Profile Photo

পি.কে. সরকারOffline

  • PKSarker
  • Profile picture of পি.কে. সরকার

    পি.কে. সরকার

    1 month, 1 week ago

    দায়বোধের সংকটে সমাজের নীরব পতন
    ___ পি কে সরকার

    মানুষের সভ্যতা কেবল প্রযুক্তির উৎকর্ষে গড়ে ওঠেনি; এটি নির্মিত হয়েছে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতার উপর। অথচ বর্তমান সময়ের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো—আমরা যত উন্নত হচ্ছি বাহ্যিকভাবে, ততই ভেতর থেকে শূন্য হয়ে পড়ছি দায়বোধের অভাবে। যেন এক অদৃশ্য ক্ষয় আমাদের ভেতর থেকে সমাজের ভিত্তিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই দায়বোধের সংকটই আজ আমাদের নীরব পতনের প্রধান সূচনা বিন্দু।
    আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এই সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে সংকুচিত করে ফেলে, তখন আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে দায় এড়িয়ে যেতে চাই। ব্যবসায়ী বাজারকে দোষ দেয়, বাজার বৈশ্বিক প্রভাবকে, আর সাধারণ মানুষ দোষ দেয় রাষ্ট্রকে। কিন্তু এই দোষারোপের ভিড়ে কেউই নিজের ভূমিকার দিকে ফিরে তাকাতে চায় না। ফলে সমস্যার মূল কারণ অনাবিষ্কৃত থেকে যায়, আর সমাধানও অধরা হয়ে পড়ে।
    রাজনৈতিক পরিসরে দায়বোধের অভাব যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দায়ের সংজ্ঞাও পাল্টে যায়। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে অতীতকে দায়ী করে, আর বিরোধী শক্তি বর্তমানের প্রতিটি সংকটকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক থাকে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে জনগণ কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত হয়—যাদের জীবনের বাস্তব সংকট রাজনৈতিক কৌশলের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
    অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই দায়হীনতা আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। একজন উদ্যোক্তা যখন অনৈতিক লাভের পথে হাঁটে, তখন সে পরিস্থিতিকে দায়ী করে; একজন কর্মী নিজের দায়িত্বে অবহেলা করলে প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করে; আবার ভোক্তাও অনেক সময় অযৌক্তিক চাহিদার দায় নিজের উপর নিতে চায় না। এই পারস্পরিক দায় এড়িয়ে চলা অর্থনীতিকে একটি অনির্ভরযোগ্য কাঠামোয় পরিণত করে, যেখানে আস্থা এবং নৈতিকতা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়।
    পারিবারিক জীবনে দায়বোধের সংকট সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু গভীর ক্ষত তৈরি করে। একটি শিশুর চরিত্র গঠনে ব্যর্থ হলে আমরা সহজেই শিক্ষাব্যবস্থা বা সমাজকে দায়ী করি, কিন্তু নিজের ভূমিকার দিকে তাকাই না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে কেউই নিজের ভুল স্বীকার করতে চায় না। ফলে সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে—কোনো বিস্ফোরণ ছাড়াই, নিঃশব্দে। এই নিঃশব্দ ভাঙনই সমাজের বৃহত্তর কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।
    সামাজিক পরিসরে দায়হীনতা আমাদের নৈতিক চেতনার অবক্ষয় ঘটায়। আমরা অন্যায় দেখি, কিন্তু প্রতিবাদ করি না; আমরা দুর্নীতি জানি, কিন্তু নীরব থাকি। এই নীরবতাই আসলে এক ধরনের দায় এড়িয়ে চলা। আমরা মনে করি, “এটা আমার কাজ নয়,” কিন্তু ভুলে যাই—এই নীরবতার মধ্য দিয়েই অন্যায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সমাজের প্রতিটি অন্যায়ের পেছনে তাই কেবল অপরাধীর দায় নয়, নীরব দর্শকের দায়ও কম নয়।
    পেশাগত ক্ষেত্রে দায়বোধের অভাব দক্ষতার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যে কর্মী নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে কখনো উন্নতি করতে পারে না। যে প্রতিষ্ঠান নিজের ব্যর্থতার বিশ্লেষণ না করে বাহ্যিক কারণকে দায়ী করে, সে প্রতিষ্ঠানও স্থায়ী সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কারণ উন্নতির পূর্বশর্ত হলো আত্মসমালোচনা, আর আত্মসমালোচনার প্রথম ধাপই হলো দায় স্বীকার।
    মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দায় এড়িয়ে চলা একটি আত্মপ্রবঞ্চনার রূপ, যা প্রায়ই “Blame Shifting” নামে পরিচিত। এটি মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ হারায়, আর সমাজ তার সামষ্টিক শক্তি হারাতে থাকে।
    তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও সম্ভাবনার আলো রয়েছে। দায় স্বীকার করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের সূচনা। যে ব্যক্তি নিজের ভুলের দায় নিতে পারে, সে নিজের ভেতরে নতুন এক শক্তির জন্ম দেয়—একটি সৎ সাহস, যা তাকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়। একইভাবে, একটি সমাজ যদি তার ভুলগুলোকে স্বীকার করতে শেখে, তবে সেই সমাজই একদিন তার সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাবে।
    অতএব, দায়বোধের সংকট কেবল একটি ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি সামষ্টিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায় গ্রহণের চর্চা শুরু করতে হবে। কারণ সমাজের নীরব পতন থামাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন—নিজের ভেতরের নীরব অস্বীকারকে ভেঙে ফেলা।
    শেষ পর্যন্ত, দায় এড়িয়ে চলা মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দায় গ্রহণই মানুষকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে। আর শক্তিশালী মানুষ দিয়েই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ, সচেতন ও মানবিক সমাজ—যেখানে পতন নয়, সৃষ্টি হয় অগ্রগতির নতুন ইতিহাস।

    5
    8 Comments
    • অসাধারণ একটি সামাজিক বিশ্লেষণ!
      দায়বোধের সংকটকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে পরিবার, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব তুলে ধরার যে যুক্তিনিষ্ঠ প্রয়াস, তা সত্যিই চিন্তা-উদ্দীপক। বিশেষত ‘Blame Shifting’ এবং নীরব দর্শকের দায়ের কথা বলে যেভাবে আমাদের সবার মধ্যে আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন, তা গভীরভাবে স্পর্শ করে লেখকপ্রিয়, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!

    • আমরা প্রতিনিয়ত সিস্টেমকে দোষ দিই, কিন্তু ভুলে যাই যে আমরা নিজেরাও সেই সিস্টেমের অংশ। দায়ের এই পারস্পরিক অস্বীকারই যে আমাদের সম্মিলিত শক্তির বিনাশ ঘটাচ্ছে, তা আপনি খুব সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অসাধারণ একটি বিশ্লেষণ!

    • আমরা সবাই দোষ দিই, কেউ আয়নার সামনে দাঁড়াই না।🖤

    • যে ছবি এঁকেছেন, তা শুধু বিশ্লেষণ নয়, একটা জরুরি সতর্কবার্তা।

পি কে সরকার

 

“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”

Skip to toolbar