Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • আড়ালের ছায়া (ক্রাইম থ্রিলার)

    “সাত”
    পুলিশ এখন শিরিনের ব্যাকগ্রাউন্ডের খোঁজ নিচ্ছে । জানা গেল, সে একসময় পুরনো ঢাকার এক বস্তিতে থাকত। তার ভাই বিভিন্ন ক্রাইমে জড়িত থাকার অভিযোগে জেল কেটেছে। তবে তার মধ্যে কোনটাই খুন ছিল না।

    তবে শিরিন নিজে বছর চারেক আগে এক শিশুর মৃত্যু ঘটনার সময় সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশের ডাকে থানায় গিয়েছিল। যদিও পরে কোন
    প্রমাণ মেলেনি বলে ছাড়া পেয়ে যায়।

    ওর তখনকার এক প্রতিবেশী জানাল, “মাইয়াটা কেমন জানি। খুব চুপচাপ, কিন্তু ওর চরাফেরায় একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে। কথা কওনের সময় কারো দিকে সরাসরি তাকায় না। ঘাড় কাইত কইরা অন্য দিকে তাকাইয়া কথা কয়।”

    “বিয়ে শাদি করে নাই?”

    “করছিল। কিন্তুক, জামাই চইলা যাওনের পর আর করে নাই।”

    “তার তো একটা ভাই আছে, রাজু নাম। চেনেন নাকি?” তদন্তকারী পুলিশ অফিসার জানতে চায়।

    “রাজু তো হের আপন ভাই না। পাতানো ভাই। জামাই চইলা যাওনের পর রাজুই হেরে দেইখা রাখে।”

    ইন্সপেক্টর ভ্রু কোঁচকালেন। এই তথ্যটা নতুন। যদি তারা ভাই-বোন নাই হবে, তাহলে সম্পর্কটা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক ছিলনা। কিন্তু, তাদের সম্পর্ক যাই থাক, এখানে লিনা আসে কিভাবে?

    তদন্তকারী এক অফিসার বছর চারেক আগে এক শিশুর মৃত্যু ঘটনার রেকর্ড থেকে শিরিনের একটি ছবি উদ্ধার করেন। ছবিটা সাদা-কালো। অনেকটাই ময়লা হয়ে গেছে।

    ছবিটা নিয়ে শামিম সাহেব আবার লিনাদের বাসায় আসেন। ওটা দেখে সায়মা রহমান অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেন, “হ্যা স্যার, এটাই শিরিন। চুলের বাঁধন আর মুখের গঠন একেবারে মিলে যাচ্ছে। “

    উপরে বাড়িওয়ালার বাসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়। সেদিনের পর শিরিন আর কাজে আসেনি। । এমন সময় পাশের ফ্ল্যাটের রহিমা বুয়া চুপচাপ এসে বলেন, “স্যার, আমি একদিন দেখছি… লিনার খুনের আগের দিন বিকেলে শিরিন ছাদের দিক থেইকা আসতেছিল। তার মুখ কেমন জানি ঘামছিল। চোখে-মুখে একটা ভয়ের ছাপ ছিল।”

    ইন্সপেক্টর নীচের ঠোঁটে চিমটি কাটলেন। লিনার খুনের সাথে শিরিনের সম্পৃক্ততা এখন আর হালকা রইলো না।

    সন্ধ্যার পরে ফরেনসিক টিম লিনার ল্যাপটপ ঘেঁটে একটি ভিডিও ফাইল উদ্ধার করে। ভিডিওটি খুনের দিনের, দুপুর ১১টা ৫০ মিনিটের। সম্ভবত ওয়েবক্যাম ভুল করে অন ছিল।

    ভিডিওতে দেখা যায়, লিনা বসে আছে টেবিলের সামনে। কেউ একজন ঢুকছে ঘরে, মুখ দেখা যায় না, কিন্তু তার গলা শোনা যায়।

    মেয়েলি গলা। কিছুটা কেঁপে কেঁপে বলছে , “তোমারে আমার ভাই এত ভয় দেহাইলো, ভাবছি তুমি চুপ থাকবা। তুমি কেন বুঝনা, তুমি কইয়া দিলে আমি শেষ হইয়া যামু।” শেষের দিকে কন্ঠটা আর্ত হয়ে উঠলো।

    “তুই একটা খারাপ মেয়ে। তোর কারণে আরো অনেক ছেলে নষ্ট হবে। কাজেই আমি আর চুপ থাকবো না। আমি আজই মাকে সব বলে দেব।” লিনার রাগী কন্ঠ শুনা যায়।

    “তাহলে তোকে মরতে হবে।” কন্ঠটা এবার চেঁচিয়ে উঠে। পরক্ষনেই একটা হুটহাঁট শব্দ। তারপরেই ল্যাপটপটা অফ্ হয়ে যায়।

    এই কণ্ঠ শুনেই সায়মা রহমান আঁতকে ওঠেন। তিনি চাপা গলায় বলেন, “এই কণ্ঠটা… শিরিনের মতো। আমি নিশ্চিত না, কিন্তু খুব মিলে যাচ্ছে।”

    তদন্তকারী অফিসার উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরেন। তৎক্ষনাত ফোনে নির্দেশ দিলেন, “ আমাদের যত সোর্স আছে সবার মাঝে শিরিনের ছবিটা ছড়িয়ে দাও। ওকে আমাদের যে কোন মূল্যে পেতে হবে।”

    শিরিনকে এবার পুলিশ খুঁজে বের করেছে। একটা ঝুপড়ি ঘর, কড়াইল বস্তির কোণে, বাঁশের বেড়া আর টিনের চালার নিচে লুকিয়ে ছিল সে। অন্ধকার ঘরের এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। পুলিশের সামনে চুপ করে থাকে। চোখ নামিয়ে, দু-হাতের আঙুল ঘষটাতে থাকে।

    ইন্সপেক্টর শামীম সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি লিনাকে খুন করলে কেন?”

    “সত্যি কইতাছি স্যার, খুন আমি করি নাই।” তার কণ্ঠে অনুনয়ের সুর।

    “তুমি কি কোন কারণে লিনাকে ভয় পেতে?”

    শিরিন এবার চুপ। মুখ না তুলে বলল, “আমারে দেখলেই ও মুখ ঘুরাইয়া নিত। সবসময় এমন ভাব দেখাইতো, যেন আমি খারাপ মাইয়া।”

    “তাই বলে তাকে তুমি মেরে ফেলবে?”

    “স্যার আমি সত্যিই খুন করি নাই।” এবার সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো।

    “তাহলে নিশ্চয়ই তোমার ভাই রাজু করেছে?” শামিম সাহেব চেঁচিয়ে বললেন।

    “না স্যার খুন রাজুও করে নাই।” এবার সে সরাসরি চোখ তুলে তাকালো, “ হেয় শুধু আমার কথামত লিনারে ভয় দেহাইছে।”

    “কিন্তু, খুনের সময় তো সে ওখানে ছিল। ওইদিন ওই বিল্ডিংয়ের ছাদে তাকে দেখাও গেছে।“

    শিরিন চোখ নামিয়ে ফেলে। পরক্ষণেই আবার চোখ তুলে আনত কণ্ঠে বলে, “ রাজু গেছিল আমার সাথে দেখা করতে। হের তোলা লিনার ছবিগুলা আমারে দিতে আইছিল। আমি সেইগুলা দেখাইয়া লিনারে ভয় দেখাইতে চাইছিলাম। আমারে ছবি দিয়াই রাজু চইলা যায়।”

    পুলিশের কাছে সবদিক দিয়েই শিরিনকে খুনী হিসেবে নিশ্চিত সন্দেহের দিকে টেনে নিচ্ছে। ওর অতীত। আগের বাসায় এক শিশুর মৃত্যু ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে তার নাম আসা। লিনার ল্যাপটপে তার কন্ঠ শুনা যাওয়া, সবই খুঁনী হিসেবে তার দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করছে।

    তদন্তকারী এক অফিসার ফিসফিস করে বলল, “স্যার, এইটা তো পিওর মার্ডার কেস। লিনা সম্ভবতঃ শিরিনের কোন কুকর্ম জেনে ফেলেছিল। তাই এই মেয়েটা রাগে, হিংসায় তাকে খুন করে ফেলছে। আর এখন চুপ করে আছে।”

    ইন্সপেক্টরও তেমনি ভাবছেন। এমন সময় শিরিন আবার কথা বলে উঠলো, “ খুন কে করছে আমি জানি স্যার। “ কিন্তুক, তার নাম আমি নিতে পারুম না।” বলেই সে হুঁ-হুঁ করে কেঁদে দিল।
    (চলবে)

    5
    2 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar