ঘরের দিকে! খোকাকে মাটির ঘরে মাদুর পেতে শুইয়ে দিলাম। খোকার মা খোকাকে অনেকদিন পর কাছে পেয়ে আনন্দে কপালে চুমু খেল। আমি বসে খোকাকে বাতাস দিতে লাগলাম। খোকাকে খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হলো। খোকা যেন আমাদের কাছে খোকাই ছিল। রাতের বেলা খোকার জ্বর বাড়লে ঘরটি অদ্ভূত এক নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল।

    ​সুস্থ হয়ে উঠলে খোকার আর বোর্ডিং-এ যাওয়া হলো না। যে ছেলে দু’মাসের ব্যবধানে শরীরের যত্ন নিতে পারে না, শরীরকে অসুস্থ করে ফেলে সে কীভাবে দু’বছর ওখানে রয়ে ম্যাট্রিক পাস দেবে! পড়াশোনা করবে! এটা ছিল খোকার মায়ের কথা। কথাগুলো বলতে বলতে খোকার মা ঝরঝর করে কান্না শুরু করল। আমি আর বাদ যাই কেন— আমিও কান্না জুড়ে দিলাম।

    বললাম, খোকাকে বোর্ডিং-এ নিয়ে যেতে হলে আমার আর খোকার মায়ের লাশের ওপর দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কথাটি শুনে খোকার বাবা তার স্ত্রী ও গৃহকর্ত্রী বৃদ্ধা মায়ের মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। সেই চোখে কিন্তু নিষ্ঠুরতা ছিল না! ছিল এক আকস্মিক আকুলতা। যে আকুলতা প্রতিকার হয়েই পিতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিল।

    ​সুস্থ হয়ে খোকা অনেক বেশি আনন্দিত হয়েছিল। সেই আনন্দই জাগিয়ে তুলেছিল সারা বাড়িতে। খোকার বাবাও যে সামান্য খুশি হয়েছিল তার প্রমাণ মিলল খোকাকে নিজের অগোচরে কাছে টেনে নিয়ে। তারপর অনেকদিন পর খোকাকে কাছে পেলাম। কাছে পেয়েই খোকাকে নিয়ে কাউকে না বলে পাশের দোকানে গেলাম।

    খোকাকে জিলিপি কিনে দিতেই দেখলাম খোকা পাশে নেই। এদিক সেদিক খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম জুলুম বীরের মতো পিছন দিক থেকে খোকার লাল রঙের শার্টটি চোখে পড়ল। আমি দৌড়ে গিয়ে খোকাকে জাপটে ধরলাম!
    খোকা বলল, ভয় পেয়ো না! খোকাকে ফেরাতে পারলাম না। ধীরে ধীরে মিছিল বাড়তে লাগল।

    ​মিছিল যেতে লাগল। বীরের মতো অংশগ্রহণকারী সবাই কী যেন একটা স্লোগান দিয়ে মিছিল করছিল। খোকাও মিছিলে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল। দূর থেকে তা শুনতে পেলাম না। মিছিল নিঃশব্দে এত শব্দ বাজল! খোকার জন্য সারাদিন পথ চেয়ে অপেক্ষা করলাম। খোকা আর ফিরে এল না! খোকার বাবাও খোকাকে শেষবারের মত খুঁজতে বের হলো। স্বামী-পুত্রের শোকে খোকার মা দিনের পর রাতের পর রাত অপেক্ষার প্রহর গুনা শেষে মুক্তি পেলেও বেঁচে রইলাম শুধু আমি!

    ​যে খোকাকে না দেখলে একমুহূর্তও শান্তিতে থাকতে পারতাম না, যাকে একমুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করলে খোকার মা-বাবাকে বকুনি দিতাম, সেই খোকাকে দীর্ঘদিনের মতো হারিয়ে কীভাবে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম! কোথায়, খোকার মা-বাবা ঠিকই তো খুব সহজে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিলেন। তাহলে খোকাকে কী আমি কম ভালোবাসতাম! কাকে বোঝাই আমিও যে আমার খোকাহারা!

    ​খোকার প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ধীরপায়ে শহীদ বেদীতে উঠলে, প্রিয় খোকাদের স্মৃতি কাতরতায় হাউমাউ করে কান্না জুড়লেন অশীতিপর সেই বৃদ্ধা। শরীরকাঁপানো কান্না! যে কান্না বৃদ্ধাকে মনে করিয়ে দেয় মহাকালের কথা, যে মহাকাল খোকাকে দিয়েছে ‘শহীদের’ আসন। আজ খোকা নেই, তবুও খোকা যেন আছে সবার মাঝে।

    তাই তো আজ খোকাকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজারো মানুষের ভিড়। যে কিনা লাখো মানুষের ভাষা কেড়ে নিতে দেয়নি। জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও রক্ষা করেছে। এই ভাষা আমাদের মায়ের ভাষা, প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। যে মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে আমার চোখের মণি খোকা!

    ​খোকার স্মৃতি মনে করতেই গর্বে বুকটা ভরে উঠলেও আকস্মিক বিষাদ আর শূন্যতাও গ্রাস করতে লাগল সেই শ্বেতকেশীধারিনী বৃদ্ধার মন। সেই বিষাদময় শুন্যতার শব্দ হয়তো কেউ শুনবে না বা শুনতে চাইবে না! নিজেকেই বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে বৃদ্ধাকে আমৃত্যু!

    4
    2 Comments
    • আপনি অত্যন্ত নিপুণভাবে একজন অশীতিপর বৃদ্ধার স্মৃতির জানালা দিয়ে আমাদের নিয়ে গেছেন ১৯৫২-র সেই উত্তাল দিনগুলোতে

    • গল্পটি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মাতৃত্ব, পিতৃত্ব এবং দেশপ্রেমের এক হৃদয়স্পর্শী আখ্যান। অতি সাধারণ ‘খোকা’র বীরোচিত ‘শহীদ’ হয়ে ওঠার বিবর্তনটি আপনি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত শোক ছাপিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা বড় হয়ে উঠেছে। শেষ পরিণতির সেই নিঃশব্দ হাহাকার এবং অশীতিপর বৃদ্ধার গর্বমিশ্রিত শূন্যতা পাঠককে ইতিহাসের এক জীবন্ত ও অশ্রুসিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে।

Skip to toolbar