Profile Photo

Rodoranjana Binte AnamikaOffline

  • rodoranjanabinteanamika
  • Profile picture of Rodoranjana Binte Anamika

    Rodoranjana Binte Anamika

    2 months ago

    অঙ্গীকারহীন কুৎসা
    লেখিকা : রোদরঞ্জনা বিন্তে অনামিকা

    পর্ব – ১ (খন্ডা অংশ )

    যদি তাকে ভালবাসত, তবে আঘাত করতে পারত না।
    অভিমানে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। টু শব্দও করে না।
    এ পর্যায়ে মনের দুঃখগুলো অশ্রু আকারে ঝরে যেতে লাগলো।
    ততক্ষণে বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকায় প্রেম।
    বলিষ্ঠ ও শক্তপোক্ত দুই হাতে মেয়ের চোখের পানি মুছে দেয়।
    উঠে গিয়ে মেয়েকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে।
    নরম সুরে বলে,
    “বাবাই সরি, আমি বুঝতে পারিনি। প্রচুর রাগ হয়ে গিয়েছিল। বাবাকে কি ক্ষমা করবে? না, আমার উচিত ছিল ঠান্ডা মাথায় তোমাকে বোঝানো।
    এখন আমি যদি তোমার জন্মদাত্রীকে নিয়ে ব্যাট কমেন্ট করি, তোমার কেমন লাগবে?
    নিশ্চয়ই প্রচুর খারাপ লাগবে। আমারও তখন অনেক খারাপ লেগেছিল।
    সে শুধু আমার জন্মদাত্রী নয়, আমার পথপ্রদর্শক।
    তুমি হয়তো বুঝবে না, কারণ আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাতে পারিনি।
    আমি বাপ হিসেবে ব্যর্থ। আমি জানি না কিভাবে আমার ভুল সংশোধন করতে হবে এই মুহূর্তে।
    কিন্তু যদি Mom থাকতো, হয়তো আজ আমি একজন ভালো বাবা হতে পারতাম।
    আমি জানি না তুমি তার সম্পর্কে এত বাজে কথা কোথা থেকে জেনেছ।
    কিন্তু সে আসলে তোমার জানা মতে নয়।”
    প্রেম বুঝতে পারছে না সে তার মেয়েকে কিভাবে বোঝাবে।
    এ পর্যায়ে তার মনে পড়ল—সে যখন তার মায়ের উপর অভিমান করত, তখন তার মা তার মাথার চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিত, কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতো, নিজের হাতের মজার মজার খাবার বানিয়ে খাওয়াত।
    সেইভাবেই মেয়েকে মানানোর সিদ্ধান্ত নিল।
    মেয়েকে কোলে তুলে নিল প্রেম।
    এবার লক্ষ্য করল, মেয়েটা খুবই ছোট।
    এটা কেন? সে তো এই বয়সে অনেক লম্বা ছিল।
    শুধু তাই না, তার স্ত্রীও প্রচুর লম্বা।
    মেয়ে এতটা শর্ট কিভাবে?
    কিন্তু বিষয়টিকে অত পাত্তা দিল না।
    মেয়েকে কাছে টেনে নিল নিজের কোলের ওপর বসিয়ে।
    চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিল। কপালে পরপর চুমু খেল।
    নরম সুরে বলল,
    “আমার আম্মু এখন আমার ওপর মন খারাপ করে থাকবে।
    তোমার জন্য আমি নতুন নতুন চকলেট নিয়ে আসব।
    তুমি জানো, আমি একটা স্পেশাল রেসিপি জানি।
    তোমার অনেক পছন্দ হবে, তোমাকে বানিয়ে খাওয়াবো।
    আর কালকে সম্ভবত বিকেলের দিকে মেলা বসবে।
    সেখানে তোমাকে নিয়ে যাব আমার সাথে।”
    কথাগুলো বলে , প্রেম আবার আদরে সুরে বলল তুমি না আমার মিষ্টি মামনি বাবা তোমাকে কত ভালবাসি তোমায় বাবার উপর এভাবে অভিমান করে থাকবে চলো আমরা ঘুরে আসি তুমি জানো আমি যখন মন খারাপ করে থাকতাম আমার mom আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হতো রাতের বেলা হাটা কতটা স্বস্তিদায়ক তুমি জানো চলো তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।
    প্রেমীর ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।

    _ও..ও…ও
    ও আমার আদুরে বাচ্চাটা এভাবে কাঁদে কেন? খুব ব্যাথা লেগেছে বুঝি দেখি, কোথায় ব্যাথা লেগেছে কথাটি বলেই প্রেম প্রেমির থাপ্পর পড়া গালে ঠোট ছোঁয়ায় ।

    প্রেমে আদুরে আহ্লাদ ে হাত পা ছুড়তে থাকে প্রেমী কাঁদতে কাঁদতে বলে, _ যাবো না তোমার সাথে কোথাও যাবো না তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না, তুমি আমাকে মেরেছ যখনই আসে তখনই একটু আমাকে সময় দিতে চায় না ।সারাক্ষণ কাজ করে । তুমি চলে যাও, আমার রাগ তোমার ভাঙাতে হবে না তুমি তোমার কাজের জায়গা চলে যাও ,থাকতে হবে না আমার কাছে । তোমরা কেউই আমাকে ভালোবাসো না কেউ না চাচ্চু ও ভালোবাসে না চাচী মনিও ভালোবাসে না অহিন আমার সাথে কেমন কেমন করে ও আমাকে পছন্দ করে না ।তোমার বউ আমাকে আদর করে না ও তো একটা রাক্ষসী ও তোমার সংসার ভেঙেছে ওর ভালোবাসা আমার চাই না ,ওর জন্য আমার বড়মা কত কষ্ট পেয়েছে । তুমিও চলে যাও তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
    আমার রাগ কখনো ভাঙবে না। আমাকে কাছে থাকতে হবেনা।”
    রাগ করলে যদি তুমি এভাবে রাগ ভাঙিয়ে আমার কাছে থাকো, তবে আমি অধীরনা জায়নাব প্রেমী আজীবন রাগ করে থাকতে প্রস্তুত।

    প্রেম শান্ত দৃষ্টি দিয়ে তার মেয়ের দিকে তাকায়।
    নরম সুরে বলে,_
    “কাজ তো করতে হবে, সোনা। তোমাকে সময় দিব।
    কিন্তু বোঝার চেষ্টা করো—কাজ না করলে খাওয়াবো কী?” বাকি কথা বলার আগে ,
    প্রেমী এবার ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকায়।
    হিসহিসিয়ে বলে,_
    “একটু আগে না, নিজের মায়ের সম্পর্কে বড়াই করছিলে?
    তাহলে নিজের ছেলে সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে খাবে, এমন উপার্জন রেখে যায়নি।”
    প্রেম ঠোঁট টিপে হাসে,
    “বাপ্পা, এত বড় বড় কথা বলতে শিখে গেছো।”
    প্রেমী তখনও প্রেমের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
    প্রেম তার মেয়ের মাথা নিজের বুকে রেখে হাত তার মাথায় বুলিয়ে দেয়।
    নরম গলায় বলে,
    _“আমি তো কখনো জানতামই না আমার আম্মা এত রাগ করতে পারে। এ আল্লাহ, আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছি।

    প্রেমী এখন শান্ত হয়েছে প্রেমের বুকে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে । প্রেম ততক্ষনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে ।

    কিছু মুহূর্ত সম্মুখের দৃশ্যটা নিজের চোখের কুঠুরিতে বন্দি করে রাখার চেষ্টা করল প্রেম। সামনে যে দৃশ্যটা ছড়িয়ে আছে, সত্যিই তা বড় সুমধুর। মনে প্রশ্ন জাগে—এমন একটা জায়গা এই যান্ত্রিক শহরে কীভাবে রয়ে গেল?
    ঢাকা শহর মানেই কোলাহল, ট্রাফিকের ঝঞ্ঝাট, মানুষের অবিরাম ছুটে চলা। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও একটি জায়গা আছে যেখানে এসে যেন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যায়। প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া যায়। সেই জায়গাটার নাম হাতিরঝিল।
    শহরের এত যান্ত্রিকতার ভেতর এই জায়গাটা যেন একটু আলাদা। এখানে দাঁড়ালে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করে। তাই হয়তো এই স্থানটাকে একটু দার্শনিকও মনে হয়—যেন শহরের কোলাহল পেরিয়ে মানুষের মনকে একটু থামতে শেখায়।
    প্রেম নিঃশব্দে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। নদীর দুই ধারে দাঁড়িয়ে আছে দুটো বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ। তাদের ছায়া হালকা করে পড়েছে জলের ওপর। প্রেম এসে দাঁড়াল নদীর পাড়ে, কৃষ্ণচূড়ার গাছ দুটির মাঝখানে।
    প্রেমী ধীরে ধীরে চোখ মুছে নিল। তারপর মাথাটা এনে রাখল প্রেমের কাঁধে।
    আকাশে তখন এক ফালি বড় সোনালি চাঁদ উঠেছে। চারপাশে তার নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটা সত্যিই সুন্দর।
    এতক্ষণ বাবার বুকে মুখ গুঁজে থাকায় এত কিছু খেয়াল করেনি সে। এবার যখন ধীরে ধীরে মাথা তুলল, সামনে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। মুখে কোনো কথা নেই।
    থাকবেই বা কীভাবে? কথা তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে তার।
    এত সুন্দর আবহাওয়া, এত শান্ত দৃশ্য—এর আগে কখনো সে ঠিক এভাবে উপভোগ করেনি। সারাক্ষণ ফ্ল্যাটের ভেতরে থাকতে থাকতে বাইরের পৃথিবীটা যেন অচেনাই থেকে গেছে। তেমন বন্ধু নেই, কোথাও ঘোরাঘুরিও হয়নি। বাবা-মাকেও কাছে খুব বেশি পাওয়া হয়নি কখনো।
    তাই এইসব নতুন দৃশ্য তার কাছে যেন একেবারেই অন্যরকম।
    অবাক হয়ে চারপাশটা দেখছে সে। ধীরে ধীরে সেই অবাক হওয়ার মধ্যেই ডুবে যাচ্ছে।
    হঠাৎ সামনে থাকা ব্রিজটার দিকে আঙুল তুলে বলল—
    —ওদিকে যাব, বাবাই।
    প্রেম একবার তার দিকে তাকাল, তারপর মৃদু হাসল।
    কোনো কথা না বলে সে সেই দিকেই হাঁটা ধরল।

    প্রেম তার মেয়েকে ব্রিজের ল্যান্ডিংয়ের ওপর আলতো করে বসিয়ে দিল। তারপর তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
    —আমার সোনামনি কি এখনো রেগে আছে?
    মেয়েটি তখনো বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ছিল। ধীরে ধীরে মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর একটু ঝুঁকে বাবার গালে আলতো করে একটা চুমু দিল।
    নরম স্বরে বলল—
    —একটুও না… তুমি বলো, তুমি আমায় ফেলে আর যাবে না? তুমি আমাকে ভালোবাসো… তাই না, বাবা?
    প্রেম কিছুক্ষণ চুপ করে নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে যেন অনেক কথা জমে আছে, কিন্তু মুখে আসছে না। মনে প্রশ্ন জাগল—এত কথা সে শিখল কোথা থেকে?
    একটু ভাবুক হয়ে পড়ল প্রেম। বাক্যগুলোর রেশ যেন অদ্ভুতভাবে চেনা লাগছে তার।
    হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা।
    তার mom একদিন বলেছিল—
    “তুমি তোমার ভালোবাসা অকপটে স্বীকার করো না। কিন্তু মনে রেখো, একদিন তোমাকে তোমার ভালোবাসা অকপটে স্বীকার করতেই হবে।”
    সেই কথাটা যেন আবার কানে ভেসে উঠল।
    ভাবনার ভেতর ডুবে ছিল প্রেম। হঠাৎ মেয়ের কণ্ঠ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল—
    —বাবা… বলো না…
    প্রেম ধীরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
    —হুম… বাসি তো।
    —তবে অবসানপ্রাপ্ত সূর্যের ন্যায়।
    মেয়েটি আবার বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। বাবার কথার গভীর অর্থ বোঝার মতো বয়স এখনো তার হয়নি। “অবসানপ্রাপ্ত সূর্যের ন্যায়”—এই কথার অর্থ উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
    তাই সে কিছুই বলল না। শুধু চুপ করে বাবার বুকে মাথা রেখে রইল। কতক্ষণ চুপ থেকে মাথা তুলে আনম মনে হয় বলল;

    —আচ্ছা বাবাই… তোমার mom ওই রকম অদ্ভুত, বিটকুটে কথাগুলো কেন লিখেছিল?
    একটু থামল সে। যেন ঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
    তারপর আবার বলল—
    —কেন জানি, ওই কথাগুলো মনে পড়লেই আমার ভেতরটা কেমন হাঁসফাঁস করে ওঠে… মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। এমন কেন হয়, বাবাই?
    প্রেম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল—
    —তার তখন ঐরকমই অসহায় লাগত। যদিও সেই অসহায়তার মাঝেই সে যেন একরকম প্রশান্তি খুঁজে পেত… আর সেই কারণেই হয়তো লিখেছিল।
    মেয়েটি সাথে সাথে মুখ কুঁচকে বলল—
    —ছি! ওসব কি বুঝি প্রশান্তি বলে?
    একটু থেমে আবার বলল—
    —আমার না কথাগুলো এখনো ভুলতে পারছি না… বারবার মাথার মধ্যে ঘুরছে।
    মেয়ের কথা শুনে প্রেম মৃদু স্বরে বলল—
    —তবে বলে ফেলো। বললে হয়তো একটু হালকা লাগবে।
    মেয়েটি একটু চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। যেন মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
    এরপর ধীরে ধীরে বলা শুরু করল_
    **“বদ্ধ ঘরের আলো-আঁধারের খেলাটা এক অন্যরকম শান্তির… তাই না?
    আলোর সঙ্গে অস্পষ্ট ছায়ার যে মিশ্রণ, তা হয়তো অবর্ণনীয়।
    ছাইরঙা আলোর মিশেলে যেন এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়।
    সেই নিঃশব্দ আলোচারণে যেন একটা গভীর সুর বাজে—
    যেটা আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে।
    এই নিঃসঙ্গ পরিবেশে মাঝে মাঝে মনে হয়,
    অজানা খেয়ালী তোমায় বলছি এলোমেলো খেয়ালগুলো।
    যেগুলো অদেখা, অজানা—
    সেগুলো কেন হারিয়ে দাও আমার অস্পষ্টতায়?
    তবে কি তাদের ধরা উচিত?
    নাকি ছেড়ে দেওয়া উচিত?
    এই খেয়ালগুলো নিয়েই তো এত ভাবনা, এত বিশ্লেষণ…
    তবে কি এই ভাবনাগুলোর কোনো পরিণতি আছে?
    মনে হয়—নেই।
    তাই তো সবাই আমাকে ‘মজার পাত্র’ ভেবে হেসে উড়িয়ে দেয়।
    কিন্তু না—আমি কোনো মজা নই।
    আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকি নিজের রুমের পর্দার দিকে।
    রুমটা খুব ছোট—একটা বড় খাট, এক পাশে পড়ার টেবিল, আরেক পাশে ড্রেসিং টেবিল।
    এই তিনটি আসবাবেই গঠিত আমার ছোট্ট জগৎ।
    এতটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট।
    সারাদিন একা থাকতে থাকতে একাকীত্বটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে আমার কাছে।
    এই মুহূর্তে মনে কোনো চিন্তা নেই—
    শুধু একরাশ শূন্যতা ধীরে ধীরে জমে আছে বুকের ভেতর।
    …আমি কতটা পাগল হলে, নিজের অতীতকে কল্পনা করে লিখে ফেলি।
    বোকা আমি…
    কবে যে এই কল্পনার জগৎ থেকে মুক্তি পাব…”**
    কথাগুলো বলার পর মেয়েটি চুপ করে গেল। যেন শেষ শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের সবটুকু ভারও বেরিয়ে গেছে।
    নদীর ধারে আবার নীরবতা নেমে এল। শুধু দূরে জলের হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে।
    প্রেম স্থির হয়ে বসে রইল—চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছে বহুদিন আগের সেই মানুষটা।

    ——-

    এইমাত্র বাড়িতে ফিরেছে প্রেম ও প্রেমী। ভোরের কাঁটা তখন চারটা ছুঁইছুঁই। আকাশে ফিকে আলো উঠতে শুরু করেছে।
    মেয়েকে নিয়ে রুমে ঢুকতে যাবে—ঠিক তখনই পেছন থেকে প্রার্থী বলে উঠল—
    —মেয়ের মান ভাঙাবেন বললেই তো হতো। আমাকে আলাদা থাকতে কেন বললেন? ওর সঙ্গে থাকার অধিকার কি আমার নেই? ও কি আমার অংশ নয়?
    প্রেম কিছু বলার আগেই প্রেমী খেঁকিয়ে উঠল—
    —একদম মাঝে আসবি না, রাক্ষসী! তুই আমার বাবার সংসার খেয়েছিস। তোর জন্য আমার বড় মা অনেক কষ্ট পেয়েছে। লজ্জা করে না, বিবাহিত পুরুষকে ফুসলাতে?
    প্রেমী আর কিছু বলার আগেই প্রেম তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরল।
    ক্ষীণ স্বরে বলল—
    —থাম আমার মা থাম, যেটা জানিস না সেটা নিয়ে কেন কথা বলিস? দিলি তো পাগল ক্ষেপিয়ে…
    কথা শেষ করে সামনে তাকাতেই দেখে—পার্থী আর সেখানে নেই।

    ——

    বিকেল সাড়ে চারটা।
    মেলার গেটের কাছে এসে দাঁড়াতেই চারপাশের হট্টগোল তাদের কানে এসে বিধল।
    মাইকে ভেসে আসছে কোনো অচেনা গানের সুর; সাথে সাথে শিশুদের হাসি, বেলুনওয়ালার ডাক, খেলনার টুংটাং শব্দ।
    প্রেম এক মুহূর্ত থেমে যায়—হাতের মুঠোয় প্রেমীর ছোট্ট হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।
    প্রেমী প্রথমে চোখ নামিয়ে রাখে।
    রাগটা এখনো বুকের ভেতর গুটিশুটি হয়ে বসে আছে।
    কিন্তু মেলার ভেতর ঢুকতেই তার চোখ দুটো আপনাআপনি উঁচু হয়ে যায়।
    রঙিন কাগজের পতাকা বাতাসে উড়ছে।
    কাঁচের ভিতর সাজানো খেলনা পুতুল, বাঁশির দোকান, চুড়ির ঝনঝন শব্দ—সবকিছু একসাথে চোখে পড়ে।
    হঠাৎ প্রেমী থেমে যায়।
    একজন লোক বাতাসে সাবানের ফেনা ছুড়ে দিচ্ছে।
    ফেনার ভেতর রঙধনু।
    প্রেমী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
    প্রেম কিছু না বলে টিকিট কিনে দেয়।
    লোকটা ফুঁ দিতেই চারদিকে ছোট ছোট ফেনার গোলা উড়ে যায়।
    প্রেমী একটাকে ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।
    দ্বিতীয়বার ধরতে গিয়ে হেসে ফেলে।
    এই হাসিটা অজান্তেই প্রেমের চোখে পড়ে যায়।
    আরেকটু এগোতেই বেলুনের দোকান।
    লাল, নীল, হলুদ, কার্টুন আঁকা।
    — কোনটা?
    প্রেমী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
    — ওই লালটা… ছোটটা।
    প্রেম নিজে হাতে বেলুনটা বেঁধে দেয়।
    সুতোয় গিঁট দিতে গিয়ে আঙুল ছুঁয়ে যায়।
    প্রেমী এবার হাতটা সরায় না।
    চলতে চলতে নাগরদোলার সামনে আসে তারা।
    লোহার দোলটা উঠছে, নামছে।
    হাওয়ায় চুল উড়ছে; মানুষের চিৎকারে মেলা গমগম করছে।
    প্রেমী তাকিয়ে থাকে।
    চোখে ভয়, মুখে কৌতূহল।
    — ভয় পাচ্ছিস?
    প্রেমী মাথা নাড়ে।
    কিন্তু জামার কোণটা শক্ত করে ধরে।
    দোলায় উঠে পড়ে তারা।
    দোল ওঠার সাথে সাথে প্রেমীর হাত কাঁপে।
    প্রেম হাতটা ঢেকে রাখে—একদম শক্ত করে নয়, শুধু উপস্থিতির মতো।
    নামার পর প্রেমের মুখটা উচ্ছ্বাসে, উৎফুল্লতায় পরিপূর্ণ ছিল।
    — আরেকবার?
    প্রেম হালকা হেসে বলে,
    — পরে।
    এরপর ফুচকার দোকান।
    ঝাল–মিষ্টির গন্ধে বাতাস ভারী।
    প্রেম নিজের হাতে ফুচকা বানাতে বলে।
    প্রেমীর জন্য কম ঝাল, একটু বেশি টক।
    প্রথম কামড়ে প্রেমীর চোখ কুঁচকে যায়।
    দ্বিতীয় কামড়ে সে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
    তৃতীয়টার সময় আর কিছু বলে না।
    পাশে একটা শুটিং গেম।
    টিনের বোতল সাজানো।
    প্রেম কয়েন দেয়।
    দুইটা বোতল ফেলে দেয়।
    দোকানদার একটা ছোট পুতুল এগিয়ে দেয়।
    প্রেম সেটা প্রেমীর হাতে দেয়।
    — এটা তো আমি চাইনি।
    — এখন চাইতে পারিস।
    প্রেমী পুতুলটা শক্ত করে ধরে।
    এবার প্রেম কোথা থেকে একটা বড়সড় পুতুল নিয়ে আসে।
    পুতুলটার উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি হবে মনে হয়।
    প্রেমী অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে পুতুলটার দিকে।
    অবাক সুরে বলে,
    — এটা?
    তার কথা কেড়ে নিয়ে প্রেম বলে,
    — বেশি ভাবতে হবে না। এটা তোমাকে ঘুষ দিলাম।
    প্রেমী গাল ফুলিয়ে বলে,
    — আমাকে তোমার ঘুষখোর মনে হয়? কোন আহ্লাদে আমাকে ঘুষ দিলে?
    — তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব জানিস?
    ওইখানে একটা মস্ত বড় পুতুল আছে, যেটা দেখলে তুই ওটা নিতে চাইবি।
    কিন্তু ওটা তো তোর জন্য না। আমি চাইলেও তোকে দিতে পারবো না।
    তাই এটা তোকে দিলাম। এবার এটা নিয়ে খুশি থাক।
    প্রেমের কথায় প্রেমীকে একটু উচ্ছ্বসিত দেখা গেল।
    নতুন জায়গায় যাবে বলে হয়তো মেয়েটা একটু খুশি।
    হাঁটতে হাঁটতে তারা মেলার একপাশে এসে বসে।
    সেখানে একটু ফাঁকা।
    আকাশে সূর্য ঢলে পড়ছে।
    চা আর বাদাম কিনে আনে প্রেম।
    প্রেমী প্রথমে না করে, পরে বাদাম নেয়।
    প্রেমী আর কথা বাড়ায় না।
    ধীরে ধীরে মাথাটা বাবার কাঁধে ঠেকিয়ে দেয়।
    সন্ধ্যার বাতাসে বেলুনটা দুলে ওঠে।
    প্রেম সুতোটা আবার ঠিক করে দেয়।
    মেলার বাতি একে একে জ্বলে ওঠে।
    রঙিন আলোয় প্রেমীর মুখটা অন্যরকম লাগে।
    এই প্রথমবার—
    প্রেমীর মনে হয়,
    এই মেলাটা শুধু ঘোরার না।
    এই মেলাটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।
    বাবাকে নিয়ে তার এমন স্মৃতি কি আগে কখনো ছিল?
    ছিল না।
    এই পনেরো বছরে তার বাবা তাকে একটুও সময় দেয়নি।
    অথচ কাল রাতের পর থেকে কতটা বদলে গিয়েছে তার বাবা।
    তাকে কতটা সময় দিচ্ছে, তাকে কতটা ভালোবাসছে।
    এটা তো তার প্রাপ্য ছিল।
    তবে এতদিন কেন তাকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে তার পরিবার?
    প্রেম একবার তাকায় আকাশকুসুম ভাবতে থাকা প্রেমীর পানে।
    এ মেয়েটা এত শর্ট—কই? সে ও তার স্ত্রী তো লম্বা। তবে কার বান পেয়েছে এই মেয়ে?
    ছোট্ট মেয়েটা আজ হাঁটু–সমান একটা টপ পড়েছে। তার ওপর জ্যাকেট, নিচে স্ট্রেট জিন্স আর স্নিকার্স।
    প্রেমীর চুলগুলো খোলা—কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া লম্বা চুলের দুই সাইডে দুটো ক্লিপ লাগানো। দেখতে বেশ মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে।
    পরমুহূর্তে আবার নিজের দিকে তাকায় সে—নিজে ব্ল্যাক টি–শার্টের ওপর জ্যাকেট পরেছে, স্ট্রেট প্যান্ট আর স্নিকার্স।
    তাদের পোশাকে মিল আছে।
    হাসি পেয়ে যায় প্রেমের।
    এমনটা তার মায়ের সাথেও হতো।
    ভাবতে ভাবতেই চোখ দুটো বুজে ফেলে সে।

    ——-
    — আমরা আবার কোথায় যাচ্ছি, বাবাই?
    — যে জায়গায় তোকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, ওইখানেই।
    — ওও…
    কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রেমী আবার বলে,
    — আচ্ছা বাবাই, তুমি ওই রাক্ষসীটার সাথে এত কথা বলো কেন? আর কিন্তু কথা বলবে না!
    প্রেম হালকা কড়া গলায় বলে,
    — এটা কেমন কথা? সে তোমার মা। তাকে একটু সম্মান দিতে শিখো।
    প্রেমী ঠোঁট ফুলিয়ে থাকে।
    প্রেম আবার বলতে শুরু করে,
    — এমনিতেই তোরা দু’জন মিলে কালকে আমাকে যা জ্বালিয়েছিস! এবার অন্তত আমাকে একটু ছাড়।
    একটু থেমে হেসে বলে,
    — নেহার তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেছিস । না হলে কি আর তোকে নিয়ে বের হতাম? তোরা দু’জন মিলে আমাকে জ্বালানোর জন্যই সব ফন্দি এঁটেছিস।
    প্রেমী মুখ ঘুরিয়ে ফেলে।
    প্রেম এবার একটু শান্ত গলায় বলে,
    — আমি হিংসা করেছি, মানছি। কিন্তু তোদের মতো করে না।
    তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
    — বল তো, আমি কাকে রেখে কাকে সামলাবো?
    কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে,
    — এখন বুঝতে পারছি, আমার মা কতটা অসহায় ছিল।

    _বাবাই

    _হুম… কি হল বল ওভাবে বেক্কলের মতো হাসছিস কেন বল ।

    _বাবাই

    _প্রেমী রাগ হচ্ছে কিন্তু হাসা বন্ধ করবে এবার।

    5
    4 Comments
    • ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মিলিয়ে একটা পরিপূর্ণ গল্প হয়ে উঠেছে… পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম!

      • আপনার অপেক্ষার অবসান ঘটতে আর মাত্র একদিনের অপেক্ষা ইনশাল্লাহ কালকের মধ্যে পেয়ে যাবেন 😭🫶🐦

    • খুবই ছিমছাম আর মায়াভরা বর্ণনা। আপনার লেখায় একটা অন্যরকম জাদু আছে। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

      • আপনি কি সত্যিই ধন্যবাদ , দোয়া করবেন যেন আমি এভাবেই আপনাদের মুগ্ধতার কারণ হয়ে থাকতে পারি ইনশাল্লাহ কালকের মধ্যে নতুন পর্ব পেয়ে যাবেন 😌🫶

Skip to toolbar