-
অন্যের আলো, নিজের নাম
কলেজের পুরোনো লাল ভবনটা দূর থেকে দেখলে মনে হতো, তার দেয়ালের ভেতর অসংখ্য গল্প জমে আছে। কেউ হয়তো প্রথম প্রেমের কথা লিখেছে বেঞ্চের কোণায়, কেউ আবার পরীক্ষার আগের রাতের আতঙ্ক জমা রেখেছে লাইব্রেরির ধুলোমাখা বইয়ের পাতায়। কিন্তু সেই কলেজের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিল তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত।
রাহাতকে সবাই চিনত একজন অসাধারণ লেখক হিসেবে। কলেজ ম্যাগাজিনে তার লেখা ছাপা হতো, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার বক্তব্যে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত বলতেন—এই ছেলেটার ভবিষ্যৎ অনেক বড়। রাহাত যখন ক্লাসে কোনো রচনা পড়ত, পুরো ক্লাস নিঃশব্দ হয়ে যেত। তার ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু গভীর; তার কথাগুলো যেন মানুষের মনের মধ্যে ঢুকে যেত।
রাহাত নিজেও এই প্রশংসা শুনতে ভালোবাসত। ধীরে ধীরে সে নিজের সম্পর্কে এমন একটা ধারণা তৈরি করেছিল যে, সে অন্যদের চেয়ে আলাদা, একটু বেশি প্রতিভাবান, একটু বেশি যোগ্য। কিন্তু তার এই সাফল্যের পেছনে একটা গোপন অন্ধকার ছিল, যেটা কেউ জানত না।
কলেজে একদিন ঘোষণা এলো—জাতীয় পর্যায়ের রচনা প্রতিযোগিতা হবে। বিষয়: “নৈতিকতা ও আধুনিক সমাজ”। বিজয়ীর জন্য বড় অঙ্কের বৃত্তি, সঙ্গে একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ। পুরো কলেজে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। সবাই জানত, রাহাতই হয়তো এবার জিতবে।
রাহাতও আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু যখন সে লেখার জন্য বসলো, তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। সাদা কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, মাথার ভেতর কোনো শব্দ নেই। একদিন গেল, দুইদিন গেল, তিনদিন গেল—কিছুই লিখতে পারল না।
এদিকে জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। কলেজে সবাই জিজ্ঞেস করছে, “রাহাত, লেখা শেষ?” সে শুধু হাসছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় বাড়ছে। সে ভাবছিল, যদি এবার সে ভালো করতে না পারে? যদি সবাই বুঝে যায়, সে আসলে এতটা প্রতিভাবান নয়?
এক রাতে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে সে একটি পুরোনো ব্লগে পৌঁছাল। সেখানে এক অচেনা লেখকের লেখা ছিল—“নৈতিকতার মৃত্যু ও মানুষের মুখোশ”। লেখাটা পড়ে রাহাত স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাষা, ভাব, বিশ্লেষণ—সবকিছু এত অসাধারণ যে তার মনে হলো, এটাই তো সে লিখতে চেয়েছিল।
প্রথমে সে শুধু অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা ভাবল। তারপর কয়েকটি লাইন কপি করল। পরে ভাবল, কয়েকটা অনুচ্ছেদ নিলে সমস্যা কী? শেষ পর্যন্ত পুরো লেখাটাই নিজের খাতায় লিখে ফেলল, শুধু কয়েকটা শব্দ বদলে দিল। “নৈতিকতার মৃত্যু” হয়ে গেল “সমাজে নৈতিকতার সংকট”, “মানুষের মুখোশ” হয়ে গেল “সভ্যতার মুখোশ”।
লেখা জমা দেওয়ার পর তার বুক ধড়ফড় করছিল। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন ফলাফল এলো, সে প্রথম হয়েছে। পুরো কলেজে উচ্ছ্বাস। প্রিন্সিপাল তাকে মঞ্চে ডেকে সম্মাননা দিলেন। বন্ধুরা তাকে কাঁধে তুলে নিল। শিক্ষকরা বললেন, “আমরা জানতাম, তুমি পারবে।”
রাহাত হাসছিল, কিন্তু তার হাসির ভেতরে একটা কাঁটা লুকিয়ে ছিল। মঞ্চ থেকে নামার সময় তার মনে হলো, সে যেন অন্য কারও ছায়া পরে দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়িতে সেদিন উৎসবের পরিবেশ। বাবা গর্ব করে আত্মীয়দের ফোন করলেন। মা তার প্রিয় খাবার রান্না করলেন। ছোট বোন তুলি বলল, “ভাইয়া, তুমি তো একদিন বিখ্যাত লেখক হবে!”
রাহাত চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, সে যে প্রশংসা পাচ্ছে, তার সবটাই আসলে তার নয়। কিন্তু সে সত্যিটা বলতে পারল না। কারণ, মানুষ যখন তোমাকে নায়ক বানিয়ে ফেলে, তখন নিজের দুর্বলতার কথা স্বীকার করা সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে যায়।
এরপর কয়েকদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু এক দুপুরে কলেজে যাওয়ার পর সে দেখল, সবাই অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ আবার কথা বলতে বলতে থেমে যাচ্ছে।
ক্লাস শেষে বাংলা বিভাগের শিক্ষক মাহবুব স্যার তাকে নিজের রুমে ডাকলেন। মাহবুব স্যার ছিলেন কঠোর, কিন্তু ন্যায়বান। তিনি ধীরে ধীরে রাহাতের সামনে একটি প্রিন্ট করা কাগজ রাখলেন।
“এটা চেনো?”
রাহাত কাগজের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেটাই সেই ব্লগের লেখা। নিচে লেখকের নাম—আরিফুল ইসলাম।
তার মাথা ঘুরে উঠল।
স্যার শান্ত গলায় বললেন, “তোমার লেখার সঙ্গে এই লেখার মিল প্রায় পুরোপুরি। কয়েকটা শব্দ বদলেছ, কিন্তু ভাব, বাক্য, গঠন—সব একই।”
রাহাত কিছু বলতে পারল না। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
“তুমি কি এই লেখা নিজের বলে জমা দিয়েছ?”
প্রশ্নটা খুব সহজ ছিল, কিন্তু উত্তরটা যেন পাহাড়ের মতো ভারী। কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর রাহাত মাথা নিচু করে বলল, “জি, স্যার।”
রুমের ভেতর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এলো।
মাহবুব স্যার জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জানো রাহাত, একটা লেখা চুরি করা মানে শুধু কিছু শব্দ চুরি করা নয়। তুমি একজন মানুষের পরিশ্রম, রাত জেগে ভাবা, তার কষ্ট, তার মেধা—সবকিছু চুরি করেছ। সবচেয়ে বড় কথা, তুমি নিজের প্রতি অন্যায় করেছ।”
রাহাতের চোখে পানি চলে এলো। সে ভাবছিল, স্যার হয়তো চিৎকার করবেন, শাস্তি দেবেন। কিন্তু এই শান্ত কথাগুলো তার বুকের ভেতর আরও বেশি আঘাত করল।
কয়েকদিনের মধ্যেই বিষয়টা পুরো কলেজে ছড়িয়ে পড়ল। রাহাতের পুরস্কার বাতিল করা হলো। নোটিশ বোর্ডে লেখা হলো—“প্রতিযোগিতার রচনা প্লেজারিজম প্রমাণিত হওয়ায় ফলাফল বাতিল করা হয়েছে।”
যে বন্ধুরা একসময় তাকে ঘিরে থাকত, তারা দূরে সরে গেল। কেউ কেউ সরাসরি বলল, “তুই তো প্রতারক!” কেউ আবার আড়ালে হাসল।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল রাহাত যখন সে বাড়িতে ফিরে দেখল, বাবা কোনো কথা বলছেন না। মা শুধু একবার বললেন, “তুই যদি হারতিস, তবু আমাদের এত কষ্ট হতো না।”
সেই রাতটা রাহাতের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত ছিল। সে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে রইল। টেবিলের ওপর তার জেতা সার্টিফিকেটটা পড়ে ছিল। সে সেটার দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই কাগজটার কোনো মূল্য নেই। কারণ এর পেছনে তার নিজের কোনো সত্য নেই।
রাত গভীর হলে সে ল্যাপটপ খুলল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেই ব্লগের লেখক আরিফুল ইসলামের ইমেইল খুঁজে পেল। অনেকক্ষণ ধরে কী লিখবে ভেবে শেষে সে একটা চিঠি লিখল।
সে লিখল—
“আপনি আমাকে চেনেন না। কিন্তু আমি আপনার লেখা চুরি করেছি। আমি শুধু আপনার কিছু শব্দ নিইনি, আপনার পরিশ্রম, আপনার পরিচয়ও নিজের নামে চালাতে চেয়েছি। আমি জানি, ক্ষমা চাওয়ার অধিকারও হয়তো আমার নেই। তবু আমি সত্যিটা স্বীকার করছি। কারণ আমি আর এই মিথ্যার ভার নিয়ে বাঁচতে পারছি না।”
চিঠিটা পাঠানোর পর তার বুকটা একটু হালকা লাগল।
দুইদিন পর উত্তর এলো। আরিফুল ইসলাম লিখেছেন—
“আমি রাগ করিনি। কারণ আমি জানি, অনেক সময় মানুষ ব্যর্থতার ভয় থেকে ভুল করে। কিন্তু মনে রেখো, অন্যের আলো ধার করে কেউ কখনও নিজের পথ আলোকিত করতে পারে না। কিছুদূর যাওয়া যায়, তারপর অন্ধকারই থেকে যায়।”
এই কথাগুলো রাহাতের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
এরপর সে সিদ্ধান্ত নিল, সে আবার শুরু করবে। কিন্তু এবার অন্যের লেখা নয়, নিজের ভেতরের সত্য দিয়ে।
প্রথমদিকে খুব কষ্ট হতো। সে লিখতে বসত, আবার কাগজ ছিঁড়ে ফেলত। একটা অনুচ্ছেদ লিখে মনে হতো, এটা খুব সাধারণ। কিন্তু এবার সে নিজেকে থামাত না। কারণ সে বুঝে গেছে, সাধারণ কিন্তু নিজের লেখা হাজার গুণ বেশি মূল্যবান, চুরি করা অসাধারণ লেখার চেয়ে।
মাহবুব স্যারও তাকে সাহায্য করলেন। একদিন লাইব্রেরিতে ডেকে বললেন, “ভালো লেখা মানে শুধু সুন্দর ভাষা নয়। ভালো লেখা মানে নিজের ভেতরের সত্যকে খুঁজে পাওয়া।”
স্যার তাকে একটা কাজ দিলেন। বললেন, “প্রতিদিন যা দেখবে, যা ভাববে, যা অনুভব করবে, সেটা লিখবে। কেউ পড়বে কি না, সেটা ভাববে না।”
রাহাত লেখা শুরু করল। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ লোকটাকে নিয়ে লিখল। মায়ের চুপচাপ কষ্ট পাওয়া নিয়ে লিখল। নিজের লজ্জা, ভয়, ব্যর্থতা—সব লিখল।
মাস ছয়েক পর কলেজ ম্যাগাজিনের জন্য আবার লেখা আহ্বান করা হলো। এবার রাহাত একটা গল্প লিখল—একজন ছেলের গল্প, যে অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নাম করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষে বুঝেছিল, সত্যিকারের সম্মান শুধু নিজের সততায়।
লেখাটা জমা দেওয়ার সময় তার হাত কাঁপছিল। সে জানত না, মানুষ কী বলবে। হয়তো কেউ বলবে, এটা তার নিজের গল্প। হয়তো আবার হাসবে। তবু এবার সে ভয় পেল না।
ম্যাগাজিন বের হওয়ার পর অনেকেই তার গল্পটা পড়ল। কেউ কোনো মন্তব্য করল না। কিন্তু একদিন মাহবুব স্যার ক্লাস শেষে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “এই প্রথম তুমি সত্যিকারের কিছু লিখেছ।”
রাহাত সেদিন বুঝল, মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু ভুলের চেয়েও বড় হলো, সেই ভুল স্বীকার করার সাহস। প্লেজারিজম শুধু অন্যের লেখা চুরি নয়; এটা নিজের প্রতি বিশ্বাস হারানোর শুরু। আর নিজের ভাষা খুঁজে পাওয়া মানে শুধু লেখা শেখা নয়, নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া।
বছর কয়েক পরে রাহাত সত্যিই লেখক হলো। খুব বিখ্যাত না, খুব বড়ও না। কিন্তু তার প্রতিটি বইয়ের শুরুতে একটা ছোট্ট লাইন লেখা থাকত—
“এই বই তাদের জন্য, যারা কখনও অন্যের আলো ধার করতে গিয়ে নিজের আলো হারিয়ে ফেলেছিল।”2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


রাহাতের গল্পটা পড়তে পড়তে… নিজেকেই প্রশ্ন করলাম আমি কি কখনো অন্যের আলো ধার করেছি?