-
কর্পূরের রাজ্যে ছিদ্রসম্রাট
কর্পূরপুর নামে এক অদ্ভুত রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের মানুষেরা খুব ভদ্র, খুব শিক্ষিত এবং খুব গর্বিত ছিল নিজেদের “আধুনিক” পরিচয় নিয়ে। তারা সকালে ঘুম থেকে উঠেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলত, “আমরা উন্নত!” তারপর রাতের বেলা ধার করা টাকায় কেনা নরম বালিশে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। রাজ্যের প্রতিটি মানুষের ঘরে ছিল বিশাল বড় টেলিভিশন, চকচকে মোবাইল, দামি পর্দা আর অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি, যেগুলোর ব্যবহার তারা নিজেরাও ভালোভাবে জানত না। কিন্তু তাতে কী? অতিথি এসে যদি বলে, “ওহ! কী আধুনিক!”— তাহলেই তো জীবনের সার্থকতা।
কর্পূরপুরের রাজা ছিলেন মহামান্য ছিদ্রেশ্বর তৃতীয়। তিনি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি অর্থনীতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাষণ দিতে পারতেন, কিন্তু নিজের রাজকোষে কত টাকা আছে তা কখনো জানতেন না। তাঁর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মন্ত্রী অপচয়ানন্দ। এই লোকটির অসাধারণ ক্ষমতা ছিল— যেকোনো প্রয়োজনকে বিলাসিতা বানিয়ে ফেলা, আর যেকোনো বিলাসিতাকে “জরুরি বিনিয়োগ” বলে চালিয়ে দেওয়া।
একদিন রাজপ্রাসাদে এক মহাসভা বসানো হলো। সভার মূল বিষয়— “কেন কর্পূরপুরের মানুষ মাসের শেষে কাঁদে?” সভায় উপস্থিত ছিলেন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, কবি, ব্যাংকার, ফ্যাশন-বিশেষজ্ঞ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা, এমনকি রাজ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারদেনা সংগ্রাহক মহাজন সুদমোহনও।
রাজা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আমাদের রাজ্যে আয় বাড়ছে, দোকান বাড়ছে, বাজার বাড়ছে, কিন্তু মানুষের মুখে হাসি কমছে কেন?”
মন্ত্রী অপচয়ানন্দ দাঁড়িয়ে বললেন,
“মহারাজ, জনগণ অত্যন্ত দেশপ্রেমিক। তারা দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে দিনরাত খরচ করছে।”
সঙ্গে সঙ্গে সভায় হাততালি পড়ে গেল। কর্পূরপুরে হাততালি ছিল খুব সস্তা জিনিস; চিন্তা ছিল ব্যয়বহুল।
সভায় তখন প্রবেশ করল এক অদ্ভুত লোক। তার গায়ে সাধারণ পোশাক, পায়ে পুরোনো স্যান্ডেল, হাতে ছোট্ট একটি খাতা। লোকটির নাম মিতালাল। রাজ্যের মানুষ তাকে “কৃপণ পাগল” বলে ডাকত। কারণ সে অকারণে বাতি জ্বালিয়ে রাখত না, তিন কাপ চায়ের বদলে এক কাপ খেত, আর মাসের শেষে তার মুখে রহস্যময় শান্তি দেখা যেত।
রাজা তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তুমি এখানে কেন?”
মিতালাল মাথা নিচু করে বলল,
“মহারাজ, আমি শুধু বলতে এসেছি— কর্পূরপুরের রাজকোষে যত ছিদ্র নেই, মানুষের পকেটে তার চেয়েও বেশি ছিদ্র।”
সভা থমকে গেল। কারণ সত্য কথা কর্পূরপুরে খুব কম লোকই বলত। সত্য সেখানে অতিথির মতো— মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারে না।
মন্ত্রী অপচয়ানন্দ হেসে বললেন,
“ছিদ্র আবার কেমন?”
মিতালাল বলল,
“মহারাজ, মানুষ এখন প্রয়োজনের জন্য কম, দেখানোর জন্য বেশি খরচ করে। কেউ খাবারের ছবি তোলে খাবার খাওয়ার আগে। কেউ নতুন জামা কেনে শুধু সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার জন্য। কেউ আবার মাসে পাঁচটা সাবস্ক্রিপশন চালু রাখে, যেগুলোর পাসওয়ার্ডও সে মনে রাখতে পারে না।”
সভায় উপস্থিত অনেকেই মাথা নিচু করল। কারণ তাদের ফোনে তখনও ‘অটো-ডেবিট সফল হয়েছে’ বলে বার্তা আসছিল।
কর্পূরপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল এক ধরনের ধর্ম। সেখানে মানুষ বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনে বেশি সুখী ছিল। বাস্তবে যার চাল ফুরিয়ে যেত, অনলাইনে সে লিখত— “লাইফ ইজ বিউটিফুল।” যাদের ঘরে টেবিল ফ্যান ছাড়া কিছু ছিল না, তারাও ছবি তুলত এমনভাবে যেন তারা রাজপ্রাসাদের এয়ারকন্ডিশনে বাস করে।
এই রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ ছিল ‘দেখানচন্দ্র’ নামের এক প্রভাবক। সে প্রতিদিন ভিডিও বানাত— “কীভাবে সফল হবেন।” অথচ তার নিজের বিদ্যুতের বিল তিন মাস বাকি ছিল। সে মানুষকে শেখাত, “নিজেকে প্রিমিয়াম বানান।” ফলে কর্পূরপুরের সাধারণ মানুষ ভাত কম খেয়ে প্রিমিয়াম ফোন কিনতে শুরু করল।
একদিন রাজ্যে “বৃহৎ ছাড় উৎসব” ঘোষণা হলো। দোকানিরা লিখল— “আজ কিনুন, কাল ভাবুন।” মানুষ এত খুশি হলো যে কেউ আর “কাল” নিয়ে ভাবল না। এক নারী তিনটি ব্লেন্ডার কিনলেন, যদিও তার রান্নাঘরে বিদ্যুৎই থাকত না নিয়মিত। এক ব্যক্তি ছয় জোড়া জুতা কিনলেন, অথচ হাঁটার সময় তিনি রিকশাই ব্যবহার করতেন।
মিতালাল তখন বাজারের এক কোণে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। সে দেখল, মানুষ ছাড়ের নামে এমন সব জিনিস কিনছে যেগুলোর প্রয়োজন নেই। যেন অপচয়ও এক ধরনের উৎসব।
কর্পূরপুরের মানুষ অদ্ভুতভাবে বিশ্বাস করত— দামি জিনিস কিনলেই সম্মান বাড়ে। তাই কেউ ফ্রিজের ভেতর খাবার না রেখেও বিশাল ফ্রিজ কিনত। কেউ বই না পড়েও আলমারি ভর্তি বই রাখত, যেন অতিথিরা এসে ভাবে— “কি জ্ঞানী মানুষ!”
সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল রাজ্যের “অটোপে দানব।” এটি ছিল এক অদৃশ্য প্রাণী, যে প্রতি মাসে মানুষের অ্যাকাউন্ট থেকে অল্প অল্প করে টাকা খেয়ে ফেলত। মানুষ জানতও না তারা কিসের জন্য টাকা দিচ্ছে। কেউ সিনেমা দেখে না, তবুও সিনেমা অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন চলছে। কেউ গান শোনে না, তবুও মিউজিক অ্যাপের টাকা কাটা হচ্ছে। এক লোক তো ভুলেই গিয়েছিল সে পাঁচ বছর আগে “মাসিক যোগব্যায়াম কোর্স” চালু করেছিল।
মিতালাল রাজাকে বলল,
“মহারাজ, এই দানবকে থামাতে হবে।”
রাজা অবাক হয়ে বললেন,
“দানব কোথায়?”
মিতালাল বলল,
“দানব বাইরে নয় মহারাজ, মানুষের অসচেতনতায়।”
রাজা এই কথা বুঝলেন না। কারণ কর্পূরপুরে অসচেতনতা ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
এদিকে রাজ্যের আরেক বিপদ ছিল “ঋণপরী।” সে রাতের বেলা মানুষের স্বপ্নে এসে বলত, “এখন কিনুন, পরে দিন।” মানুষ মুগ্ধ হয়ে সব কিনে ফেলত। পরে যখন “পরে” এসে হাজির হতো, তখন তাদের চোখে ঘুম থাকত না।
একদিন রাজকোষ শূন্য হওয়ার উপক্রম হলো। রাজা জরুরি বৈঠক ডাকলেন। মন্ত্রী অপচয়ানন্দ বললেন,
“মহারাজ, আমাদের আরও বড় উৎসব করা উচিত। মানুষ খরচ করলে অর্থনীতি বাঁচবে।”
মিতালাল এবার হেসে ফেলল।
“অর্থনীতি বাঁচবে, কিন্তু মানুষ বাঁচবে তো?”
সভায় নীরবতা নেমে এলো। কর্পূরপুরে নীরবতা সাধারণত তখনই নামত, যখন কেউ সত্যি কথা বলে ফেলত।
মিতালাল এরপর রাজাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের বাড়ি ঘুরতে বের হলো। তারা দেখল— এক পরিবার বিদ্যুতের বিল দিতে পারছে না, কিন্তু তাদের ড্রয়িংরুমে বিশাল টেলিভিশন। আরেক পরিবার ওষুধ কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, কিন্তু প্রতি সপ্তাহে বাইরে খেতে যাচ্ছে শুধু ছবি পোস্ট করার জন্য। কেউ সন্তানের বই কিনতে দেরি করছে, কিন্তু নতুন ফোনের কিস্তি সময়মতো দিচ্ছে।
রাজা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলেন— কর্পূরপুরের আসল দারিদ্র্য টাকার নয়, বিবেচনার।
এরপর মিতালাল রাজ্যে একটি নতুন বিদ্যালয় চালু করল— “প্রয়োজন বনাম শখ পাঠশালা।” সেখানে শিশুদের শেখানো হতো কীভাবে বাজারে গিয়ে চকচকে বিজ্ঞাপনের প্রেমে না পড়তে হয়। শেখানো হতো— সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই স্বাধীনতা নয়; কিছু আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাও এক ধরনের শক্তি।
প্রথমদিকে মানুষ এই বিদ্যালয়কে উপহাস করল। কারণ কর্পূরপুরে আত্মসংযমকে দুর্বলতা মনে করা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে লাগল।
মানুষ তালিকা করে বাজারে যাওয়া শুরু করল। কেউ আর দশটা সাবস্ক্রিপশন চালু রাখল না। ঘরের বাতি নিভিয়ে রাখতে শুরু করল। বাইরে প্রতিদিন খাওয়ার বদলে সপ্তাহে একদিন খেতে লাগল। আশ্চর্যজনকভাবে তারা দেখল— জীবন থেকে আনন্দ কমে যায়নি, বরং দুশ্চিন্তা কমেছে।
দেখানচন্দ্র একদিন নতুন ভিডিও বানাল—
“বন্ধুরা, আসল বিলাসিতা হলো ঋণমুক্ত ঘুম।”
মানুষ অবাক হলো। কারণ প্রথমবারের মতো সে সত্যি কথা বলেছে।
মন্ত্রী অপচয়ানন্দ অবশ্য এসব পরিবর্তনে খুব বিরক্ত হলেন। কারণ মানুষ যখন হিসাব করে চলতে শেখে, তখন অপ্রয়োজনীয় চাকচিক্যের বাজার একটু মন্দা হয়ে যায়। তিনি রাজাকে বললেন,
“মহারাজ, এভাবে চলতে থাকলে মানুষ কম খরচ করবে!”
রাজা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
“না মন্ত্রী, মানুষ এখন বুঝে খরচ করবে।”
এই একটি বাক্যে পুরো রাজ্য যেন বদলে গেল।
কর্পূরপুরে এরপর এক নতুন প্রবাদ চালু হলো—
“যে নিজের পকেটের ছিদ্র বন্ধ করতে পারে, সে-ই ভবিষ্যতের ঝড় সামলাতে পারে।”
মিতালাল তখনও সাধারণ পোশাকে হাঁটত। কেউ তাকে আর “কৃপণ পাগল” বলত না। বরং মানুষ বুঝতে শিখল— মিতব্যয়িতা মানে আনন্দহীন জীবন নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় বোঝা ছাড়া জীবন।
তবুও কর্পূরপুর পুরোপুরি বদলায়নি। কারণ মাঝে মাঝে আবার নতুন নতুন বিজ্ঞাপন আসে, নতুন ছাড় উৎসব আসে, নতুন ঋণপরী মানুষের কানে ফিসফিস করে। মানুষের ভেতরের লোভও মাঝে মাঝে পুরোনো অভ্যাসের মতো জেগে ওঠে। কিন্তু এখন অন্তত কিছু মানুষ কেনার আগে থেমে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“এটি কি সত্যিই প্রয়োজন?”
আর এই প্রশ্নটাই কর্পূরপুরের সবচেয়ে বড় বিপ্লব হয়ে দাঁড়াল।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ছিদ্র দেয়ালে নয়, মানুষের বিবেচনায় তৈরি হয়। আর সবচেয়ে বড় সঞ্চয় ব্যাংকে নয়, সচেতনতায় জমা হয়।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe



তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক রূপকথা…..🤍