Profile Photo

তাহমিনা মোরশেদOffline

  • RBTM796923t
  • ওয়াশরুমের আয়নায় মুখে পানি ছিটাতেই আরিয়ানের ঠোঁটের কোণের সেই চওড়া হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
    আয়নার ওপাশে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে— তার চোখে দুষ্টুমি নেই। আছে ক্লান্তি। আর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা।
    তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে কিছুক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইলো। নন্দিনীর চোখের সেই চিকচিকে জলটা তার মাথা থেকে কিছুতেই সরছে না।
    “অতীতের সব দোষ আমাকে না দিয়ে নিজেকে একবার প্রশ্ন কোরো…”
    কথাটা যেন কানের কাছে বারবার ধাক্কা মারছে।

    আরিয়ান গভীর নিঃশ্বাস ফেললো। সে জানে— নন্দিনী রাগ করে, কষ্ট পায়, কথা শোনায়… কিন্তু তার প্রতিটা শব্দের ভিতরে জমে থাকে বহুদিনের না বলা অভিমান।
    আর সেই অভিমানের অর্ধেকের জন্য দায়ী সে নিজেই।

    ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে স্ট্রাইপ শার্টটা পরে নিলো। ঘড়ির দিকে তাকালো। সময় দ্রুত এগোচ্ছে। তার জুলফিতে একটু জেল দিয়ে সেট করে নেই। তারপর ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ঘড়িটা গলিয়ে নেয় হাতে। এটা তার খুব পছন্দের আর খুব দামি। সে রুম লক করে বেড়িয়ে পরে। তার গেটআপ দেখে এবার মনে হয় সে কোনো বড়ো মাপের অফিসার। সে রিসেপশনে কি জমা করে দরকারি কিছু ফরমালিটিজ পূরণ করে বেড়িয়ে পরে।

    কিন্তু আজকের গন্তব্য অফিস না।
    আজ তাকে যেতে হবে এমন এক জায়গায়, যেখানে সে বহু বছর যায়নি।

    অন্যদিকে, নন্দিনী গাড়িতে বসে নিজের ফাইলগুলো গুছাচ্ছিল। ড্রাইভার রিয়ার ভিউ মিররে কয়েকবার তাকিয়েও কিছু বলার সাহস পেল না। কারণ, ম্যাডামের চোখদুটো লাল।
    রাগে? না কষ্টে? হয়তো দুটোই।
    নন্দিনী ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে মিটিং রিমাইন্ডার ভেসে উঠছে। “Board Meeting — 1:30 PM”
    সে ফোনটা অফ করে দিল।
    আজ তার নিজের সাথেই মিটিং দরকার।
    গাড়ি ঘুরিয়ে সে ড্রাইভারকে বলল, “শাহবাগ না… ধানমন্ডি ৭।”
    ড্রাইভার অবাক হলেও প্রশ্ন করলো না।
    ধানমন্ডি ৭— সেই পুরোনো ক্যাফে। যেখানে প্রথমবার আরিয়ান তাকে বলেছিল—
    “তুমি জানো? তোমার সাথে কথা বলাটা নেশার মতো।”
    আর নন্দিনী হেসে বলেছিল— “তাহলে সাবধান, আমি কিন্তু খুব বাজে নেশা।”
    সেদিন দু’জনেই হেসেছিল। আজ মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

    আরিয়ানের গাড়ি থামলো শহরের এক পুরোনো অংশে।
    একটা ছোট, নিরিবিলি গলি। গলির শেষ মাথায় সাদা রঙের পুরোনো বাড়ি।
    গেটের ওপরে এখনো লেখা— “আয়েশা ভিলা”

    সে কিছুক্ষণ গাড়ির ভেতর বসে থাকলো।
    এই বাড়িটাই ছিল তার অতীত। তার শৈশব, কৈশোর, পরিবার। পরিবারের কথা মনে হতেই – তার মার মুখটা ভেসে এলো। তার বাবার চিৎকার। ভাঙা সম্পর্ক। আর এমন কিছু সিদ্ধান্ত— যা তাকে পাথর বানিয়েছিল।
    আজ বহুদিন পর সে ভিতরে ঢুকলো।
    ধুলোমাখা বারান্দা। বন্ধ জানালা। নিস্তব্ধতা।
    হঠাৎ কেয়ারটেকার চাচা এগিয়ে এলো।
    “বাবা… তুমি?”
    আরিয়ান শুধু মাথা নাড়লো।
    “মা’য়ের রুমটা খুলে দিন।”
    বৃদ্ধ লোকটা অবাক চোখে তাকালেও চাবি এনে দিল।

    ঘরটা খুলতেই পুরোনো গন্ধ। আলমারি। বই। ড্রেসিং টেবিল। আর দেয়ালে তার মা’য়ের ছবি।

    আরিয়ান ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
    “আমি পারিনি, মা…” তার কণ্ঠ ভেঙে গেল। “আমি মানুষটাকে ভালোবেসেও ঠিকভাবে রাখতে পারিনি। তোমার মতোই… সেও আমার নীরবতাকে ভুল বুঝছে।”

    ড্রয়ার খুলতেই একটা পুরোনো চিঠি বেরিয়ে এলো।
    তার মায়ের হাতের লেখা—
    “ভালোবাসার মানুষকে কখনো নিজের কষ্টের শাস্তি দিও না, আরিয়ান। মানুষ হারিয়ে গেলে তাকে ফিরে পাওয়া যায় না সবসময়।”

    আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।

    মনে হলো— কেউ যেন বহু বছর পর তার বুকের ভেতর জমে থাকা বরফে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

    অন্যদিকে, ধানমন্ডির সেই ক্যাফেতে বসে নন্দিনী জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
    হঠাৎ সামনে একটা ছায়া এসে দাঁড়ালো।
    “এই টেবিলটা কি এখনো আমার জন্য রিজার্ভ আছে?”
    নন্দিনী চমকে তাকালো।

    আরিয়ান।

    অদ্ভুত এক শান্তি খেলা করে গেলো।
    নন্দিনী ঠান্ডা গলায় বললো, “আপনার মিটিং নেই, মি. আরিয়ান?”
    আরিয়ান ধীরে ধীরে বসে পড়লো।
    “আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। তোমার সাথে। আর আজ… আমি প্রথমবার তোমার সামনে হাজিরা দিতে এলাম।”

    নন্দিনী কিছু বললো না।
    আরিয়ান টেবিলের ওপর একটা পুরোনো চিঠি রাখলো।
    “আমি জানি আমি ভুল করেছি। তোমাকে দূরে ঠেলেছি। কারণ আমার ভয়টা যে এতো দিন জয়ীর হাসি হাসছিলো… কাউকে এতটা ভালোবাসলে হারানোর ভয়টা শ্বাস নিতে দেয় না। কিন্তু আজ বুঝেছি— দূরে ঠেলে রাখাও এক ধরনের হারানো।”

    নন্দিনীর চোখ ভিজে উঠলো। সে নিচের দিকে তাকিয়ে বললো—
    “তুমি সবসময় দেরি করে ফেলো…”
    আরিয়ান হালকা হেসে বললো—
    “কিন্তু আসি তো।”
    কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
    তারপর নন্দিনী ধীরে ধীরে বললো—
    “একটা সুযোগ। শেষবার।”
    আরিয়ান সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করলো—
    “শেষবার না… এবার থেকে প্রতিবার।”
    জানালার বাইরের আলো এসে দু’জনের মাঝখানে পড়লো।

    দূরত্ব এখনও আছে। অভিমানও।

    3
    6 Comments
হ্যাঁ বা না শব্দ দুটি সবচেয়ে পুরনো এবং ছোট। কিন্তু এ কথা দুটো বলতেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়।

পীথাগোরাস

Friends

Profile Photo
Syed Farah
@syedfarah
Profile Photo
Hridita Islam
@hriditaislam
Profile Photo
Haoya Khan
@haoyakhan
Profile Photo
সজল
@sojol
Profile Photo
Jannatul Ferdausi
@ferdausi
Profile Photo
Masum-Pantho
@masum-pantho
Profile Photo
Riyansh Hasmi
@riyanshhasmi
Profile Photo
Amrita Sardar
@amritasardar
Skip to toolbar