-
উপন্যাসঃ তটরেখার বিজয়
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: বনের ছায়া ও ভাঙনের খেলা
সপ্তাহ দুয়েক পার হয়ে গেছে। লোনা জল কিছুটা নামলেও মাটির বুক চিরে লবণের সাদা রেখা ফুটে উঠেছে। উপকূলের মানুষ জানে, এই সাদা রেখা আসলে এক ধরনের অভিশাপ। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না।
রাশেদ ঠিক করল সুন্দরবনের গহিন থেকে গোলপাতা আর জ্বালানি সংগ্রহ করে আনবে, যাতে অন্তত মাথা গোঁজার একটা ছাপড়া ঘর তোলা যায়। রহিম চাচা আর হাশেম মাঝিকে নিয়ে সে নৌকা ভাসাল। সুন্দরবন তাদের কাছে শুধু এক জঙ্গল নয়, সে এক পরম আশ্রয়দাত্রী জননী। যখন জমি ধান দেয় না, তখন এই বনই তাদের অন্ন জোগায়।
নৌকা যত বনের গভীরে ঢুকছে, ততই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে চারপাশকে। খালের দুপাশে সুন্দরী আর গরান গাছের শ্বাসমূলগুলো যেন একেকটি প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ দেখল, বনের ভেতরের ছোট ছোট খালগুলোও পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানও আজ সংকটে।হঠাৎ নদীর ওপার থেকে এক প্রচণ্ড শব্দ এল। ‘ধপাস!’
রহিম চাচা আঁতকে উঠে বললেন, “আবার ভাঙন শুরু হয়েছে রে রাশেদ!”
নৌকা ঘুরিয়ে তারা দেখল, পাড়ের এক বিশাল অংশ জুড়ে থাকা পুরনো কেওড়া গাছগুলোসহ মাটি খসে পড়ছে নদীতে। নদী ভাঙন এই উপকূলের এক নিষ্ঠুর পরিহাস। জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচলেও নদী তার বাঁক বদল করে মানুষের ভিটেমাটি গিলে নেয়। যে জায়গাটায় কাল ঘর ছিল, আজ সেখানে কেবল অথৈ জল।রাশেদ দেখল, একটি পরিবার তাদের ঘরের খুঁটি আর আসবাব নৌকায় তুলে দিশেহারা হয়ে ভাসছে। তাদের কোনো গন্তব্য নেই। নদী তাদের আজ ‘উদ্বাস্তু’ করে দিয়েছে। এই দৃশ্য রাশেদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করল। সে বুঝতে পারল, কেবল ত্রাণ দিয়ে এই মানুষদের বাঁচানো যাবে না, প্রয়োজন টেকসই বাঁধ আর ম্যানগ্রোভ বনায়ন।
বনের ভেতর থেকে ফিরে আসার সময় তারা দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। কুসুম আর গ্রামের নারীরা মিলে ভাঙনকবলিত পাড়গুলোতে গোলপাতা আর কেওড়ার চারা রোপণ করছে। তাদের বিশ্বাস, বনের এই গাছগুলোই হবে তাদের প্রাকৃতিক দেয়াল।
কুসুমের কাদা মাখা হাতের দিকে তাকিয়ে রাশেদ হাসল। সে ভাবল, “সুন্দরবন আমাদের আগলে রাখে, কিন্তু আমরা কি বনকে আগলে রাখছি?”বিকেলের দিকে আকাশে মেঘ জমল। সুন্দরবনের মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক বক উড়ে গেল তাদের বাসার খোঁজে। রাশেদ নৌকার হাল ধরে ভাবল, নদী ভাঙবে, কিন্তু মানুষের সাহস ভাঙবে না। এই লোনা জলেই তারা মিষ্টি স্বপ্নের বীজ বুনবে।
কুসুমের কাছে গিয়ে সে আজ একটি কথা বলল, “কুসুম, নদী আমাদের জমি নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের দিগন্ত বড় করে দিয়েছে। আমরা এই বন আর নদীকে নিয়েই নতুন করে বাঁচতে শিখব।”
কুসুম আলতো করে হাসল। সেই হাসিতে নদী ভাঙনের ভয় ছিল না, ছিল আগামীর ওপর এক অদম্য আস্থা।
3 Comments
Friends
আয়েশা সিমা
@ayesha-sima
Kabi Doctor Mohammad Zakir Hossain Biplob
@zakir-hossain
Hridoy
@solayman-uddin-hridoy
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
Fatima Sadia
@fatimasadia
রিফায়াত নিগার
@refayat-nigar
সাফায়াত প্রতীক
@protik
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
শাহ্ সাকিরুল ইসলাম
@shahsakirulislam



অদম্য সাহসে নতুনভাবে বেঁচে থাকা….🤍