Profile Photo

সাব্বির হোসেন।Offline

  • shadowhunter3d
  • [“আত্মকথন”]

    আমি সাব্বির হোসেন।
    ঢাকার একটা ছোট ভাড়া ঘরে বসে এই লাইনগুলো লিখছি। বাহিরে কুকুর ডাকছে। আমার ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু আমার ভিতরটা থমকে আছে। লেখালেখি আমার জীবনে কখনো শখ ছিল না। এটা ছিল বেঁচে থাকার শেষ অস্ত্র।
    যখন আমি প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন আমার বয়স ছিল উনিশ। সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি।

    আমি যখন লিখি, তখন আমি আর আমি থাকি না।
    আমি হয়ে যাই একটা খোলা ক্ষত। একটা জানালা। একটা সেতু। যে সেতু আমার ভিতরের অন্ধকার আর বাইরের পৃথিবীর মাঝে তৈরি হয়।
    লেখালেখি আমার কাছে থেরাপি না।
    এটা আমার অস্তিত্বের প্রমাণ। যখন চারপাশে কেউ বুঝতে চায় না, যখন নিজেকেই নিজে চিনতে পারি না, তখন কলমটা হাতে নিলেই মনে হয় — ঠিক আছে, অন্তত একজন তো আছে যে আমাকে পুরোপুরি শুনছে। সে আমি নিজেই।
    অনেকে বলে, “লেখো তো, কী এমন কঠিন?”
    কিন্তু যারা সত্যি লেখে, তারা জানে — প্রতিটা লাইন লেখার আগে নিজের ভিতরে একটা ছুরি চালাতে হয়। রক্ত না বেরোলে কথাগুলো সত্যি হয় না। আর সেই রক্ত যখন কাগজে পড়ে, তখন আর সেটা শুধু শব্দ থাকে না, হয়ে যায় প্রার্থনা।

    লেখালেখি আমাকে শিখিয়েছে যে, আমি ভাঙা।
    আমি অনেকবার ভেঙেছি। চাকরি হারিয়েছি। সম্পর্ক ভেঙেছে। স্বপ্নগুলো একে একে মাটিতে পড়েছে। প্রতিবার যখন মনে হয়েছে আর পারব না, তখন কলমটা হাতে নিয়েছি। লিখতে লিখতে কেঁদেছি। কখনো এত জোরে কেঁদেছি যে, পাশের ঘরের ভাইয়া এসে জিজ্ঞেস করেছে, “কী হয়েছে রে?”
    কিন্তু আমি বলতে পারিনি।
    কারণ কী হয়েছে তা কাউকে বলা যায় না। সেটা শুধু লেখায় বলা যায়।
    আমি অনেকবার লেখা ছেড়ে দিয়েছি।
    মাসের পর মাস কলম ছুঁয়েও দেখিনি। মনে হয়েছে — আর পারব না। কেউ পড়বে না, কেউ বুঝবে না, কোনো লাভ নেই। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছি। কারণ লেখা না লিখলে আমি শ্বাস নিতে পারি না।
    লেখালেখি আমাকে শিখিয়েছে —
    সাফল্যের চেয়ে সততা বড়।
    পছন্দ হওয়ার চেয়ে নিজেকে চেনা বড়।
    আর সবচেয়ে বড় কথা — যন্ত্রণাকে সুন্দর করে বলতে পারাটাই হয়তো সবচেয়ে বড় বিজয়।
    আমার লেখায় অনেকবার মৃত্যুর কথা এসেছে।
    অনেকবার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু প্রতিবারই লিখতে লিখতে বেঁচে গেছি। লেখা আমার সুইসাইড নোট হতে দেয়নি, বরং বেঁচে থাকার কারণ হয়ে উঠেছে।
    লেখালেখি আমাকে একা করে দিয়েছে, আবার একা থাকার শক্তিও দিয়েছে।
    বন্ধুরা বলে, “তুই তো এখন আর আগের মতো নেই।”
    আমি হাসি। বলি না যে — হ্যাঁ, আমি আর আগের মতো নেই। কারণ আমি এখন নিজেকে দেখতে শিখেছি। আর নিজেকে দেখতে পারাটা খুব কষ্টের।
    আমি লিখি বলে অনেকে আমাকে “সেনসিটিভ” বলে।
    কিন্তু আমি জানি, এটা সেন্সিটিভিটি না। এটা বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। যদি আমি না লিখতাম, তাহলে হয়তো এতদিন টিকে থাকতে পারতাম না।
    যারা লেখে, তারা জানে —
    আমরা লিখি না শুধু গল্প বলার জন্য।
    আমরা লিখি নিজেকে বাঁচানোর জন্য।
    আজও যখন রাতে ঘুম আসে না, তখন আমি লিখি।
    যখন কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, তখনও লিখি।
    যখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়, তখনও লিখি।
    আমি জানি না আমার লেখা কখনো বড় কোনো প্রকাশকের কাছে যাবে কি না। জানি না কেউ পড়বে কি না। কিন্তু একটা জিনিস খুব ভালো করে জানি — যতদিন আমি লিখব, ততদিন আমি মরব না।
    যারা লেখো, তাদের বলি —
    তোমরা একা নও।
    তোমাদের যন্ত্রণা অর্থহীন না।
    তোমাদের কথাগুলো কোথাও না কোথাও কারো হৃদয়ে পৌঁছাবে।

    আমার লেখার সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো নিজেকে স্বীকার করা।
    আমি অনেকবার লিখেছি যে আমি ভালোবাসতে পারি না। আমি অনেকবার লিখেছি যে আমি নিজেকে ঘৃণা করি। আমি লিখেছি আমার বাবা-মাকে কতটা কষ্ট দিয়েছি। লিখেছি যে আমি একজন ভালো ছেলে হতে পারিনি।
    এসব লিখতে গিয়ে অনেকবার মনে হয়েছে — এগুলো কেউ পড়লে আমাকে ঘৃণা করবে। কিন্তু তারপরেও লিখেছি। কারণ সত্য না লিখলে লেখাটা মিথ্যে হয়ে যায়।
    একটা কথা খুব সত্যি:
    লেখালেখি আমাকে জনপ্রিয় করেনি। বরং আরও একা করে দিয়েছে। কখনো মনে হয় আমি পিছিয়ে পড়ছি। কখনো মনে হয় আমি আসলে সামনে এগোচ্ছি — শুধু অন্য পথে।
    তবু আমি লিখি।
    কারণ যেদিন আমি লিখব না, সেদিন আমি সত্যি মরে যাব।
    আমি এখনো জানি না আমার লেখা কোথায় গিয়ে থামবে। শুধু জানি — যতদিন শ্বাস নেব, ততদিন লিখব।

    [সাব্বির হোসেন।]

    1 Comment
    • সাব্বির হোসেন, ভালো লেগেছে আপনার আত্মকথন! “যতদিন শ্বাস নেব ততদিন লিখব! ” ___জয় হোক আপনার এই অদম্য ইচ্ছা শক্তির! অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে!অবিরাম অনির্বাণ শুভেচ্ছা! দেখা হবে।

Sabbir Hossain

Skip to toolbar